বাদশাহ আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অভূতপূর্ব সাফল্য ও সংবর্ধনা

বাদশাহ আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অভূতপূর্ব সাফল্য ও সংবর্ধনা
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

পবিত্র কুরআনের নূর এবং সুরের সুষমায় মুখরিত মধ্যপ্রাচ্যের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র পবিত্র মক্কা নগরীতে সম্প্রতি সমাপ্ত হওয়া অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতার মঞ্চে এক অবিস্মরণীয় ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ। ইসলাম ধর্মের অন্যতম প্রধান ও সর্বোচ্চ সম্মানজনক এই প্রতিযোগিতার ৪৬তম আসরে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি বাংলাদেশি প্রতিযোগী অসাধারণ প্রতিভা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে নিজ নিজ গ্রুপে শীর্ষস্থান অধিকার করার দুর্লভ গৌরব অর্জন করেছেন। বিশ্বমঞ্চের এই মহোৎসবে লাল-সবুজের পতাকা উঁচু করে ধরে বাংলাদেশের কৃতি সন্তানরা প্রমাণ করেছেন যে, ইসলামী শিক্ষার সঠিক চর্চা এবং কুরআনের পঠন-পাঠনে এ দেশের তরুণ প্রজন্ম কতটা মেধাবী ও উৎকর্ষমণ্ডিত। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এই ঐতিহাসিক অর্জনে পুরো দেশজুড়ে বইছে আনন্দের জোয়ার এবং ধর্মপ্রাণ মানুষের মাঝে বিরাজ করছে গভীর উল্লাস ও গর্বের অনুভূতি।

আরও পড়ুন: দীর্ঘ ৪১ বছরের চাকরি শেষে কনস্টেবল শের আলীর ব্যতিক্রমী বিদায়

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায় অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাছাইকৃত অত্যন্ত মেধাবী ও দক্ষ হাফেজরা অংশ নিয়েছিলেন। সেই তুমুল প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও কঠোর বাছাইয়ের ধাপ পেরিয়ে বাংলাদেশের চারজন কৃতি প্রতিযোগী সেরাদের তালিকায় নিজেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করে নিয়েছেন। প্রতিযোগিতার চতুর্থ গ্রুপে অত্যন্ত চমৎকার তিলাওয়াত ও মুখস্থ বিদ্যার পটুত্ব দেখিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করার দুর্লভ কীর্তি গড়েছেন মেধাবী হাফেজ মুহাম্মদ জাকারিয়া। বিচারকদের নজর কেড়ে প্রথম স্থান অর্জন করার সুবাদে তিনি পুরস্কার হিসেবে লাভ করেছেন ১ লাখ ৫০ হাজার সৌদি রিয়াল, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫০ লাখ টাকার সমপরিমাণ। একই গ্রুপের নারী প্রতিযোগীদের বিভাগে অত্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জন করে তৃতীয় স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করেছেন মেধাবী হাফেজা রাবেতা বিনতে রমজান, যিনি বিশ্বমঞ্চে নারী সমাজের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

আরও পড়ুন: বগুড়ায় স্কুল বাস খাদে পড়ে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীর মৃত্যু, আহত আরও পনেরো জন

সাফল্যের ধারা এখানেই থেমে থাকেনি; বরং প্রতিযোগিতার অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ তৃতীয় গ্রুপেও বাংলাদেশ তার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। এই গ্রুপে পুরুষ ও নারী উভয় বিভাগেই অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে তৃতীয় স্থান দখল করেছেন যথাক্রমে হাফেজ শেখ মুহাম্মদ মাহমুদুল হাসান এবং মেধাবী হাফেজা মুসফিরা বিনতে মাহমুদ। বিশ্বমানের এই প্রতিযোগিতায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করায় তারা প্রত্যেকেই পুরস্কার হিসেবে লাভ করেছেন ১ লাখ ৩০ হাজার সৌদি রিয়াল করে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে বাংলাদেশের এই তরুণ হাফেজরা যেভাবে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন, তা দেশের প্রতিটি নাগরিককে আবেগাপ্লুত করেছে। কঠোর সাধনা, গভীর মনযোগ এবং ওস্তাদদের নিখুঁত তালিম ছাড়া এই মাত্রার আন্তর্জাতিক সাফল্য অর্জন করা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়, যা আজ বিশ্ববাসীর সামনে আরও একবার স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো।

বিশ্বজয়ী এই কৃতি হাফেজরা যখন পবিত্র মক্কার মাটিতে গৌরব অর্জন শেষে নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন তাদের বরণ করে নেওয়ার জন্য রাজধানী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ঐতিহাসিক ও রাজকীয় সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। গত শুক্রবার ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়ে এই বিশ্বজয়ী সন্তানদের বর্ণাঢ্য অভ্যর্থনা জানানো হয়। বর্তমান সরকারের মাননীয় ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইনের (কায়কোবাদ) বিশেষ নির্দেশনায় ধর্ম মন্ত্রণালয় এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়ে ফুল দিয়ে তাদের উষ্ণ অভিনন্দন জানান। যদিও অসুস্থতার কারণে মন্ত্রী মহোদয় স্বয়ং উপস্থিত থাকতে পারেননি, তবুও তিনি একটি বিশেষ বার্তার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক অর্জনকে গোটা জাতির জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও গৌরবের বলে অভিহিত করেছেন। পাশাপাশি, খুব দ্রুতই মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কৃতি হাফেজদের সংবর্ধনা প্রদান করা হবে বলে তিনি তার ওই বার্তায় ঘোষণা দিয়েছেন।

পবিত্র কুরআনের হাফেজদের এই আন্তর্জাতিক বিজয় কেবল ব্যক্তিগত কোনো সাফল্য নয়, বরং এটি সমগ্র বাংলাদেশ জাতির জন্য এক অসামান্য ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অর্জন। বিশ্বমঞ্চে যখন বাংলাদেশের পতাকা পতপত করে উড়েছে এবং প্রতিযোগীদের গলায় অর্জিত পুরস্কারের পদক ঝুলেছে, তখন বিশ্বদরবারে দেশের মর্যাদা বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। শাহজাদপুরসহ সারা দেশের মাদ্রাসা, মক্তব এবং সাধারণ মানুষের মাঝে এই বিজয় নতুন এক প্রাণপ্রবাহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। নতুন প্রজন্মের কোমলমতি শিশুরা এই হাফেজদের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে পবিত্র কুরআন হেফজ করার প্রতি আরও বেশি মনোযোগী হয়ে উঠবে বলে শিক্ষক ও অভিভাবকরা আশা প্রকাশ করছেন। দেশের ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার এবং এর গুণগত মান যে বিশ্বমানের পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার জ্বলন্ত প্রমাণ হলো এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাগুলোর ফলাফল।

পরিশেষে বলা যায় যে, সৌদি আরবের মক্কায় অনুষ্ঠিত এই ৪৬তম বাদশাহ আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতার প্রতিটি পর্যায়ে বাংলাদেশের বিজয়ীরা যে আত্মত্যাগ, মেধা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন, তা আগামী প্রজন্মের জন্য চিরকাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করায় দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন কৃতি হাফেজদের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছে। সংবর্ধনা ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতেও দেশের তরুণরা আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে আরও বড় বড় গৌরব বয়ে আনতে সক্ষম হবে। বিশ্বজয়ী এই হাফেজদের মাধ্যমে বাংলাদেশের পতাকা বিশ্বমঞ্চে চিরউজ্জ্বল থাকুক এবং তাদের এই মহৎ সাধনা অবিরত চলতে থাকুক—এটাই সমগ্র দেশবাসীর ঐকান্তিক প্রত্যাশা।

প্রতিবেদনের সূত্র: ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন