দীর্ঘ ৪১ বছরের চাকরি শেষে কনস্টেবল শের আলীর ব্যতিক্রমী বিদায়

দীর্ঘ ৪১ বছরের চাকরি শেষে কনস্টেবল শের আলীর ব্যতিক্রমী বিদায়
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

সরকারি চাকরিজীবীদের পেশাগত জীবনের পরিধি সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকলেও মাঝে মাঝে এমন কিছু বিরল ও হৃদয়স্পর্শী ঘটনা সামনে আসে, যা সাধারণ মানুষের গণ্ডি পেরিয়ে ইতিহাস হয়ে ওঠে। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠা, সাহসিকতা এবং পরম দায়িত্ববোধের সঙ্গে দেশ ও জনগণের সেবা করার পর অবশেষে অবসর জীবনের সোনালী দরজায় এসে উপস্থিত হয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের একজন নিবেদিতপ্রাণ ও প্রবীণ সদস্য। সুদীর্ঘ প্রায় একচল্লিশ বছর আট মাসের এক বর্ণাঢ্য এবং কর্মমুখর চাকরি জীবন সফলভাবে সম্পন্ন করার পর কনস্টেবল মোহাম্মদ শের আলীকে অত্যন্ত সম্মানজনক ও ব্যতিক্রমী এক আয়োজনের মধ্য দিয়ে রাজকীয় বিদায় জানিয়েছেন তার কর্মস্থলের সহকর্মীরা। গত শুক্রবার চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানায় কর্মরত এই পুলিশ সদস্যকে যেভাবে অভিনব কায়দায় বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে, তা শুধু ওই থানা এলাকা কিংবা পুলিশ বিভাগেই নয়, বরং পুরো দেশের মানুষের হৃদয়ে গভীর দাগ কেটেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।

আরও পড়ুন: মির্জা ফখরুলকে ইরানের প্রেসিডেন্টের অভিনন্দন

চাকরি জীবনের শেষ কর্মদিবসটি কেবল একজন সরকারি কর্মচারীর দাপ্তরিক সমাপ্তি নয়, বরং এটি তার জীবনের দীর্ঘ আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় স্বীকৃতি। চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানায় শুক্রবারের সকালটি ছিল অন্যান্য সাধারণ দিনের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা ও আবেগঘন এক পরিবেশের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া একটি বিশেষ দিন। থানার ভেতরে ও বাইরে কর্মরত সকল পুলিশ কর্মকর্তা এবং কনস্টেবলরা মিলে তাদের এই প্রিয় সহকর্মীকে জীবনের শেষ কর্মদিবসে এমন এক সম্মান জানানোর প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, যা সাধারণত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও খুব একটা দেখা যায় না। থানার প্রধান ফটকের সামনে সুসজ্জিত একটি চার চাকার গাড়ি ফুল দিয়ে অসাধারণ এক রূপ দেওয়া হয়েছিল। চারদিকে হরেক রকমের তাজা ফুলের পাঁপড়ি এবং রঙিন মালায় সাজানো সেই গাড়িতে যখন কনস্টেবল মোহাম্মদ শের আলীকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে বসানো হলো, তখন উপস্থিত সবার মুখেই ছিল ভালোবাসার মৃদু হাসি এবং চোখে ছিল কৃতজ্ঞতার অশ্রু।

সবচেয়ে আবেগঘন এবং স্মরণীয় মুহূর্তটি তৈরি হয় যখন থানার অন্যান্য পুলিশ সদস্যরা কোনো ধরনের যান্ত্রিক শক্তির সাহায্য না নিয়ে নিজেদের দুই হাতের শক্তি দিয়ে রশি লাগিয়ে ওই ফুলসজ্জিত গাড়িটি টানতে শুরু করেন। সহকর্মীরা নিজেরা গাড়িটির সামনে রশি ধরে পরম যত্নে টেনে টেনে থানার মূল ফটক এবং চত্বর পেরিয়ে বাইরে নিয়ে যান, যেন এটি কোনো রাজকীয় সংবর্ধনা মঞ্চ। দীর্ঘ প্রায় বিয়াল্লিশ বছর ধরে যিনি প্রতিদিন সহকর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনগণের নিরাপত্তায় নিজের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন, তার শেষ বিদায়ের এই দৃশ্যটি উপস্থিত কাউকেই চোখের জল ধরে রাখতে দেয়নি। সহকর্মীদের এই অককৃত্রিম ভালোবাসায় এবং নজিরবিহীন সম্মানে অভিভূত হয়ে পড়েন প্রবীণ এই পুলিশ সদস্য। তার দীর্ঘ জীবনের পেশাগত সাধনা এবং সততার এমন মধুর স্বীকৃতি দেখে তার দুই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে আনন্দের অশ্রু, যা উপস্থিত সবাইকে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করে তোলে।

আরও পড়ুন: নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ১৭ কেজি গাঁজাসহ তিন মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার

১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে একজন সাধারণ কনস্টেবল হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন মোহাম্মদ শের আলী। তখন থেকেই শুরু হয় তার সুদীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ অথচ গৌরবের পথচলা। দীর্ঘ চার দশকের এই কর্মজীবনে তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল জেলা ও মেট্রোপলিটন এলাকায় অত্যন্ত সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। পার্বত্যাঞ্চলের দুর্গম ও চ্যালেঞ্জিং জনপদ রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন থানায় তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীতে রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম ট্রাফিক ও নিরাপত্তা বলয় ঢাকা মহানগর পুলিশ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি কক্সবাজার জেলা এবং নদীমাতৃক লক্ষ্মীপুর জেলার বিভিন্ন থানায় তিনি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। চাকরি জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে জীবনের শেষ এক বছর তিনি চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানায় অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে তার কর্মজীবনের ইতি টানলেন।

দীর্ঘ এই কর্মজীবনে মোহাম্মদ শের আলী অসংখ্য উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়েছেন, দেখেছেন রাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন। কিন্তু এসবের মাঝেও তার পেশাগত সততা, শৃঙ্খলা এবং কর্তব্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা কখনো একচুলও নড়চড় হয়নি। একজন কনস্টেবল পদে থেকে তিনি যেভাবে নিজের ওপর অর্পিত প্রতিটি দায়িত্ব পালন করেছেন, তা জুনিয়র পুলিশ সদস্যদের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সহকর্মীরা জানিয়েছেন যে, শের আলী ভাই শুধু একজন সিনিয়র কনস্টেবলই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন আনোয়ারা থানার সকল তরুণ পুলিশের অভিভাবক ও পরম বন্ধু। তার সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখ, কাজের প্রতি একাগ্রতা এবং জুনিয়রদের প্রতি স্নেহের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মানসিকতা তাকে সবার কাছে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। অবসরে যাওয়ার প্রাক্কালে সহকর্মীদের এই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ প্রমাণ করে যে, মানুষের মন জয় করতে পদের চেয়ে মনের বড়ত্বের প্রয়োজন বেশি হয়।

পুলিশ বাহিনীর মতো একটি কঠোর শৃঙ্খলিত পেশায় দীর্ঘ একচল্লিশ বছর আট মাস কাটিয়ে একজন পুলিশ সদস্য যখন সম্পূর্ণ সুস্থ শরীরে এবং সম্মানজনকভাবে বিদায় নেন, তখন সেটি এক বিরল সৌভাগ্যের বিষয়। কনস্টেবল মোহাম্মদ শের আলীর এই বিদায় অনুষ্ঠান দেশের সমগ্র চাকরিজীবী সমাজের জন্য একটি দারুণ অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। সততা, নিষ্ঠা এবং আন্তরিকতা থাকলে যেকোনো সাধারণ পদ থেকেও মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে নেওয়া সম্ভব, তার জ্বলন্ত প্রমাণ এই বিদায়বেলা। আনোয়ারা থানার পক্ষ থেকে তাকে সম্মাননা স্মারক এবং ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি তার উত্তরোত্তর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং অবসর পরবর্তী শান্তিময় জীবন কামনা করা হয়। প্রিয় সহকর্মীকে এভাবে অশ্রুসিক্ত ও আনন্দঘন পরিবেশে বিদায় জানানোর মধ্য দিয়ে পুলিশ সদস্যদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিক সম্পর্কের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ ঘটেল, যা চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

প্রতিবেদনের সূত্র: স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন