রায়গঞ্জে মাদকের প্রতিবাদ করায় এইচএসসি পরীক্ষার্থীকে হত্যা, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভাই আইসিইউতে!

রায়গঞ্জে মাদকের প্রতিবাদ করায় এইচএসসি পরীক্ষার্থীকে হত্যা, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভাই আইসিইউতে!
ছবি: সংগৃহীত
 ​সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি, ১৭ জুলাই ২০২৬:

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় সমাজবিধ্বংসী মাদকের নীল দংশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে এক মেধাবী তরুণের জীবনপ্রদীপ অকালে নিভে গেছে। রায়গঞ্জ পৌরসভার ফুলজোড় নদীর তীরবর্তী পশ্চিম পাড় এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে মাদক সেবনের বিরোধিতা করায় বর্বরোচিত ও নৃশংস ধারালো অস্ত্রের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থী আব্দুর রহমান (২০)। ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ সময় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে আজ শুক্রবার (১৭ জুলাই) সকাল ৮টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। এই একই বর্বরোচিত হামলায় গুরুতর জখম হয়ে আব্দুর রহমানের আপন বড় ভাই মো. হাসান বর্তমানে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন।

​নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের শিকার আব্দুর রহমান রায়গঞ্জ পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা এবং পেশায় বস্তা ব্যবসায়ী মো. ফিরোজের কনিষ্ঠ সন্তান। তিনি রায়গঞ্জ বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনিক্যাল কলেজের চলতি বছরের উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

আরও পড়ুন: চন্দনাইশে ত্রাণ বিতরণে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু, নেতা-কর্মীদের ভিড়ে ভেঙে পড়ল মঞ্চ!

​ঘটনার সূত্রপাত ও পূর্ব শত্রুতার জের

​নিহতের পারিবারিক সূত্র ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে জানা যায়, গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) রাতে রায়গঞ্জ পৌরসভার ফুলজোড় নদীর পশ্চিম পাড় এলাকায় স্থানীয় একদল যুবকের মাদক সেবন ও অনৈতিক আড্ডার দৃশ্য চোখে পড়ে আব্দুর রহমানের। মাদকের এই ভয়াল গ্রাস থেকে সমাজ ও তরুণ সমাজকে রক্ষা করার তাগিদ থেকে তিনি এবং তাঁর বড় ভাই হাসান এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. তারা শেখের ছেলে এবং চিহ্নিত বখাটে যুবক টিটোন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং তাদের সাথে প্রচণ্ড বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে।

​মাদকের এই প্রকাশ্য বিরোধিতার জেরে টিটোন গভীর প্রতিশোধের ছক আঁকে। সেই রাতেই পূর্বপরিকল্পিতভাবে মারাত্মক দেশীয় অস্ত্র, বার্মিজ ছুরি ও ধারালো চাপাতি নিয়ে ওত পেতে থাকে ঘাতক টিটোন। আব্দুর রহমান ও হাসান বাড়ির নিকটবর্তী এলাকায় পৌঁছামাত্রই টিটোন ও তার সহযোগীরা অতর্কিতে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঘাতকের ধারালো অস্ত্রের উপর্যুপরি আঘাতে মুহূর্তের মধ্যে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন দুই ভাই। তাদের চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে আসলে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে চম্পট দেয়।

​চিকিৎসা প্রচেষ্টা এবং করুণ পরিণতি

​রক্তাক্ত ও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় স্থানীয়দের সহায়তায় তাৎক্ষণিকভাবে দুই ভাইকে উদ্ধার করে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের পরও ছোট ভাই আব্দুর রহমানের শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটতে থাকে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও শরীরের স্পর্শকাতর অংশে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হওয়ায় চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

​পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার আশায় ঢাকার একটি নামী বেসরকারি হাসপাতালে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। চিকিৎসকরা তার শরীরের বিষাক্ত সংক্রমণ ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি হাত কেটে বাদ দিলেও শেষ রক্ষা সম্ভব হয়নি। শুক্রবার সকালে চিকিৎসকদের সকল প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান এই তরুণ শিক্ষার্থী। অন্যদিকে, বড় ভাই হাসানের অবস্থা এখনো অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং বগুড়ার শজিমেক হাসপাতালের আইসিইউতে তিনি কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বেঁচে আছেন।

​সহপাঠী ও স্থানীয়দের ক্ষোভ এবং শোকের ছায়া

​আব্দুর রহমানের অকাল ও নির্মম মৃত্যুর খবর রায়গঞ্জে পৌঁছামাত্রই পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। রায়গঞ্জ বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনিক্যাল কলেজের শিক্ষক ও সহপাঠীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। সহপাঠীদের মতে, রহমান অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র, নম্র এবং প্রখর মেধার অধিকারী একজন ছাত্র ছিলেন। মাদকের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে তাকে এভাবে জীবন দিতে হবে, তা কেউ মেনে নিতে পারছেন না।

​এলাকাবাসী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা অবিলম্বে এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ও বখাটে টিটোন সহ সকল আসামিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার এবং সর্বোচ্চ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে এলাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে চোরের পৈশাচিক হামলায় মৃত্যুশয্যায় দাদি ও নাতনি, ধামাচাপার চেষ্টায় ধাওয়া

​মামলার অগ্রগতি ও প্রশাসনের আশ্বাস

​নৃশংস এই হামলার ঘটনার পর থেকেই প্রধান অভিযুক্ত টিটোন এবং তার পরিবারের সকল সদস্য বাড়ি-ঘর তালাবদ্ধ করে এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছে। ফলে এই বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

​আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে রায়গঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আহসানুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানান,

​"অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরপরই পুলিশের বিশেষ টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং আলামত সংগ্রহ করেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ঘাতকদের অবস্থান শনাক্ত করতে এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের একাধিক দল অভিযান পরিচালনা করছে। অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং দ্রুততম সময়ে চার্জশিট দাখিল করা হবে।"

​মাদকের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে একটি সম্ভাবনাময় প্রাণ ঝরে যাওয়ার এই ঘটনাটি সমগ্র সিরাজগঞ্জ জেলায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সচেতন মহল মনে করছেন, এখনই যদি তৃণমূল পর্যায়ে মাদকের আখড়া ও বখাটেদের দমন করা না হয়, তবে রহমানের মতো আরও অনেক মেধাবী সন্তানকে অকালে হারাতে হবে।

​সংবাদ সূত্র: রায়গঞ্জ থানা পুলিশ প্রশাসন ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন