গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে ঝুটের গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৫ ইউনিট

গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে ঝুটের গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৫ ইউনিট
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বাংলাদেশের ঘনবসতিপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত হওয়া আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো আমাদের জাতীয় অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এক একটি গভীর ক্ষতচিহ্ন এঁকে দিয়ে যায়। বিশেষ করে কাপড়ের উচ্ছিষ্টাংশ বা ঝুটসহ দাহ্য পদার্থে ভরপুর গুদামগুলোতে যখন কোনো কারণে আগুনের সূত্রপাত ঘটে, তখন মুহূর্তের মধ্যে তা ভয়ংকর রূপ ধারণ করে পুরো এলাকায় ত্রাসের সৃষ্টি করে। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানা এবং গুদামঘরগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা বা সতর্কতামূলক নিরাপত্তা সরঞ্জাম না থাকার কারণে ছোট একটি স্ফুলিঙ্গও বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড কেবল মালিকপক্ষের আর্থিক ক্ষতিই সাধন করে না, বরং এর বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ও তীব্র তাপ আশপাশের পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। শিল্পাঞ্চলের কঠোর মনিটরিং এবং কারখানার নিরাপত্তা আইন যথাযথভাবে কার্যকর করা না হলে এই ধরনের ধ্বংসাত্মক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব হয়ে উঠবে না। সম্প্রতি রাজধানী সংলগ্ন দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প এলাকা হিসেবে পরিচিত গাজীপুরের একটি জনবহুল জনপদে এমনই এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা চারদিকে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।

আরও পড়ুন: টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে পিকআপভর্তি মেয়াদোত্তীর্ণ সরকারি ওষুধ জব্দ, আটক এক

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এবং স্থানীয় সংবাদ সূত্রে প্রাপ্ত অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যানুযায়ী, চলতি সপ্তাহের গত ছাব্বিশ আগস্ট বুধবারের ঠিক সকালের দিকে এই আকস্মিক দুর্ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল। গাজীপুর মহানগরীর অত্যন্ত ব্যস্ততম ও জনবহুল এলাকা হিসেবে পরিচিত কোনাবাড়ীর দেওলিয়া বাড়ী সংলগ্ন একটি ঝুটের গুদামে হঠাৎ করেই এই ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত ঘটে। ওই দিন সকাল আনুমানিক আটটার দিকে গুদামঘরের ভেতর থেকে প্রচণ্ড পরিমাণে ঘন কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে আকাশে উঠতে দেখতে পান স্থানীয় কর্মীরা ও সাধারণ পথচারীরা। ধোঁয়া দেখতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকায় হৈচৈ পড়ে যায় এবং গুদামের ভেতরে থাকা শ্রমিক ও স্থানীয় লোকজন চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে বাইরে বেরিয়ে আসেন। ঝুটের গুদাম হওয়ায় মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা চারদিকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে এবং আশপাশের পরিবেশকে সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন করে ফেলে। তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় উৎসুক জনতা ও সাহসী যুবকরা নিজেদের উদ্যোগে বালতি এবং অন্যান্য পাত্রে পানি নিয়ে আগুন নেভানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালান, কিন্তু আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে তাদের সেই প্রাথমিক চেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে যায়।

আগুন দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার কারণে স্থানীয়দের পক্ষে একা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা অসম্ভব হয়ে পড়ায় তারা দ্রুত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরে খবর পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফায়ার সার্ভিসের একাধিক চৌকস দল অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঘটনাস্থলের দিকে রওনা দেয় এবং মুহূর্তের মধ্যে দুর্ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার মূল মিশনে অংশ নেওয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে ফায়ার সার্ভিসের মোট পাঁচটি আধুনিক ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয় এবং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ শুরু করে। এই উদ্ধারকারী দলগুলোর মধ্যে কোনাবাড়ী মডার্ন ফায়ার সার্ভিসের তিনটি সুসজ্জিত ইউনিট এবং তাদের সহায়তার জন্য সারাবো ফায়ার সার্ভিসের আরও দুটি ইউনিট সরাসরি অংশ নেয়। গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের সম্মানিত উপপরিচালক মোহাম্মদ মামুন সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বর্তমানে ফায়ার সার্ভিসের মোট পাঁচটি ইউনিট অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং পানি ছিটানোর আধুনিক পদ্ধতির কারণে আগুন চারপাশের অন্য আবাসিক ভবনগুলোতে ছড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা পাচ্ছে বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে।

আরও পড়ুন: বঙ্গোপসাগরে ইঞ্জিন বিকল হওয়া ১২ জেলেকে ৯৯৯-এর কল পেয়ে উদ্ধার করল কোস্টগার্ড

তবে আগুন লাগার এই আকস্মিক ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ঠিক কী কারণে বা কোন উৎস থেকে এই সূত্রপাত ঘটেছিল, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য জানা যায়নি। এছাড়া ঝুটের গুদামের ভেতরে ঠিক কী পরিমাণ মালামাল মজুত ছিল এবং কি পরিমাণ আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তাও তাৎক্ষণিক নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে সম্পূর্ণ আগুন নির্বাপণ করা সম্ভব হওয়ার পর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত সাপেক্ষে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ এবং সূত্রপাতের মূল কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো যাবে। অগ্নিকাণ্ডের এই ভয়াবহতার কারণে কোনাবাড়ীর দেওলিয়া বাড়ী এলাকার প্রধান সড়কে দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, যার ফলে সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং উৎসুক জনতাকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলোর যাতায়াত সুগম করেন।

এই অপ্রত্যাশিত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি শিল্পাঞ্চলের অন্যান্য ঝুট গুদাম এবং কারখানার মালিকদের মনে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়টি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকার ঠিক মাঝখানে এভাবে দাহ্য পদার্থের গুদাম পরিচালনা করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেছেন। তারা অবিলম্বে এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ গুদামগুলো জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এমন বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে আগুন নেভানোর জন্য এখনো কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং খুব শীঘ্রই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে। দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে নিয়মিত ফায়ার ড্রিল পরিচালনা করা এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রের উপস্থিতি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

পরিশেষে বলা যায় যে, গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ীতে ঝুটের গুদামে সংঘটিত এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড আমাদের শিল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম ত্রুটিগুলোকে আরও একবার অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উন্মোচন করেছে। সৌভাগ্যবশত কোনো বড় ধরনের প্রাণহানির খবর পাওয়া না গেলেও এই ধরনের দুর্ঘটনা যেকোনো মুহূর্তে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আমরা এই দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের প্রতি সমবেদনা জানাই এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের কঠোর নজরদারি কামনা করি। শিল্পাঞ্চলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক—এটাই আজকের দিনে আমাদের সকলেরকান্ত প্রত্যাশা।

প্রতিবেদনের সূত্র: ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা ও স্থানীয় সংবাদাতা।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন