সিরাজগঞ্জ: চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে সৃষ্ট দেশব্যাপী চরম অসন্তোষের ধারাবাহিকতায় এবার রাজপথে নেমে এসেছেন সিরাজগঞ্জের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বৈরী আবহাওয়া, বন্যা পরিস্থিতি এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার নানা ত্রুটি-বিচ্যুতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা শিক্ষামন্ত্রীর অনতিবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেছেন। একই সাথে পরীক্ষা স্থগিত ও প্রশ্নপত্রের যৌক্তিক মূল্যায়নের দাবিতে জেলা শহরের কেন্দ্রস্থলে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন উচ্চমাধ্যমিক স্তরের কয়েক শ পরীক্ষার্থী।
আজ বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুরের দিকে জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রগুলোতে এই নজিরবিহীন ছাত্রবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আকস্মিক এই সড়ক অবরোধের ফলে শহরের প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকার সংযোগ সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, যার ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ পথচারী ও যানবাহন চালকেরা।
ঐতিহাসিক ইলিয়ট ব্রিজ থেকে বাজার স্টেশন: আন্দোলনের ঘটনাক্রম
প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা যায়, পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ বুধবার দুপুর ঠিক ১টা ৩০ মিনিটের দিকে সিরাজগঞ্জ শহরের ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক ইলিয়ট ব্রিজ (বড় পুল) চত্বরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সমবেত হতে শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই জমায়েত একটি বিশাল প্রতিবাদী মিছিলে রূপ নেয়।
- বিক্ষোভ মিছিলের রুট: ইলিয়ট ব্রিজ চত্বর থেকে শুরু হওয়া মিছিলটি স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে শহরের অন্যতম প্রধান ও ব্যস্ততম সড়ক 'এসএস রোড' প্রদক্ষিণ করে।
- সড়ক অবরোধের কেন্দ্রবিন্দু: মিছিলটি শহরের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা ও শহরের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত 'বাজার স্টেশন' চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা চারপাশের সড়কগুলোতে আড়াআড়িভাবে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন।
- অবস্থান কর্মসূচি: তীব্র রোদ ও গরম উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা রাস্তার ওপর বসে পড়েন এবং তাদের পূর্বঘোষিত দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার শপথ নেন।
উত্তাল রাজপথে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ও ছাত্রনেতাদের জ্বালাময়ী বক্তব্য
বাজার স্টেশন চত্বরে সড়ক অবরোধ চলাকালীন সময়ে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কলেজের ছাত্র প্রতিনিধিরা সাধারণ পরীক্ষার্থীদের পক্ষে তাদের দাবি ও কষ্টের কথা তুলে ধরেন। সমাবেশে বক্তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা না করার কঠোর সমালোচনা করেন।
আরও পড়ুন: মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি প্রত্যাহার: ৬ নতুন প্রস্তাবে শিক্ষার্থীদের সাথে প্রশাসনের বৈঠক
সমাবেশে উপস্থিত হয়ে এবং আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য প্রদান করেন জেলার শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি কলেজের প্রতিনিধিরা:
১. ইসলামিয়া সরকারি কলেজ: এই স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দুঃখ-দুর্দশা ও পরীক্ষা নিয়ে প্রশাসনের একমুখী নীতির তীব্র সমালোচনা করে বক্তব্য দেন ছাত্র প্রতিনিধি শেখ সাকিব ও তানভীর।
২. রজব আলী কলেজ: এই কলেজের শিক্ষার্থী মো. নীরব তার বক্তব্যে বন্যা কবলিত ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
3. আল মাহমুদ ডিগ্রি কলেজ: শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং পরীক্ষার্থীদের ওপর থেকে মানসিক চাপ কমানোর জোরালো দাবি জানান ছাত্র প্রতিনিধি মো. সোহাগ মিয়া।
৪. রাশিদাজ্জোহা মহিলা কলেজ: ছাত্রীদের পক্ষে এই সম্মানীয় নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী মোছা. নির্জনা বক্তব্য দেন। তিনি বিশেষ করে প্রতিকূল আবহাওয়ায় ছাত্রীদের পরীক্ষা কেন্দ্রে যাতায়াতের অবর্ণনীয় কষ্ট ও মানসিক ট্রমার কথা তুলে ধরেন।
৫. সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ: আন্দোলনের যৌক্তিকতা ও শিক্ষার্থীদের ৮ দফা দাবির পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করে সমাপনী বক্তব্য দেন ছাত্র প্রতিনিধি খালেদ সাইফুল্লাহ।
বক্তারা তাদের বক্তব্যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দেশের চলমান বন্যা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে নীতিনির্ধারকেরা যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তা দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ত্রুটিপূর্ণ প্রশ্নপত্র তৈরি এবং পরীক্ষা নিয়ে বারবার পরীক্ষামূলক নীতি গ্রহণের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আজ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এই চরম ব্যর্থতার দায়ভার কাঁধে নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীকে অনতিবিলম্বে তার পদ থেকে ইস্তফা দিতে হবে।
আরও পড়ুন: লাইসেন্স ও হেলমেট ছাড়া চালু হবে না বাইক, কাপাসিয়ার স্কুলছাত্রের চমক
জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভূতপূর্ব সংহতি
সিরাজগঞ্জ জেলা শহরের প্রধান সরকারি কলেজগুলোর পাশাপাশি মফস্বল ও উপজেলার বিভিন্ন স্তরের উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের মাদ্রাসার সাধারণ শিক্ষার্থীরাও এই আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ও সংহতি প্রকাশ করেছেন। দূর-দূরান্ত থেকে অনেক শিক্ষার্থী হেঁটে এসে এই মিছিলে শরিক হন। আন্দোলনকারী সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়, এটি তাদের টিকে থাকার এবং সুন্দর পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণের মৌলিক অধিকার আদায়ের লড়াই। যতক্ষণ না পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণের সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দেওয়া হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না এবং আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন।
অবরোধের জেরে স্থবির সিরাজগঞ্জ: তীব্র যানজট ও সাময়িক ভোগান্তি
দুপুর দেড়টা থেকে শুরু হওয়া এই আকস্মিক সড়ক অবরোধের কারণে সিরাজগঞ্জ শহরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। বাজার স্টেশন চত্বরটি শহরের সকল প্রকার যানবাহন চলাচলের প্রধান মোড় হওয়ায় মুহূর্তের মধ্যেই এসএস রোড, মুজিব সড়ক এবং স্টেশন রোডসহ আশপাশের সবকটি গলিতে শত শত রিকশা, ইজিবাইক, সিএনজি এবং মালবাহী ট্রাক আটকে পড়ে।
দীর্ঘ সময় তীব্র যানজটে আটকে থাকায় সাধারণ যাত্রী ও বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষদের সাময়িক ভোগান্তির শিকার হতে হয়। তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অ্যাম্বুলেন্স এবং জরুরি সেবার গাড়িগুলোকে বিশেষ বিবেচনায় ছেড়ে দেন। পরবর্তীতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুরোধে পরিস্থিতি বিবেচনা করে দুপুর সোয়া ২টার (২:১৫ PM) দিকে শিক্ষার্থীরা তাদের সড়ক অবরোধ কর্মসূচি সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নেন। অবরোধ তুলে নেওয়ার পর পুলিশের তৎপরতায় প্রায় আধা ঘণ্টা পর শহরের যান চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
নিউজ সূত্র: সিরাজগঞ্জের স্থানীয় প্রতিনিধি ও প্রত্যক্ষদর্শী।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।