আজ সোমবার (১৩ জুলাই, ২০২৬) সকাল থেকেই রাজশাহীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালসহ কোনো কাউন্টার থেকে দূরপাল্লা বা লোকাল রুটের কোনো বাস ছেড়ে যায়নি এবং বাইরে থেকেও কোনো গণপরিবহনকে শহরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। আকস্মিক ও হঠকারী এই পরিবহন ধর্মঘটের ফলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন দূরবর্তী গন্তব্যে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হওয়া হাজার হাজার সাধারণ যাত্রী ও সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তি, দুর্ভোগ ও বিপাকে পড়েছেন।
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে চোরের পৈশাচিক হামলায় মৃত্যুশয্যায় দাদি ও নাতনি, ধামাচাপার চেষ্টায় ধাওয়া
পকেট কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে চরম অসন্তোষ
রাজশাহীর পরিবহন খাতের এই বর্তমান তীব্র সংকটের নেপথ্যে রয়েছে জেলা মোটরশ্রমিক ইউনিয়নের শীর্ষ নেতাদের নতুন কমিটি গঠন সংক্রান্ত এক গভীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। স্থানীয় সাধারণ শ্রমিক ও আন্দোলনকারীদের সূত্রে জানা গেছে, এর আগে গত ১৮ মে মোটরশ্রমিক ইউনিয়নের নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে প্রথম দফায় দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয় এবং সে সময়ও কয়েক দিন বাস চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছিল।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সকল নিয়মকানুন ও সাধারণ শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক মতামতকে উপেক্ষা করে রাজশাহী জেলা মোটরশ্রমিক ইউনিয়নের একটি নতুন ২১ সদস্য বিশিষ্ট বিতর্কিত পকেট কমিটি ঘোষণা করেন। সদ্য ঘোষিত এই বিতর্কিত ও একপেশে কমিটিতে রফিকুল ইসলাম পাখিকে সভাপতি এবং মোমিনুল ইসলাম মোমিনকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
কোনো ধরনের গণতান্ত্রিক নির্বাচন বা ব্যালট পেপারের ভোট ছাড়াই সম্পূর্ণ পকেট পদ্ধতিতে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া এই নতুন কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করে সাধারণ মোটরশ্রমিকদের একটি বিশাল অংশ চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। সাধারণ শ্রমিকদের একাংশের দাবি—ভোটাধিকার হরণ করে এই ধরনের অবৈধ পকেট কমিটি গঠন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। এর প্রতিবাদে এবং অবিলম্বে এই কমিটি বাতিল করে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আজ সকাল থেকেই সাধারণ শ্রমিকেরা দলবদ্ধ হয়ে রাজশাহীর মহাসড়কগুলোতে অবস্থান নেন এবং লাঠিসোটা নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁরা সাধারণ বাস চালক ও হেলপারদের বাধ্য করে সব রুটের যাত্রীবাহী বাস ও দূরপাল্লার কোচ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন।
যাত্রী ভোগান্তি চরমে, অচল কাউন্টারগুলো
সকাল থেকে রাজশাহীর শিরোইল ঢাকা বাস টার্মিনাল, ভদ্রা মোড় এবং রেলগেট সংলগ্ন দূরপাল্লার কাউন্টারগুলোতে গিয়ে দেখা যায় এক চরম হাহাকার ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা এবং উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার জন্য শত শত যাত্রী কাউন্টারে এসে চরম বিপাকে পড়েছেন। অগ্রিম টিকিট কেটে রাখা যাত্রীরা তাদের টাকা ফেরত নেওয়ার জন্য কাউন্টারগুলোতে ভিড় করছেন, কিন্তু হঠাৎ বাস বন্ধ হওয়ায় কাউন্টার ম্যানেজাররা কোনো সদুত্তর দিতে পারছেন না।
সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন জরুরি চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হওয়া রোগী, চাকরিপ্রার্থী এবং সাধারণ নারী ও শিশুরা। ধর্মঘটের সুযোগে সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং থ্রি-হুইলার চালকেরা যাত্রীদের কাছ থেকে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া আদায় করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
আরও পড়ুন: আল্লাহ সম্পর্কে যেসব কুধারণা বা নেতিবাচক চিন্তা মুমিনের ঈমান ধ্বংস করে
বিক্ষুব্ধ সাধারণ পরিবহন শ্রমিকদের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি:
"সাধারণ চালক ও হেলপারদের রক্ত জল করা পয়সায় চলা এই ইউনিয়নে কোনো পকেট বা সিলেকশন কমিটি চলতে দেওয়া হবে না। যতক্ষণ না পর্যন্ত এই অবৈধ সিলেকশন কমিটি বাতিল করে সাধারণ শ্রমিকদের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নতুন এবং গ্রহণযোগ্য পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত রাজশাহী থেকে দূরপাল্লা বা অভ্যন্তরীণ কোনো রুটের চাকা ঘুরবে না। আমাদের এই ন্যায্য আন্দোলন ও ধর্মঘট অনির্দিষ্টকালের জন্য কঠোরভাবে চলবে।"
এই তীব্র পরিবহন সংকটের বিষয়ে স্থানীয় জেলা প্রশাসন এবং রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের দুই পক্ষের সাথে সমঝোতার চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে বিকেল পর্যন্ত শ্রমিক নেতাদের গোঁড়ামির কারণে কোনো সুরাহা মেলেনি, ফলে ধর্মঘট অব্যাহত রয়েছে।
সংবাদ সূত্র: রাজশাহী জেলা মোটরশ্রমিক ইউনিয়ন ও শিরোইল বাস টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।