প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকার অদম্য জেলেরা প্রতিদিন জীবন বাজি রেখে বঙ্গোপসাগরের বুকে মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান, যা দেশের মৎস্য খাত ও অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। তবে সমুদ্রের উন্মাতাল ঢেউ, আবহাওয়া বৈরিতা এবং আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায়ই মাঝসাগরে চরম বিপদের মুখে পড়তে হয় এই সমস্ত সাধারণ পেশাজীবী মানুষদের, যাদের জীবন রক্ষা করার জন্য আধুনিক উদ্ধার তৎপরতা অত্যন্ত আবশ্যক। সঠিক সময়ে যোগাযোগের অভাবে অতীতে সাগরে বহু জেলে নিখোঁজ হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলেও বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষ এবং জরুরি সেবার কারণে বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বিপদে পড়া মানুষের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ আবির্ভূত হওয়া জাতীয় জরুরি সেবা নম্বরটি বর্তমানে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে আস্থার এক অনন্য প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরের উত্তাল তরঙ্গের মাঝে এমন এক লোমহর্ষক ও সংকটজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, যেখানে একদল জেলে মৃত্যুর মুখ থেকে পুনরায় নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি কলের বদৌলতে।
আরও পড়ুন: কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ঋণের দায়ে ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত পঁচিশ আগস্ট তারিখে সেন্টমার্টিন দ্বীপের নিকটবর্তী গভীর বঙ্গোপসাগর এলাকা থেকে অত্যন্ত আকস্মিক ও ভীতিপ্রদ এই সংবাদটি জাতীয় জরুরি সেবায় এসে পৌঁছায়। ভুক্তভোগী জেলে দলের মধ্য থেকে আতঙ্কিত একজন কলার জাতীয় জরুরি সেবা নম্বরটিতে সরাসরি ফোন কল করে জানান যে তাদের গোটা দলটি চরম খাদ্য সংকটের মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায় যে, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ এলাকা থেকে একটি ট্রলারে চড়ে মোট বারোজন জেলে গত কুড়ি আগস্ট তারিখে সাগরে মাছ ধরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলেন। সাগরের বুকে অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে তারা যখন মাছ শিকারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই গত বাইশে আগস্ট শনিবার তাঁদের নৌযানের মূল ইঞ্জিনটি হঠাৎ করে পুরোপুরি বিকল হয়ে যায়। এর ফলে মাঝসাগরে তাদের ট্রলারটি সম্পূর্ণ গতিহীন হয়ে পড়ে এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপের কাছাকাছি বঙ্গোপসাগরের উন্মুক্ত অংশে ভাসমান অবস্থায় নোঙর করতে বাধ্য হন তারা।
ইঞ্জিনটি সচল করার জন্য মাঝসাগরে আটকে পড়া ওই জেলেরা নিজেদের সাধ্যমতো সব ধরনের চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হন এবং আস্তে আস্তে তাদের সঙ্গে থাকা রসদ ফুরিয়ে আসতে শুরু করে। সাগরে দিনের পর দিন কাটিয়ে দেওয়ার ফলে নৌযানের ভেতরে থাকা সমস্ত খাবার এবং পানীয় জল পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়, যার ফলে তারা চরম শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির মুখে পড়েন। উত্তাল সাগরের মাঝে খাবার ও পানির এক ফোঁটার জন্য হাহাকার অবস্থার সৃষ্টি হওয়ায় তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসছিল এবং তারা চরম হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। এই চরম মুহূর্তে তাদের একমাত্র ভরসাস্থল হিসেবে কাজ করে একটি সচল মোবাইল ফোন, যার মাধ্যমে তারা শেষ চেষ্টা হিসেবে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বরটিতে কল করার সিদ্ধান্ত নেন। কলার অত্যন্ত আকুল আবেদন জানিয়ে ৯৯৯ নম্বরের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের কাছে অনুরোধ করেন যেন দ্রুত তাদের অবস্থান চিহ্নিত করে উদ্ধার করা হয়, নতুবা তারা অনাহারে সাগরেই মারা যাবেন।
আরও পড়ুন: ফরিদপুরে মাদক সেবনের ভিডিও ধারণ নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, পুলিশের গাড়িতে হামলা
জাতীয় জরুরি সেবা কেন্দ্র থেকে অত্যন্ত পেশাদারিত্ব ও দ্রুততার সঙ্গে এই সংবাদের গুরুত্ব অনুধাবন করে তাৎক্ষণিকভাবে সেন্টমার্টিন কোস্টগার্ডের কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হয় এবং উদ্ধার তৎপরতা শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই মুহূর্তে ৯৯৯ কল সেন্টারে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কলটি রিসিভ করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন কলটেকার কনস্টেবল সৌরভ দাস, যিনি অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে জেলের পুরো বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। একই সঙ্গে উদ্ধার কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট সেন্টমার্টিন কোস্টগার্ডের অপারেশনাল টিমের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা এবং পুরো বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদারকি ও সমন্বয় করার গুরুদায়িত্ব পালন করেন ৯৯৯ পুলিশ ডিসপাচার এএসআই তাসলিমা আক্তার। এই দুই দায়িত্বশীল কর্মীর নিখুঁত সমন্বয় এবং সময়মতো নেওয়া সিদ্ধান্তের ফলেই দুর্গত জেলেদের সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছিল।
সংবাদ প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই সেন্টমার্টিন কোস্টগার্ডের একটি সুসজ্জিত ও চৌকস উদ্ধারকারী দল দ্রুত গতিসম্পন্ন জলযানে চড়ে গভীর সাগরের নির্দিষ্ট স্থানাঙ্কের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায় এবং বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে অভিযান শুরু করে। কোস্টগার্ডের উদ্ধারকারী দল সাগরের বিশাল ঢেউ ও প্রতিকূল পরিবেশ পেরিয়ে ঠিক সময়ে আটকে পড়া জেলেদের নৌযানের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয় এবং তাদের মুখে আশার আলো দেখতে পায়। উদ্ধারকারীরা প্রথমে অত্যন্ত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত জেলেদের হাতে প্রয়োজনীয় খাবার এবং বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ করেন, যা তাদের শারীরিক শক্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। পরবর্তীতে বিকল হয়ে যাওয়া নৌযানটিসহ ওই বারোজন জেলেকে সম্পূর্ণ নিরাপদে উদ্ধার করে সেন্টমার্টিনের নিকটবর্তী নিরাপদ স্থানে সফলভাবে ফিরিয়ে আনা হয়, যার মাধ্যমে একটি সম্ভাব্য বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া জেলেরাসহ স্থানীয় এলাকাবাসী জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এবং কোস্টগার্ডের এই মহৎ ও সাহসী উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। সাগরে নিয়মিত যাতায়াতকারী অন্যান্য জেলেরাও এই ঘটনায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সহায়তার এই ব্যবস্থার কারণে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা হলেও আশ্বস্ত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জরুরি সেবার কর্মীরা প্রমাণ করেছেন যে দেশের যেকোনো প্রান্তে বিপদে পড়া সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে তারা সর্বদা সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছেন। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ের উদ্ধারকারী দলগুলোর দ্রুত পদক্ষেপের ফলেই আজ বারটি তাজা প্রাণ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসতে পেরেছে, যা সমগ্র দেশবাসীর মনে গভীর দাগ কেটেছে।
পরিশেষে বলা যায় যে, সেন্টমার্টিনের নিকটবর্তী বঙ্গোপসাগরে ইঞ্জিন বিকল হয়ে খাদ্য সংকটে পড়া বারোজন জেলেকে ৯৯৯ নম্বরের মাধ্যমে সফলভাবে উদ্ধারের এই ঘটনাটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় একটি সাফল্য। জাতীয় জরুরি সেবা এবং কোস্টগার্ডের এই যৌথ ও সময়োপযোগী অভিযান প্রমাণ করে যে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবন সুরক্ষায় রাষ্ট্র সবসময় সজাগ ও প্রস্তুত রয়েছে। আমরা আশা করি আমাদের দেশের জেলেরা সাগরে যাওয়ার সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যাত্রা করবেন যাতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো যায়। উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষায় এবং এই ধরনের জরুরি উদ্ধার তৎপরতা ভবিষ্যতেও আরও বেশি গতিশীল ও কার্যকর থাকবে—এটাই সকলের প্রত্যাশা।
প্রতিবেদনের সূত্র: জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ ও কোস্টগার্ড মিডিয়া সেল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।