শ্রমিকনেতা মো. সোরমান আলীর যুক্তরাষ্ট্রে ইন্তেকাল, নেতৃবৃন্দের গভীর শোক

শ্রমিকনেতা মো. সোরমান আলীর যুক্তরাষ্ট্রে ইন্তেকাল, নেতৃবৃন্দের গভীর শোক
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এবং শ্রমিক আন্দোলনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে যাঁরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম এক উজ্জ্বল নক্ষত্র চিরতরে নিভে গেছে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার পাশাপাশি শ্রমিক শ্রেণির ন্যায্য দাবি আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাসে ত্যাগী নেতাদের অবদান সবসময় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে। এমনই একজন আপসহোসীন, সাহসী এবং পরীক্ষিত শ্রমিক নেতা দীর্ঘ কর্মজীবন পেরিয়ে অবশেষে না ফেরার দেশে চলে গেছেন, যা পুরো দেশের রাজনৈতিক ও শ্রমিক মহলে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির শীর্ষস্থানীয় দায়িত্ব পালনকারী এবং সিলেট অঞ্চলের শ্রমিক আন্দোলনের প্রাণপুরুষ মো. সোরমান আলীর প্রয়াণে পুরো দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর এই চিরবিদায় কেবল একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, বরং পুরো জাতীয়তাবাদী শ্রমিক আন্দোলন এবং রাজপথের লড়াকু সৈনিকদের জন্য এক অপূরণীয় ও অপার্থিব শূন্যতা, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

আরও পড়ুন: পুঠিয়ায় অবৈধ সার মজুতের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা ও সার জব্দ

ঘটনার সম্পূর্ণ পটভূমি এবং বিশ্বস্ত পারিবারিক ও দলীয় সূত্র থেকে প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যাবলি থেকে বিস্তারিতভাবে জানা যায় যে, ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী আজকের এই অত্যন্ত শোকাবহ ও মর্মস্পর্শী দিনটি অর্থাৎ ১৯ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের বুধবার ভোরে এই অপূরণীয় মৃত্যুর সংবাদটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রবাসের মাটিতে সুদীর্ঘকাল ধরে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের ম্যানহাটন এলাকায় অবস্থিত একটি অভিজাত ও আধুনিক হাসপাতালে চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক ভোররাত ৩টা বেজে ৩০ মিনিট (০৩.৩০ ঘটিকা) অতিক্রম করছিল, যখন জীবনযুদ্ধ হেরে গিয়ে এই মহান নেতা চিরদিনের মতো না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। দীর্ঘ দিন ধরে নানাবিধ শারীরিক জটিলতায় ভুগে তিনি আমেরিকার মাটিতে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণের সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পৌঁছালে নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের মাঝে কান্নার রোল পড়ে যায়।

মৃত্যুকালে মরহুম মো. সোরমান আলীর বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর, যা একজন মানুষের কর্মময় জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় হলেও তাঁর অসময়ে চলে যাওয়া কেউ মেনে নিতে পারছেন না। ব্যক্তিজীবনে তিনি রেখে গেছেন তাঁর শোকস্তব্ধ সহধর্মিণী বা স্ত্রী, অত্যন্ত আদরের এক পুত্রসন্তান এবং এক কন্যাসন্তানসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী, আত্মীয়-স্বজন, রাজনৈতিক সহকর্মী এবং মেহনতি মানুষ। যিনি সারাজীবন অন্যের অধিকারের জন্য রাজপথে লড়েছেন, তাঁর নিজের পরিবার আজ এমন এক অসহায় পরিস্থিতিতে নিপতিত হয়েছে যা সকলকে কাঁদিয়েছে। মৃত্যুর সময় তাঁর পাশে থাকা স্বজন ও প্রবাসের দলীয় কর্মীরা তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য এবং জানাজা দাফনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। ৫৯ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তিনি শ্রমিকদের কল্যাণে এবং রাজনৈতিক আদর্শ বাস্তবায়নে ব্যয় করেছিলেন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে বেঁচে থাকবে।

আরও পড়ুন: বগুড়ার শেরপুরে নিজ বাগানের গাছ কেটে শামুকখোল পাখির বাসা ও ছানা ধ্বংসের অভিযোগে মালিক আজাহার গ্রেপ্তার

মরহুমের কর্মজীবনের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তিনি কেবল সাধারণ কোনো নেতা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সিলেট জেলা শ্রমিক দলের সম্মানিত আহ্বায়ক। এর পাশাপাশি তিনি জাতীয় বিদ্যুৎ শ্রমিক ইউনিয়ন (রেজি নং ১৮৮৬)-এর কার্যকরী সভাপতির অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ পদে আসীন থেকে দেশের বিদ্যুৎ খাতের শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় অনন্য অবদান রেখেছিলেন। বিশেষ করে বিগত ১/১১ পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির চরম বিপর্যয়ের মুখেও তৎকালীন অবৈধ ও অগণতান্ত্রিক সরকার কর্তৃক তাঁর ওপর চালানো হয়েছিল অমানবিক নির্যাতন ও নিপীড়ন। শত অত্যাচার, জেল-জুলুম ও দমন-পীড়ন সহ্য করেও তিনি দলের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা, শতভাগ বিশ্বস্ততা এবং আদর্শিক দৃঢ় অবস্থান কোনো দিনই পরিবর্তন করেননি, যা তাঁকে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।

শ্রমিকনেতা মো. সোরমান আলীর এই অকাল প্রয়াণে দেশজুড়ে শোকের ঝড় বয়ে গেছে এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দ গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি প্রদান করেছেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কৃষি বিষয়ক উপদেষ্টা বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ জনাব নজরুল ইসলাম খান তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এছাড়া জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়কারী ও রাজপথের লড়াকু নেতা এডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এমপি, শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আনোয়ার হোসাইন এবং সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম খান নাসিম অত্যন্ত মর্মাহত হয়ে পৃথক শোক বার্তা প্রেরণ করেছেন। শোকবার্তায় নেতৃবৃন্দ মরহুম সোরমান আলীর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন স্মরণ করে বলেন যে, তিনি ছিলেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী দর্শনের এক অকুতোভয় সৈনিক এবং শ্রমিক আন্দোলনের নির্ভীক কণ্ঠস্বর।

নেতৃবৃন্দ তাঁদের যৌথ ও পৃথক শোকবার্তায় অত্যন্ত জোরালো ভাষায় উল্লেখ করেন যে, সিলেট অঞ্চলে শ্রমিক দল ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র সাংগঠনিক ভিত শক্ত করার ক্ষেত্রে সোরমান আলীর ভূমিকা ছিল অতুলনীয় ও ইতিহাস সৃষ্টিকারী। ১/১১ এর ভয়াল দিনগুলোতেও যখন অনেক বাঘা বাঘা নেতা পিছু হটেছিলেন, তখনো সোরমান আলী বুক চিতিয়ে দলের আদর্শের পক্ষে লড়ে গেছেন এবং হাসিমুখে নির্যাতন সহ্য করেছেন। শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায় এবং তাঁদের কল্যাণে তাঁর অবদানের কথা শ্রমিক সমাজ চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। নেতৃবৃন্দ মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করার পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারের সকল সদস্য, আত্মীয়-স্বজন ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন এবং মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেছেন যেন পরিবারটি এই শোক কাটিয়ে ওঠার শক্তি পায়।

পরিশেষে, মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে আকুল প্রার্থনা জানাই—তিনি যেন মরহুম শ্রমিকনেতা মো. সোরমান আলীর জীবনের সকল ছোটোবড় ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেন এবং তাঁর সৎকর্মগুলো কবুল করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান হিসেবে চিরশান্তিতে স্থান দান করেন। আমিন। তাঁর মতো ত্যাগী ও আদর্শবান নেতার চলে যাওয়া দেশের রাজনৈতিক ও শ্রমিক আন্দোলনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। দেশবাসীর অন্তরে তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে চিরদিন অমর হয়ে থাকবেন এবং তাঁর আদর্শ নতুন প্রজন্মকে সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে অনুপ্রাণিত করবে। সবার সম্মিলিত দোয়ায় ও ভালোবাসায় এই মহান নেতার আত্মিক শান্তি নিশ্চিত হোক—এটাই আমাদের আজকের দিনে একমাত্র প্রার্থনা।

সূত্র: প্রেস উইং, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও পারিবারিক সূত্র।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন