কলকাতায় বাংলাদেশি পর্যটকদের হোটেল পাড়ায় অভিযান, ৮ হোটেল সিলগালা

কলকাতায় বাংলাদেশি পর্যটকদের হোটেল পাড়ায় অভিযান, ৮ হোটেল সিলগালা
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

প্রতিবেশী বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ভারতে চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা এবং অবসর সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে ভ্রমণকারী বাংলাদেশি পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত থাকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী কলকাতার বিভিন্ন পরিচিত অঞ্চল। বিশেষ করে কলকাতার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নিউ মার্কেট এলাকার মারকুইস স্ট্রিট এবং তার পার্শ্ববর্তী অলিগলিগুলো যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ভ্রমণপিপাসুদের প্রধান আবাসনস্থল বা হোটেল পাড়া হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক এই অঞ্চলে অবস্থান করে তাদের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা, চিকিৎসাসংক্রান্ত কাজ এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলের আবাসিক হোটেলগুলোর অবকাঠামোগত নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আইনি তদারকি নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা ধরনের প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল। সাধারণ পর্যটকদের জীবনযাত্রার মান এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি বর্তমানে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্ব লাভ করেছে, যার ফলে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: ফরিদপুর থেকে নিখোঁজ যুবক ময়মনসিংহে উদ্ধার, ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি

ঘটনার সুনির্দিষ্ট পটভূমি এবং কলকাতার স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে প্রাপ্ত দাপ্তরিক ও অনুসন্ধানী তথ্যাবলি থেকে বিস্তারিতভাবে জানা যায় যে, ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী আজকের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিনটি অর্থাৎ গত ২০ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার ঠিক পরপরই কলকাতার এই জনবহুল হোটেল পাড়ায় একটি আকস্মিক ও বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হয়। কলকাতার নিউ মার্কেটের মারকুইস স্ট্রিট সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশি পর্যটক অধ্যুষিত আবাসিক হোটেলগুলোতে এই বিশেষ যৌথ অভিযানটি পরিচালিত হয়, যেখানে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ প্রশাসন এবং নগর নিগমের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। এই ঝটিকা অভিযانের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রতিটি হোটেলের অন্দরে ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম বা অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কীরকম রয়েছে এবং জরুরি কোনো পরিস্থিতিতে মুহূর্তের মধ্যে ভবনটি সম্পূর্ণ খালি করার মতো প্রশস্ত সিঁড়ি বা পর্যাপ্ত পথ খোলা আছে কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে দেখা। আর এই আকস্মিক পরিদর্শনের পরই প্রশাসনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, যা গোটা হোটেল ব্যবসায়ীদের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিচালিত এই নিবিড় অভিযানের ফলশ্রুতিতে মারকুইস স্ট্রিট এলাকার মোট ৮টি আবাসিক হোটেল তাৎক্ষণিকভাবে সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে বলে দাপ্তরিক সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। যেসব হোটেলগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তার চরম ঘাটতি পাওয়া গেছে এবং যেগুলোতে ন্যূনতম জরুরি উদ্ধারকারী পথ বা পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা অনুপস্থিত ছিল, সেগুলোকে আইনের আওতায় এনে এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রশাসন শুধু হোটেলগুলো সিলগালাই করেনি, বরং আগামী শুক্রবার সকালের মধ্যে সংশ্লিষ্ট হোটেলগুলোর ভেতরে অবস্থানরত সকল পর্যটক ও কর্মচারীকে অবিলম্বে হোটেল খালি করে চলে যাওয়ার জন্য অত্যন্ত কড়া নির্দেশ জারি করেছে। আকস্মিক এই আদেশের ফলে হোটেল মালিক এবং সেখানে অবস্থানরত অতিথিদের মধ্যে এক ধরনের সাময়িক চাঞ্চল্য ও উদ্বেগের সৃষ্টি হলেও জননিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসনের এই ধরনের জিরো টলারেন্স নীতিকে সচেতন মহল সাধুবাদ জানিয়েছে।

শুধু সিলগালা করা ৮টি হোটেলেই অভিযান সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এর পরিধি আরও বাড়িয়ে একই এলাকার আরও ২৮টি সন্দেহজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ হোটেলের একটি দীর্ঘ তালিকা প্রস্তুত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। চিহ্নিত হওয়া এই অতিরিক্ত ২৮টি আবাসিক হোটেলে অত্যন্ত কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, যার মূল কথা হলো এখন থেকে এই হোটেলগুলোতে নতুন করে কোনো ধরনের যাত্রী, পর্যটক বা অতিথি বুকিং নেওয়া যাবে না এবং তাদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই ২৮টি হোটেলের অবকাঠামো এবং অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং যতদিন না পর্যন্ত তারা সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে, ততদিন পর্যন্ত সেখানে কোনো পর্যটককে রাত কাটানোর অনুমতি দেওয়া হবে না। পর্যটকদের জীবন ও সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েই এই ধরনের কঠোর ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন: শ্রমিকনেতা মো. সোরমান আলীর যুক্তরাষ্ট্রে ইন্তেকাল, নেতৃবৃন্দের গভীর শোক

এই ধরণের কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের নেপথ্যে রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে একই এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক অগ্নিকাণ্ডের বেদনাদায়ক ঘটনা, যা পুরো কলকাতাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। গত বুধবার রাতের বেলা মারকুইস স্ট্রিট এলাকার ঠিক কাছাকাছি অবস্থিত ‘হোটেল শিখা ইন’ নামের একটি আবাসিক হোটেলে হঠাৎ করেই এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটেছিল, যা মুহূর্তের মধ্যে পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের দীর্ঘ চেষ্টা ও উদ্ধার অভিযানের পর ওই বিভীষিকাময় অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৭ জন বাংলাদেশি নাগরিকসহ সর্বমোট ৯ জন মানুষের প্রাণহানির অত্যন্ত মর্মান্তিক সংবাদ পাওয়া যায়। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ অগ্নিকাণ্ড ছিল না, বরং এটি হোটেলগুলোর চরম অবহেলা এবং অগ্নিনিরাপত্তার বেহাল দশাকে সবার সামনে উন্মোচন করে দিয়েছিল। এই অপূরণীয় ক্ষতির পরই নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন এবং মারকুইস স্ট্রিটের প্রতিটি হোটেলে নিরাপত্তা তল্লাশি চালানো বাধ্যতামূলক করা হয়।

পরিশেষে বলা যায়, কলকাতার নিউ মার্কেটের মারকুইস স্ট্রিটে বাংলাদেশি পর্যটকদের হোটেল পাড়ায় প্রশাসনের এই ঝটিকা অভিযান এবং পর্যায়ক্রমে হোটেল সিলগালা করার বিষয়টি ভবিষ্যতের বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় একটি উদ্যোগ। হাজার হাজার বিদেশি পর্যটক যারা বিশ্বাস করে এই অঞ্চলে অবস্থান করতে আসেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোটেল মালিক ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নৈতিক দায়িত্ব। এই ধরনের কঠোর মনিটরিং এবং আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের প্রাণহানি রোধ করা সম্ভব হবে এবং পর্যটকদের মনে আস্থার পরিবেশ বজায় থাকবে বলে আমরা আশা প্রকাশ করি। সবার সম্মিলিত সচেতনতা, নিয়ম মেনে চলা এবং প্রশাসনিক তদারকির মাধ্যমেই কেবল একটি নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে।

সূত্র: কলকাতার স্থানীয় প্রশাসন ও সংবাদ মাধ্যম প্রতিবেদন।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন