এই পৈশাচিক ও ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর পুরো বাকেরগঞ্জ উপজেলা জুড়ে তীব্র ক্ষোভ, গণ-অসন্তোষ এবং নিন্দার ঝড় বইছে। ঘটনার পর থেকে ভুক্তভোগী ওই বৃদ্ধার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁকে উন্নত চিকিৎসা ও আইনি পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং অভিযুক্ত পাষণ্ড জামাতা এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছে।
গভীর রাতে ঘরে ঢুকে বর্বরোচিত হামলা ও নির্যাতন
ভুক্তভোগী ওই বৃদ্ধা নারী এবং স্থানীয় পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার (১১ জুলাই, ২০২৬) দিবাগত গভীর রাতে ভুক্তভোগী বৃদ্ধা শাশুড়ি নিজের শয়নকক্ষে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। ঠিক সেই সুযোগে ঘরের দরজা ভেঙে বা কৌশলে ভেতরে প্রবেশ করে তার লম্পট মেয়ের জামাতা আজিম চৌকিদার (৩৫)। ঘরে ঢুকেই আজিম তার বৃদ্ধা শাশুড়ির ওপর চড়াও হয় এবং জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা চালায়।
আরও পড়ুন: এক ফেসবুক পোস্টেই বদলে গেল এতিম জান্নাতির জীবন, রাজকীয় আয়োজনে বিয়ে সম্পন্ন
ওই সময় ৭০ বছর বয়সী অসহায় বৃদ্ধা নিজের সম্ভ্রম বাঁচাতে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে পাষণ্ড আজিম তাকে এলোপাতাড়ি মারধর ও শারীরিক নির্যাতন করে গুরুতর জখম করে। একপর্যায়ে ওই বৃদ্ধাকে সম্পূর্ণ অবশ ও রক্তাক্ত করে তাঁর ওপর পৈশাচিক ও বর্বরোচিত যৌন নিগ্রহ চালায় আজিম। ঘটনার পর বৃদ্ধার গোঙানি ও গোঙানির শব্দ পেয়ে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা এগিয়ে এলে অভিযুক্ত আজিম চৌকিদার দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে অন্ধকারের মধ্যে আত্মগোপন করে।
হাসপাতালে ভর্তি, প্রাথমিক আলামত ও ওসিসিতে স্থানান্তর
ঘটনার পরদিন সকালে মারাত্মক আহত ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়া ওই বৃদ্ধাকে স্থানীয়রা ও পরিবারের সদস্যরা উদ্ধার করে দ্রুত বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁর অবস্থা বেগতিক দেখে চিকিৎসকেরা আইনি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ফরেনসিক টেস্টের সিদ্ধান্ত নেন।
এ বিষয়ে বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. আবু বকর সিদ্দিক সংবাদমাধ্যমকে জানান যে—হাসপাতালের দুজন অভিজ্ঞ নারী চিকিৎসক ভুক্তভোগী ওই বৃদ্ধাকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। প্রাথমিক ডাক্তারি পরীক্ষায় ওই বৃদ্ধার শরীরে ধর্ষণের সুস্পষ্ট আলামত পাওয়া গেছে এবং পাশবিক নির্যাতনের কারণে তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের লালচে ও কালো দাগ বা চিহ্ন ধরা পড়েছে। পরবর্তীতে উন্নত শারীরিক চিকিৎসা, মানসিক কাউন্সিলিং এবং চূড়ান্ত আইনি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ভুক্তভোগীকে তাৎক্ষণিকভাবে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) স্থানান্তর করা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেই বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে থানা পুলিশকে অবহিত করা হয়।
স্ত্রী ও খোদ মায়ের মুখে আজিমের ভয়াবহ অপরাধের খতিয়ান
অভিযুক্ত আজিম চৌকিদারের এই জঘন্য ও পৈশাচিক কর্মকাণ্ডে কেবল এলাকাবাসীই নয়, বরং তার নিজের পরিবারের সদস্যরাও চরম ক্ষুব্ধ ও লজ্জিত। আজিমের এমন জঘন্য চারিত্রিক অবক্ষয়ের বিষয়ে তার স্ত্রী ও মায়ের কাছ থেকে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক তথ্য পাওয়া গেছে, যা নিচে তুলে ধরা হলো:
স্ত্রী রেকসোনা বেগমের বিস্ফোরক বয়ান: অভিযুক্তের বর্তমান স্ত্রী রেকসোনা বেগম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, ঘটনার সময় তিনি নিজের বাপের বাড়িতে ছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, তার স্বামী আজিম দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মকভাবে মাদকাসক্ত এবং এলাকার বিভিন্ন চুরি, ছিনতাইসহ নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে সরাসরি জড়িত। রেকসোনা আরও এক ভয়াবহ তথ্য ফাঁস করে বলেন, প্রায় দুই বছর আগে লম্পট আজিম তাকেও জোরপূর্বক ধর্ষণ করেছিল। পরবর্তীতে স্থানীয় সমাজ ও মাতবরদের সালিশী উদ্যোগে ও চাপে তাদের বিয়ে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, রেকসোনার আগের সংসারের একটি ৮ বছর বয়সী কন্যাসন্তান রয়েছে, তাকেও আজিম বিভিন্ন সময়ে কুপ্রস্তাব ও যৌন হয়রানিসহ একাধিকবার ধর্ষণের চেষ্টা করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
খোদ জন্মদাত্রী মায়ের কঠোর শাস্তির দাবি: নিজের আপন ছেলের এমন জঘন্য ও লোকলজ্জাকর পৈশাচিক কর্মকাণ্ডে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করেছেন খোদ আজিমের জন্মদাত্রী মা নাজমা বেগম। তিনি অশ্রুভেজা চোখে বলেন, "আজিম আমার পেটের ছেলে হলেও সে একটা আস্ত জানোয়ার। সে চরম মাদকাসক্ত এবং প্রায়শই নেশার টাকার জন্য পরিবারের সদস্যদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। অতীতেও এলাকায় একটি ছোট শিশুকে ধর্ষণের অপরাধে সে দীর্ঘদিন জেল খেটে এসেছে। জেল থেকে বের হয়ে সে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। আমি একজন মা হয়েও এই লম্পট ও পৈশাচিক ছেলের কঠোরতম দৃষ্টান্তমূলক আইনি শাস্তি ও ফাঁসি দাবি করছি।"
আরও পড়ুন: অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র রুখতে পুরান ঢাকায় ওলামাদের নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘ইত্তিফাকুল মাদারিস’ গঠন
আইনি পদক্ষেপ ও পুলিশের কঠোর অবস্থান
লোমহর্ষক এই ঘটনার পর থেকে এলাকা জুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় রঙ্গশ্রী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত অপরাধীকে গ্রেপ্তারের দাবি তুলেছেন।
সমগ্র পরিস্থিতি নিয়ে বাকেরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আদিল হোসেন দিগন্ত বাংলা নিউজকে নিশ্চিত করে জানান, "বৃদ্ধা শাশুড়িকে ধর্ষণের এই বর্বরোচিত ঘটনায় ইতিমধ্যেই ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় একটি লিখিত এজাহার বা অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনাটিকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে আমলে নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। ওসিসি থেকে ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়ার পর এটি নিয়মিত মামলা হিসেবে রুজু হবে। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত লম্পট আজিম চৌকিদার এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় তাকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। তাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার জন্য পুলিশের একাধিক বিশেষ টিম গঠন করে বিভিন্ন সম্ভাব্য স্থানে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে।"
সংবাদ সূত্র: বাকেরগঞ্জ থানা পুলিশ ও শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ওসিসি)।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।