প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন খাতকে সম্পূর্ণ শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে যুগান্তকারী এক বিপ্লব সাধিত হয়েছে। রাজধানী ঢাকা মহানগরীসহ দেশের অন্যতম ব্যস্ততম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন কৌশলগত পয়েন্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির আধুনিক ক্যামেরা এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের যৌথ উদ্যোগে ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ বা স্বয়ংক্রিয় জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়া পুরোপুরি চালু করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা এবং যত্রতত্র গাড়ি চালানোর সংস্কৃতি রোধে এই প্রযুক্তিগত নজরদারি এখন চালকদের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তার রূপ নিয়েছে। ঐতিহ্যগত ও ম্যানুয়াল ট্রাফিক পুলিশিংয়ের ধারণাকে পেছনে ফেলে ডিজিটাল প্রযুক্তির এই কঠোর চোখ ফাঁকি দেওয়া অপরাধীদের জন্য এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন এই এআই ক্যামেরার নিখুঁত স্ক্যানিংয়ের আওতায় আসছে, ফলে মুহূর্তের মধ্যে যেকোনো ছোট-বড় আইনভঙ্গকারী শনাক্ত হয়ে যাচ্ছে এবং আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় চলে আসছে।
আরও পড়ুন: বাদশাহ আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অভূতপূর্ব সাফল্য ও সংবর্ধনা
সড়ক নিরাপত্তার এই নতুন ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা নিখুঁত ও সুদূরপ্রসারী করা হয়েছে, তার প্রমাণ মিলছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিস্তীর্ণ এলাকাজ জুড়ে। এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে প্রায় ৪৯০টি পিলারের ওপর সুবিন্যস্তভাবে স্থাপন করা হয়েছে মোট ১ হাজার ৪২৭টি অতি সংবেদনশীল এআই ক্যামেরা। পাশাপাশি রাজধানী ঢাকার প্রধান প্রধান সড়ক ও মোড়ে মোড়ে বসানো হয়েছে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক মনিটরিং ব্যবস্থা। কোনো একটি যানবাহন যখন এই ক্যামেরাগুলোর আওতাধীন এলাকা অতিক্রম করে, তখন চালকের সামান্যতম অসতর্কতা বা ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন মুহূর্তের মধ্যে ক্যামেরার লেন্স বন্দি করে ফেলে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে সেই গাড়ির সমস্ত ডিজিটাল তথ্য এবং অপরাধের ধরন সরাসরি বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি বা বিআরটিএ-এর কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। এরপর মুহূর্তের কালক্ষেপণ না করে গাড়ির নিবন্ধিত মালিকের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে জরিমানার খুদে বার্তা বা এসএমএস পৌঁছে যায়, যা আধুনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক দুর্দান্ত নিদর্শন।
আরও পড়ুন: কুষ্টিয়ায় বিয়ের রাতে স্ট্যান্ড ফ্যান পড়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নববরের মৃত্যু
সড়ক পরিবহন আইন এবং এর নির্ধারিত বিধিমালা অনুযায়ী এআই ক্যামেরার নজরদারিতে যে অপরাধগুলোর জন্য কঠোর আর্থিক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে, সেগুলোর পরিধি বেশ বিস্তৃত। প্রথমত, নির্ধারিত গতিসীমা লঙ্ঘন করে অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো কিংবা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে ওভারটেকিং করার মতো মারাত্মক অপরাধগুলোর জন্য সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা ধার্য করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সড়কের ট্রাফিক সাইন, লেন নির্দেশিকা বা সড়ক বিভাজক সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বিপরীত দিক বা উল্টো পথে গাড়ি চালানোর মতো আত্মঘাতী প্রবণতার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে। তৃতীয়ত, ট্রাফিক সিগন্যালের লাল বাতি জ্বলার পরেও তা অমান্য করে গাড়ি চালিয়ে চলে যাওয়া এবং ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশক সাইন অবজ্ঞা করার অপরাধেও সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হচ্ছে। এই কঠোর বিধানগুলোর কারণে সড়কে চালকদের মধ্যে নিয়মানুবর্তিতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এছাড়া ব্যস্ততম মহাসড়ক বা রাজধানীর মূল সড়কে যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে বা পার্কিং করে কৃত্রিম যানজট ও তীব্র প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার মতো বিশৃঙ্খলা রোধেও এআই ক্যামেরাগুলো অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা সরাসরি ক্যামেরায় ধরা পড়ায় চালকদের উপস্থিতি ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা ও জরিমানা আরোপের প্রক্রিয়া চলছে। মোটরসাইকেল চালকদের ক্ষেত্রে সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হেলমেট পরিধানের ওপর বিশেষ নজরদারি রাখা হয়েছে। চালক বা পেছনে বসা সহযাত্রী হেলমেট না পরলে কিংবা একটি মোটরসাইকেলে আইন ভেঙে দুইয়ের অধিক যাত্রী বহন করলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা ধার্য করা হচ্ছে। আধুনিক এই প্রযুক্তির কড়া নজর থেকে রেহাই পাচ্ছে না চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের মতো বিপজ্জনক অভ্যাসগুলোও। গাড়ি চালানোর সময় কানে ফোন ব্যবহার করা কিংবা সিটবেল্ট না বেঁধে স্টিয়ারিং ধরার মতো অপরাধের জন্য বড় ও মাঝারি যানবাহনের ক্ষেত্রে ৩ হাজার টাকা এবং ছোট ব্যক্তিগত যানবাহনের ক্ষেত্রে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাটা হচ্ছে।
যানবাহনের প্রযুক্তিগত ফিটনেস এবং বৈধ কাগজপত্রের বিষয়েও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে ট্রাফিক প্রশাসন। নির্দিষ্ট মেয়াদোত্তীর্ণ বা ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি এবং কোনো ধরনের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই চালক গাড়ি চালালে অপরাধের তীব্রতা এবং যানের আকার বা ক্যাটাগরি ভেদে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিশাল অঙ্কের জরিমানার কঠোর আইনি বিধান কার্যকর রয়েছে। পাশাপাশি, গাড়ির পেছনে বা সামনে যথাযথ নম্বর প্লেট না থাকা, অস্পষ্ট বা বিকৃত নম্বর প্লেট লাগিয়ে জনদৃষ্টি এড়িয়ে চলার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত যানবাহনগুলোর বিরুদ্ধেও ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ধার্য করা হচ্ছে। একই অপরাধ একই গাড়ি বা চালক দ্বারা বারবার পুনরাবৃত্তি করা হলে শুধু আর্থিক জরিমানাতেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না, বরং অপরাধের পুনরাবৃত্তির কারণে সেই নির্দিষ্ট গাড়ির রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন সরাসরি বাতিল করার মতো কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
ডিজিটাল এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আরোপিত জরিমানার অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সহজ ও জনবান্ধব রাখা হয়েছে, যা ঘরে বসেই অনলাইনের মাধ্যমে বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহার করে খুব সহজেই পরিশোধ করা সম্ভব। তবে প্রযুক্তিভিত্তিক এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যারা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এআই ক্যামেরার নামে বিভিন্ন ভুয়া বা ফিশিং লিঙ্কে ক্লিক করার জন্য প্রলুব্ধ করে সাধারণ নাগরিকের পিন বা ওটিপি বা ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড হাতিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা রোধে ডিএমপির পক্ষ থেকে অত্যন্ত কড়া সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে যে, জরিমানা সংক্রান্ত কোনো বার্তার ক্ষেত্রে কখনো কোনো অপরিচিত লিঙ্কে ক্লিক করা বা ওটিপি শেয়ার করার প্রয়োজন হয় না। রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত নিরাপদ করতে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দেশের সার্বিক উন্নয়নে এক বিরাট মাইলফলক হয়ে থাকবে।
প্রতিবেদনের সূত্র: ডিএমপি নিউজ ও ট্রাফিক বিভাগ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।