মহাসড়কে দুর্ঘটনা রোধ ও জীবন বাঁচাতে অত্যাধুনিক অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালুর উদ্যোগ

মহাসড়কে দুর্ঘটনা রোধ ও জীবন বাঁচাতে অত্যাধুনিক অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালুর উদ্যোগ
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: সুফিয়ান নোমান / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন নেটওয়ার্কে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন অত্যন্ত ব্যস্ততার সঙ্গে চলাচল করে থাকে, যা দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে সচল রাখার ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দেশের বিভিন্ন জাতীয় মহাসড়কে প্রায়ই ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর কারণে বহু মূল্যবান প্রাণ অকালে ঝরে যায় এবং অসংখ্য মানুষ গুরুতর আহত হয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ করেন। দুর্ঘটনার পরবর্তী অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্তগুলোতে সঠিক সময়ে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান এবং দ্রুত গতিতে কোনো হাসপাতালে রোগীকে স্থানান্তর করার উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাবে অনেক সময় পথেই আহতের মৃত্যু ঘটে। এই জাতীয় সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করার জন্য এবং মহাসড়কে চলাচলকারী সাধারণ মানুষের যাতায়াত নিরাপদ করার লক্ষে বর্তমান সরকার অত্যন্ত দূরদর্শী এবং যুগান্তকারী একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যৌথ ও সমন্বিত নির্দেশনার আওতায় একটি বিশেষ পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

আরও পড়ুন: বাউফলের বগা ইউনিয়নে মাদকবিরোধী অভিযানে শ্রমিক দলের নেতা গ্রেপ্তার

প্রস্তাবিত এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কল্যাণমুখী পরিকল্পনার মূল অবকাঠামোগত কাঠামোর আওতায় দেশের প্রায় পাঁচশ কিলোমিটার দীর্ঘ গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক জুড়ে সর্বমোট ষাটটি অত্যাধুনিক মানের 'বেসিক লাইফ সাপোর্ট' বা সংক্ষেপে বিএলএস অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন করা হবে। এই বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্সগুলোতে সাধারণ রোগী পরিবহনের সুবিধার পাশাপাশি আহত ব্যক্তির জীবন বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী ও প্রশিক্ষিত কর্মী উপস্থিত থাকবে, যা দুর্ঘটনার পর তাৎক্ষণিক সেবাপ্রদানে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় কৌশলগত বৈশিষ্ট্য হলো যে, নির্ধারিত ওই পাঁচশ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়ক জুড়ে প্রতি ঠিক দশ কিলোমিটার দূরত্ব পরপর একটি করে অ্যাম্বুলেন্স সর্বদা প্রস্তুত অবস্থায় মোতায়েন থাকবে। দিন ও রাতের চব্বিশ ঘণ্টা অর্থাৎ চব্বিশ সাত দিনই এই অ্যাম্বুলেন্সগুলো তাদের নির্দিষ্ট পয়েন্টে অবস্থান করবে এবং একটি সুসজ্জিত কেন্দ্রীয় কল সেন্টারের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় সার্বিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। কোনো স্থানে দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে কল সেন্টারে তথ্য পৌঁছানোর সাথে সাথেই নিকটস্থ অ্যাম্বুলেন্সটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে দুর্ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হয়ে যাবে এবং ন্যূনতম সময়ে রোগীকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে এই উচ্চাভিলাষী এবং জনকল্যাণকর প্রকল্পটি দেশের সবচেয়ে ব্যস্ততম এবং গুরুত্বপূর্ণ তিনটি প্রধান করিডোরের ওপর ভিত্তি করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যার সুফল কোটি কোটি মানুষ ভোগ করবেন। এই করিডোরগুলোর মধ্যে রয়েছে জয়দেবপুর থেকে রাজশাহীগামী মহাসড়ক, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম হাটিকুমরুল থেকে রংপুর মহাসড়ক এবং শিল্পসমৃদ্ধ জয়দেবপুর থেকে ময়মনসিংহগামী সড়ক পথ। এই নির্দিষ্ট রুটগুলোতে চলাচলকারী যাত্রী ও চালকদের জন্য এই বিশেষ জরুরি চিকিৎসা সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হবে, যা সাধারণ মানুষের আর্থিক বোঝা অনেকাংশে লাঘব করবে। সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পর চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত প্রথম এক ঘণ্টা বা গোল্ডেন আওয়ারের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই এই প্রকল্পের মূল ও প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পরপরই এই সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি আহত ব্যক্তিকে যথাযথ প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করে দ্রুত কোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়, তবে বহু মানুষের অমূল্য প্রাণ রক্ষা করা অনেক বেশি সহজ হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন: ভাঙ্গায় বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে নিয়ে ছোট ভাইয়ের পলায়ন ও থানায় সংঘর্ষ

কেবল মহাসড়কগুলোতেই নয়, বরং রাজধানী ঢাকার ভেতর তীব্র যানজটের কারণে যেন কোনো অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি সেবা বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটির জন্যও বিশেষ বিকল্প ব্যবস্থার চিন্তাভাবনা করা হয়েছে। যানজটপূর্ণ শহুরে রাস্তায় খুব দ্রুত চলাফেরা করার জন্য চল্লিশটি বিশেষ মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স নিয়োজিত রাখার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যা যেকোনো সরু গলিতে বা জ্যামের ভেতরে ঢুকে আহত ব্যক্তির কাছে দ্রুত পৌঁছাতে পারবে। এর পাশাপাশি মহাসড়কগুলোর ঠিক পাশেই বসবাসকারী স্থানীয় এলাকাবাসী এবং যুবসমাজকে একত্রিত করে একটি বিশেষ স্বেচ্ছাসেবী ভলান্টিয়ার দল গঠন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলটিকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও উদ্ধারের ওপর প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে, যাতে মূল অ্যাম্বুলেন্স বা চিকিৎসকরা পৌঁছানোর আগেই তারা দুর্ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান করতে পারে। সরকারি এই বহুমুখী উদ্যোগ এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ একত্রিত হয়ে দেশের সড়ক দুর্ঘটনা পরবর্তী মৃত্যুর হার নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।

দেশের পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সরকারের এই বহুমুখী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের তীব্র প্রশংসা করেছেন এবং এটি সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট পরামর্শ প্রদান করেছেন। তাদের মতে, এই প্রকল্প শুধু একটি সাময়িক উদ্যোগ নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও বেশি মানুষের জীবনমুখী ও নিরাপদ করে তুলতে এক বিশাল ভূমিকা পালন করবে। আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, কেন্দ্রীয় কল সেন্টারের নিখুঁত কর্মতৎপরতা এবং মাঠপর্যায়ে নিয়োজিত অ্যাম্বুলেন্স চালক ও চিকিৎসকদের আন্তরিকতা এই প্রকল্পের চূড়ান্ত সাফল্য নির্ধারণ করবে। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর এই যৌথ প্রয়াস দেশের প্রতিটি নাগরিকের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে এবং ভবিষ্যতে এই সেবার পরিধি আরও দীর্ঘ ও বিস্তৃত হবে বলে সকলে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করছেন।

পরিশেষে বলা যায় যে, দেশের মহাসড়কে দুর্ঘটনা পরবর্তী প্রাণহানি কমাতে এবং আহতদের দ্রুত উদ্ধার করতে ৫০০ কিলোমিটার সড়ক জুড়ে ৬০টি অত্যাধুনিক বিএলএস অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েনের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। গোল্ডেন আওয়ারের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, নিখুঁত কল সেন্টার ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে গড়া এই বহুমুখী নেটওয়ার্ক সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মারাত্মক ঝুঁকি বহুলাংশে হ্রাস করবে। আমরা আশা করি এই পাইলট প্রকল্পটি অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হবে এবং পরবর্তীতে এর পরিধি বাড়িয়ে পুরো দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ককে এই সেবার আওতাভুক্ত করা সম্ভব হবে। নিরাপদ সড়ক এবং সুরক্ষায় সরকারের এই আন্তরিক প্রচেষ্টা দেশের সাধারণ মানুষের যাতায়াতকে আরও বেশি স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ করে তুলবে—এটাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

প্রতিবেদনের সূত্র: সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন