শাহজাদপুর প্রতিনিধি: সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলায় অপরাধ দমনে এক নজিরবিহীন ও শ্বাসরুদ্ধকর জুয়াবিরোধী যৌথ ঝটিকা অভিযান পরিচালিত হয়েছে। চারদিকে থৈ থৈ পানি ও বর্ষাকালীন বৈরী আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে জুয়াড়িদের পলায়ন ঠেকাতে স্বয়ং উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা কোমর সমান পানিতে নেমে এই দুঃসাহসিক অভিযান সফল করেছেন। শাহজাদপুর পৌর সদরের বিসিক বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন একটি গোপন ডেরা থেকে কোটি টাকার আন্তঃজেলা জুয়ার আসর পুড়িয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ঘটনাস্থল থেকে হাতেনাতে ১৪ জন সক্রিয় জুয়াড়িকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আজ রোববার (১২ জুলাই, ২০২৬) দুপুরের দিকে গ্রেপ্তারকৃত সব আসামিকে সুনির্দিষ্ট জুয়া আইনের মামলায় বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে সিরাজগঞ্জ জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই বিশেষ অভিযানে সশরীরে নেতৃত্ব দেন শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরিনা শারমিন, শাহজাদপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. হাফিজুর রহমান এবং শাহজাদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম।
আরও পড়ুন: উল্লাপাড়ায় রেললাইনে বসে মোবাইল ফোনে খেলা দেখার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে যুবকের মৃত্যু
দীর্ঘদিনের কোটি টাকার জুয়ার ডেরা ও অভিযানের পটভূমি
পুলিশ ও স্থানীয় বিশ্বস্ত গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, শাহজাদপুর পৌর এলাকার বিসিক বাসস্ট্যান্ডের ঠিক পশ্চিমে অবস্থিত খাদ্যগুদামের পাশে 'শফির ভিটা' নামক একটি নির্জন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বিশাল ঘর তুলে এই নিয়মিত জুয়ার আসর পরিচালনা করা হচ্ছিল। এই আস্তানায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার বিশাল অঙ্কের জুয়া বা তাসের বোর্ড খেলা হতো। শুধু স্থানীয় অপরাধীরাই নয়, বরং সিরাজগঞ্জের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বড় বড় নামী-দামী জুয়াড়িরা এই সুরক্ষিত আস্তানায় নিয়মিত জুয়া খেলতে আসতেন।
চারিদিকে বন্যার পানি বেষ্টিত থাকায় পূর্বে পুলিশী অভিযানের সামান্যতম টের পেলেই জুয়াড়িরা নৌকা বা পানিতে সাঁতার কেটে সহজে পালিয়ে যেতে সক্ষম হতো। এই সুনির্দিষ্ট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শনিবার বিকেলে উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশ একযোগে তাদের কৌশল পরিবর্তন করে এক বিশেষ যৌথ অপারেশন প্ল্যান সাজায়।
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে যাত্রীবাহী বাসের পেছনে সজোরে ধাক্কা: অটোরিকশার মা-ছেলে নিহত, আহত ৩
শনিবার বিকেলের দিকে যখন তাসের আসর পুরোদমে জমে ওঠে, তখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা চারদিক থেকে একযোগে পুরো শফির ভিটা এলাকাটি অবরুদ্ধ বা ঘেরাও করে ফেলেন। জুয়াড়িরা পালানোর চেষ্টা করলে অভিযানে অংশ নেওয়া ইউএনও সাবরিনা শারমিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাফিজুর রহমান এবং ওসি সাইফুল ইসলামসহ পুরো পুলিশ দল নিজেরা পানির তোয়াক্কা না করে সরাসরি বুক ও কোমর সমান পানিতে নেমে পড়েন। ফলশ্রুতিতে জুয়াড়িদের পালানোর সব পথ একযোগে অবরুদ্ধ হয়ে যায় এবং পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ তাস, নগদ অর্থ ও জুয়া খেলার আনুষঙ্গিক সরঞ্জামসহ ১৪ জন জুয়াড়িকে হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম হয়। একই সাথে জুয়ার আসরের জন্য নির্মিত অবৈধ ঘরটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় এবং আগুন দিয়ে অপরাধের মূল আস্তানাটি সম্পূর্ণ পুড়িয়ে ভস্মীভূত করে দেওয়া হয়।
আটককৃত ১৪ জুয়াড়ির বিস্তারিত পরিচয়
পুলিশের সফল অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া আন্তঃজেলা জুয়াড়ি চক্রের ১৪ সদস্যের সম্পূর্ণ নামের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
১. বাবু বেপারি (৩৫): মৃত রবি বেপারির ছেলে, গ্রাম: নলুয়া, উপজেলা: শাহজাদপুর।
২. মো. আব্দুল মজিদ (৪৮): মৃত চান উল্লাহ বেপারীর ছেলে, গ্রাম: মুকন্দগাতি, উপজেলা: বেলকুচি।
৩. মো. আনিছ (৪৩): মৃত তারা বেপারির ছেলে, মহল্লা: দিয়াধানগড়া, উপজেলা: সিরাজগঞ্জ সদর।
৪. নুর মোহাম্মদ (৪৫): মৃত সুলতানের ছেলে, গ্রাম: ধীতপুর, উপজেলা: সিরাজগঞ্জ সদর।
৫. মোফাজ্জল (৬০): মৃত মজিবরের ছেলে, গ্রাম: বাড়াবিল, উপজেলা: Shahjadpur।
৬. عبدالله মালেক (৪২): মৃত সোহরাবের ছেলে, গ্রাম: বাড়াবিল, উপজেলা: শাহজাদপুর।
৭. মো. জমের (৪৫): মো. অহেদের ছেলে, গ্রাম: বাড়াবিল, উপজেলা: শাহজাদপুর।
৮. মো. আলাউদ্দিন (৪০): মো. জমির উদ্দিনের ছেলে, গ্রাম: বাড়াবিল, উপজেলা: শাহজাদপুর।
৯. মো. বাদল মিয়া (৫০): মৃত আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে, গ্রাম: দ্বারিয়াপুর, উপজেলা: শাহজাদপুর।
১০. মো. শফিক (৩৮): মৃত মোজাহারের ছেলে, গ্রাম: দ্বারিয়াপুর, উপজেলা: শাহজাদপুর।
১১. মো. হৃদয় (২২): মো. মজিদ মণ্ডলের ছেলে, গ্রাম: দ্বারিয়াপুর, উপজেলা: শাহজাদপুর।
১২. মো. সাব্বির (৩০): মো. আলিফ মিয়ার ছেলে, মহল্লা: দরগাহপাড়া, উপজেলা: শাহজাদপুর।
১৩. মো. হারেজ আলী (৩৪): মো. আজিম উদ্দিনের ছেলে, গ্রাম: নারায়ণদহ, উপজেলা: শাহজাদপুর।
১৪. মো. খোরশেদ আলম (৩০): মো. রহমানের ছেলে, উপজেলা: উল্লাপাড়া।
প্রশাসনের কঠোর হুঁশিয়ারি
সফল অপারেশন শেষে শাহজাদপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. হাফিজুর রহমান এবং ওসি মো. সাইফুল ইসলাম যৌথ বিবৃতিতে জানান, এই শফির ভিটায় দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র সমাজ ধ্বংসকারী জুয়ার আসর বসিয়ে আসছিল। এর আগেও মূল হোতা শফিসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছিল, কিন্তু তারা আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড শুরু করে। চারদিকের ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে তারা ভাবত পানিতে পুলিশ আসবে না, কিন্তু এবার জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রেখে অপরাধীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শাহজাদপুর অঞ্চলে যেকোনো ধরণের জুয়া, মাদক ও অপরাধের বিরুদ্ধে এই ধরণের কঠোর ও আপসহীন অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে বলে তাঁরা দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সংবাদ সূত্র: শাহজাদপুর থানা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন প্রেস ব্রিফিং।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।