অনলাইনে মাদক কেনাবেচায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড, সংসদে বিল পাস

অনলাইনে মাদক কেনাবেচায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড, সংসদে বিল পাস
ছবি: সংগৃহীত
 জাতীয় সংসদ: দেশে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ডিজিটাল দুনিয়া ও ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে মাদকের ভয়ংকর বিস্তার রোধে এক ঐতিহাসিক ও কঠোরতম আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। সাইবার স্পেস এবং আধুনিক ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে যেকোনো ধরনের অবৈধ মাদকদ্রব্য পাচার, সিন্ডিকেট পরিচালনা বা কেনাবেচার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি 'মৃত্যুদণ্ড'-এর বিধান রেখে জাতীয় সংসদে বহুল আলোচিত 'মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬' আনুষ্ঠানিকভাবে পাস হয়েছে।

​আজ সোমবার (১৩ জুলাই, ২০২৬) সরকারের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সংশোধনী বিলটি বিবেচনার জন্য জাতীয় সংসদের অধিবেশনে উত্থাপন করেন। বিলটির ওপর বিরোধী ও স্বাধীন সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে আসা জনমত যাচাই, বিলটি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণ এবং উত্থাপিত বিভিন্ন সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর দীর্ঘ চুলচেরা বিশ্লেষণ ও নিষ্পত্তি শেষে স্পিকারের সভাপতিত্বে উপস্থিত সংসদ সদস্যদের কণ্ঠভোটের মাধ্যমে বিলটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।

আরও পড়ুন: রাজশাহীর সঙ্গে সারাদেশের বাস চলাচল বন্ধ, চরম ভোগান্তিতে সাধারণ যাত্রীরা

​ডিজিটাল মাদক অপরাধের ভয়ংকর রূপ ও নতুন আইনি পরিধি

​জাতীয় সংসদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চুলচেরা সুপারিশ ও মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত এই সংশোধিত নতুন আইনে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এবং সাইবার জগতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সমস্ত নতুন ধাঁচের মাদক-সংক্রান্ত অপরাধকে কঠোরভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

​পাস হওয়া নতুন আইনের ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে নিচের মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে মাদকদ্রব্যের সিন্ডিকেট পরিচালনা করেন, তবে তা সুনির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে:

​সাইবার স্পেস, ডার্ক ওয়েব বা ইন্টারনেট জগত।

​যেকোনো ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার বা স্মার্টফোন।

​অবৈধ কোনো ওয়েবসাইট বা নির্দিষ্ট অনলাইন ওয়েব পোর্টাল।

​জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (যেমন—ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ইত্যাদি)।

​মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন (অ্যাপস), চ্যাটিং ফোরাম বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম।

​ইলেকট্রনিক যোগাযোগব্যবস্থা বা অন্য যেকোনো সর্বাধুনিক ডিজিটাল মিডিয়া।

​আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, উল্লিখিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনো প্রকার মাদকদ্রব্য বা মানুষের মেধা ও মনঃপ্রভাবকারী (সাইকোট্রপিক) ক্ষতিকর পদার্থ কেনা, বিক্রি করা, বিদেশে পাচার বা দেশীয় বাজারে সরবরাহ করা, কোনো গ্রাহকের কাছে সরবরাহের প্রস্তাব দেওয়া, মাদকের আকর্ষণীয় ডিজিটাল বিজ্ঞাপন প্রচার করা, মাদক চোরাচালানের জন্য ভার্চুয়াল যোগাযোগ রক্ষা করা বা এই সংক্রান্ত অন্য যেকোনো কার্যক্রমে সহায়তা প্রদান করা সম্পূর্ণ অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

​ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল ট্রেইল নিয়ে কঠোর ধারা

​আইন প্রণেতারা এবারের সংশোধনীতে অপরাধীদের আধুনিক লেনদেন পদ্ধতিকেও আইনের জাঁতাকলে বেঁধেছেন। আইনে উল্লেখ করা হয়েছে, মাদকের অর্থ জোগানের জন্য যদি কোনো ব্যক্তি বা আন্তর্জাতিক চক্র ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম, ই-ওয়ালেট (মোবাইল ব্যাংকিং), কোনো ভার্চুয়াল অ্যাসেট কিংবা আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি (যেমন—বিটকয়েন ইত্যাদি) ব্যবহার করেন বা ব্যবহারের ন্যূনতম চেষ্টাও চালান, তবে তাও সমান অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

​সবচেয়ে যুগান্তকারী বিষয় হলো—ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংঘটিত এই সমস্ত জটিল ও হাইটেক মাদক অপরাধের বিচার কাজ সম্পন্ন করতে আদালত বা ট্রাইব্যুনালের কাছে অভিযুক্ত ব্যক্তির শরীর বা হেফাজত থেকে সরাসরি কোনো মাদকদ্রব্য হাতেনাতে উদ্ধার হওয়া বা জব্দ হওয়া বাধ্যতামূলক বা আবশ্যিক শর্ত হিসেবে গণ্য হবে না। ডিজিটাল ট্রেইল, মেসেজ আদান-প্রদান বা আর্থিক লেনদেনের ডিজিটাল প্রমাণাদি দেখেই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে।

​শাস্তির পরিধি এবং জরিমানার অঙ্ক

​প্রযুক্তিনির্ভর মাদক অপরাধের ভয়বহতা বিবেচনায় অপরাধীদের জন্য কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়েছে এই নতুন আইনে:

​সাধারণ ডিজিটাল অপরাধ: কোনো ব্যক্তি যদি এককভাবে ডিজিটাল মাধ্যমে মাদক অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন, তবে অপরাধের গভীরতা অনুযায়ী যেকোনো মেয়াদের সশ্রম কারাদণ্ড থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এবং এর পাশাপাশি সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক অর্থদণ্ডের বিধানে দণ্ডিত হবেন।

​আন্তর্জাতিক ও সংঘবদ্ধ চক্রের সাজা: যদি প্রমাণিত হয় যে, এই প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধটি কোনো আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক বা কোনো দেশের সুসংগঠিত মাফিয়া অপরাধচক্রের অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়েছে, তবে অপরাধীকে যেকোনো মেয়াদের কঠোর কারাদণ্ডসহ সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার সুনির্দিষ্ট আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

​আইন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নবগঠিত বিশেষ মাদক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল অপরাধীদের সাইবার স্পেসের বিভিন্ন রিসোর্স, ব্যবহৃত ডিজিটাল ডিভাইস, সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের ওয়ালেট, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল অ্যাসেট এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির অ্যাকাউন্ট তাৎক্ষণিকভাবে ব্লক, ইন্টারনেট থেকে অপসারণ, বাজেয়াপ্ত বা চিরস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রের অনুকূলে জব্দ করার নির্দেশ জারি করতে পারবে।

​মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের নতুন ক্ষমতা ও ট্রাইব্যুনাল গঠন

​পাস হওয়া সংশোধিত এই নতুন আইনে সাধারণ বিচারিক আদালতের এখতিয়ার সম্পূর্ণ বহাল রাখার পাশাপাশি দেশের চিহ্নিত মাদকপ্রবণ জেলা ও সীমান্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত বিচারের স্বার্থে পৃথক ‘মাদক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল’ গঠনের বিশেষ বিধানটি আবারও পুনর্বহাল করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে বজ্রপাতে পুকুরে মাছ ধরার সময় স্কুলছাত্রের অকাল মৃত্যু

​এর পাশাপাশি, প্রযুক্তিনির্ভর ও অত্যাধুনিক মাদক অপরাধ, বিশেষ করে অন্ধকার ডার্ক ওয়েব বা সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধগুলোর তদন্ত ও সফল দমনের লক্ষ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (DNC) মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র বা মারণাস্ত্র বহন এবং মাদক খুঁজে বের করার জন্য উন্নত ‘ডগ স্কোয়াড’ গঠনের আইনি ক্ষমতা ও বৈধতা প্রদান করা হয়েছে।

​সংসদে বিলটির ওপর সমাপনী ও গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তাঁর সরকারি অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি হুংকার দিয়ে বলেন, "তরুণ সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে মাদকের ভয়ংকর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বা নেপথ্যের গডফাদারদের কাউকে, কোনো অবস্থাতেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্মার্টলি এই বিষাক্ত ব্যবসা করতে চাচ্ছে, তাদের জন্য আমরা সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করেছি। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি এই ধরণের অপরাধে জড়িত কর্মকর্তা বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও সমান্তরালভাবে কঠোর প্রশাসনিক ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।"

​সংবাদ সূত্র: বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রেস উইং।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন