বাগমারায় চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় সাবেক যুবদল নেতাকে পিটিয়ে জখম, কাঠগড়ায় ৩ ছাত্রদল নেতা!

বাগমারায় চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় সাবেক যুবদল নেতাকে পিটিয়ে জখম, কাঠগড়ায় ৩ ছাত্রদল নেতা!
ছবি: সংগৃহীত
 রাজশাহী প্রতিনিধি, ১৮ জুলাই ২০২৬:

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দল ও ব্যবসায়িক বিরোধকে কেন্দ্র করে এক রক্তক্ষয়ী হামলার ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার গোয়ালকান্দি ইউনিয়নে মাদক ব্যবসা ও অবৈধ চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় আসাদুল ইসলাম নামে যুবদলের এক সাবেক সভাপতি তথা বর্তমান উপজেলা কমিটির সদস্যকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে গুরুতর জখম করার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের তিন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে। গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাতে এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনাটি ঘটে। পরবর্তীতে শুক্রবার (১৭ জুলাই) এই ঘটনার একটি সচিত্র ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র তোলপাড় ও জোরালো আলোচনার সৃষ্টি হয়। গুরুতর আহত আসাদুল ইসলাম বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

​হামলার শিকার আসাদুল ইসলাম এলাকায় ক্যাবল টিভি (ডিশ ব্যবসা) এবং ইন্টারনেট সেবাদাতা ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে, অভিযুক্ত তিন ছাত্রদল নেতার বাড়িও একই গোয়ালকান্দি ইউনিয়নে।

আরও পড়ুন: রায়গঞ্জে মাদকের প্রতিবাদ করায় এইচএসসি পরীক্ষার্থীকে হত্যা, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভাই আইসিইউতে!

​অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতাদের পদবি ও পরিচয়:

​পারভেজ রানা: নর্থ বেঙ্গল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি এবং হামলার প্রধান নেতৃত্বদানকারী।

​সুমন: হামিরকুৎসা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি।

​শাহীন আলম: গোয়ালকান্দি ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি।

​চাঁদা দাবি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বর্বরোচিত হামলা

​হাসপাতালের বিছানায় শায়িত আহত যুবদল নেতা আসাদুল ইসলাম অভিযোগ করে জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে তিনি গোয়ালকান্দি বাজারে অবস্থিত তাঁর নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করছিলেন। এমন সময় হঠাৎ করেই পারভেজ রানার নেতৃত্বে ছাত্রদলের ৪-৫ জন নেতা জোরপূর্বক তাঁর ঘরে প্রবেশ করেন। তারা ভেতরে ঢুকেই ডিশ ব্যবসা সচল রাখার নামে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন, যার পরিমাণ ছিল নগদ ৩ লাখ টাকা। আসাদুল এই অন্যায় চাঁদা দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানালে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ছাত্রদল নেতারা।

​একপর্যায়ে তারা সঙ্গে আনা লোহার রড, লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আসাদুলের ওপর অতর্কিত হামলা চালান এবং তাকে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে রক্তাক্ত ও জখম করেন। হামলাকারীরা শুধু আসাদুলকে মেরেই ক্ষান্ত হননি, বরং তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মূল্যবান জিনিসপত্র ভাঙচুর করেন এবং ক্যাশ বাক্সে থাকা অর্থ লুটপাট করে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। ঘটনার সময় পাশে থাকা এক স্থানীয় তরুণ আসাদুলের নিজস্ব মুঠোফোন দিয়ে গোপনে পুরো ঘটনার একটি অংশ ফেসবুকে লাইভ করেন, যা পরবর্তীতে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। পরবর্তীতে বাজারের সাধারণ ব্যবসায়ী ও স্থানীয় লোকজন এসে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন।

​ফেসবুক পোস্টে আসাদুলের গুরুতর বিস্ফোরক তথ্য

​শুক্রবার সকালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে আসাদুল ইসলাম তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে একটি বিশেষ পোস্ট শেয়ার করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, এই হামলার পেছনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ কাজ করেছে। পারভেজ রানা ও তার অনুসারীরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান থেকে জোরপূর্বক অবৈধ চাঁদা আদায় করে আসছিলেন। আসাদুল ইসলাম একজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে এই মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জনসমক্ষে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন। এই প্রতিবাদের জের ধরে এবং নতুন করে দাবি করা ৩ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে পারভেজ রানা সুপরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালিয়েছে।

​অভিযোগ অস্বীকার ও অভিযুক্তদের পাল্টা দাবি

​চাঁদাবাজি ও মারধরের এই গুরুতর অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন প্রধান অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা পারভেজ রানা। তিনি এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার দাবি করে একটি পাল্টা বক্তব্য দিয়েছেন। পারভেজ রানার ভাষ্যমতে, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের নাটকীয় পতনের পর এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আসাদুল ইসলাম ফাহিমা নামের এক স্থানীয় নারীর ডিশের ব্যবসায়ের লাইনটি অবৈধভাবে দখল করে নেন।

​এই ডিশ লাইনের প্রকৃত মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া এবং একটি সুষ্ঠু মীমাংসার উদ্দেশ্যে বৃহস্পতিবার রাতে একটি সমঝোতা বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। ডিশ লাইনের প্রকৃত মালিক ফাহিমা নামের ওই নারী নিজেই ছাত্রদল নেতাদের সেই বৈঠকে উপস্থিত থাকার অনুরোধ করেছিলেন। পারভেজ রানার দাবি, বৈঠক চলাকালীন আসাদুল ইসলাম হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং ফাহিমা নামের ওই নারীর ওপর চড়াও হন। একপর্যায়ে আসাদুল ওই নারীকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করতে গেলে উপস্থিত ছাত্রদল নেতারা ফাহিমাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে যান। সেখানে কেবল একটি হট্টগোলের সৃষ্টি হয়েছিল, কোনো চাঁদাবাজি বা পূর্বশত্রুতার জেরে মারধরের ঘটনা ঘটেনি।

আরও পড়ুন: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি: রাজপথে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ

​সাংগঠনিক ও আইনি পদক্ষেপের আপডেট

​বাগমারা উপজেলা ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন। উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মহব্বত হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন,

​"ফেসবুকে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর আমি পুরো ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হয়েছি। আমি ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল ও স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য খোঁজখবর নিচ্ছি। যেহেতু বিষয়টি দলীয় ভাবমূর্তির সাথে জড়িত, তাই আমাদের দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বসে এই বিষয়ে চূড়ান্ত কথা বলবো। তদন্তে যদি আমাদের কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি বা শৃঙ্খলা ভঙ্গের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"

​এদিকে আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিল্লুর রহমান জানান,

​"সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়ানোর কথা আমরা জানতে পেরেছি। তবে এই মারধর বা ভাঙচুরের ঘটনা নিয়ে এখনো পর্যন্ত ভুক্তভোগী পরিবার কিংবা অন্য কোনো পক্ষ থেকে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের করা হয়নি। লিখিত অভিযোগ অথবা এজাহার পাওয়া মাত্রই পুলিশ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।"

​এলাকায় এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

​সংবাদ সূত্র: বাগমারা থানা পুলিশ, স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত ব্যক্তির ফেসবুক প্রোফাইল।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন