প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী জনপদ হিসেবে পরিচিত বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার শান্ত ও স্নিগ্ধ গ্রামীণ জনপদে পরিবেশ, প্রকৃতি এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের চরম লঙ্ঘনজনিত এক চাঞ্চল্যকর ও হৃদয়বিদারক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আমাদের পরিবেশের পরম বন্ধু পরিযায়ী ও স্থানীয় প্রজাতির বিভিন্ন পাখির নিরাপদ আবাসস্থল ধ্বংস করার এক ন্যাক্কারজনক ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল ও প্রকৃতিপ্রেমীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। নিজের মালিকানাধীন বসতবাড়ির বাগানের ভেতরে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কিংবা দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক পরিবেশকে বিনষ্ট করে নির্বিচারে গাছপালা কেটে ফেলার ফলে সেখানে শত শত মুক্তবিহারী শামুকখোল পাখির পরম যত্নে গড়ে তোলা বসতভিটা, হাজার হাজার অমূল্য ডিম এবং সদ্য ফোটা কচি ছানাগুলো নির্মমভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। পরিবেশ ধ্বংসকারী এবং বন্যপ্রাণী নিধনের এই দুর্ধর্ষ ও জঘন্য অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাৎক্ষণিক ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে অভিযুক্ত গাছমালিককে রাতের আঁধারে সফলভাবে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে, যা সমগ্র অঞ্চলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সূত্রে জানা গেছে যে, গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ) দিবাগত রাতের গভীর অন্ধকারে বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার অন্তর্গত জনবহুল ও পরিচিত এলাকা গাড়িদহ ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের নিজ বাড়ির পারিবারিক বাগান চত্বরে এই বর্বরোচিত ঘটনাটি সংঘটিত হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিগত জমির গাছ কাটার নাম করে নির্বিচারে বনজ ও ফলজ গাছপালা কেটে ফেলেন, যার ডালে ডালে ও পাতার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয় নিয়েছিল শত শত শামুকখোল পাখি। গাছ কাটার এই আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক তাণ্ডবে পাখিগুলোর বংশবৃদ্ধির মোক্ষম সময়ে তাদের শত শত গোছানো বাসা মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে যায় এবং অসংখ্য ডিম ও মাটিতে পড়ে পিষ্ট হয়ে মারা যায় শত শত কচি ছানা। প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী নিধনের এই পৈশাচিক খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই স্থানীয় পরিবেশবাদী ও সাধারণ মানুষের মাঝে চরম শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন এবং পরিবেশগত সুরক্ষা সংক্রান্ত প্রচলিত বিধিমালার সুস্পষ্ট লংঘন হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আমলে নেয় এবং অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে তাৎক্ষণিক ঝটিকা অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
আরও পড়ুন: নড়াইলে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজির আগমনে জেলা পুলিশের বিশেষ কল্যাণ সভা অনুষ্ঠিত
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত চাঞ্চল্যকর তথ্যানুযায়ী, পরিবেশ ধ্বংস ও পাখি নিধনের এই সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত মো. আজাহার আলী (৬৫) নামক ওই বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার জন্য গত শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে বারোটার দিকে তাঁর নিজ বাড়ির চারপাশ ঘেরাও করে ফেলে পুলিশ। গভীর রাতে পুলিশের একটি বিশেষ দল যখন অভিযুক্ত আজাহার আলীর বাড়ির আঙিনায় প্রবেশ করে এবং সুনির্দিষ্ট অপরাধের বিষয়ে তাঁকে পাকড়াও করার চেষ্টা চালায়, তখন তিনি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার উপস্থিতি টের পেয়ে চরম চতুরতার আশ্রয় নেন। পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এবং নিজেদের দায় এড়ানোর উদ্দেশ্যে বয়সের কথা ভুলে গিয়ে তিনি রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে নিজ বাড়ির সীমানা প্রাচীর বা দেয়াল টপকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে পাশের ঘন জঙ্গলের ভেতর পালিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা চালান। তবে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতার সাথে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে ধাওয়া করেন এবং রাতেই ওই অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর থেকে ব্যর্থ করে দিয়ে ধৃত ও ঘেরাও করে তাঁকে হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম হন।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বন্যপ্রাণী ও পাখি নিধনের এই মর্মান্তিক ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অপরাধে অভিযুক্ত আজাহার আলীকে গ্রেপ্তার করার পর থানা হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে গত শনিবার (১৫ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ) সকালের দিকে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে অভিযুক্ত আজাহার আলীকে বিজ্ঞ আদালতের সোপর্দ করা হয়েছে এবং আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে প্রেরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিজের বাগানের গাছ কাটার স্বাধীনতা মানুষের নিজস্ব সম্পত্তি রক্ষায় থাকতে পারে, কিন্তু তার আড়ালে হাজার হাজার মুক্তপ্রাণ পাখি, তাদের অমূল্য ডিম এবং সদ্য প্রস্ফুটিত কচি ছানাগুলোকে এভাবে নির্দয়ভাবে হত্যা করা বা তাদের নিরাপদ আবাসস্থল ধ্বংস করার অধিকার কাউকেই দেওয়া হয়নি। দেশের প্রচলিত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে এই অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান থাকায় স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ ও পরিবেশবাদীরা পুলিশের এই সময়োপযোগী ও দ্রুততম পদক্ষেপকে অত্যন্ত সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং এ ধরনের অপরাধের সাথে জড়িত অন্যান্য সহযোগীদেরও দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছেন।
পরিবেশবিদ ও প্রকৃতিপ্রেমী সমাজ মনে করছেন যে, আমাদের দেশের সবুজ প্রকৃতি এবং উন্মুক্ত জনপদে একশ্রেণির অসাধু ও প্রকৃতিবিরোধী মানুষ প্রতিনিয়ত নিজেদের সামান্য ব্যক্তিগত লাভের বা কাঠের লোভে বন্যপ্রাণী ও পাখির অভয়ারণ্যগুলোকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। শামুকখোলসহ বিভিন্ন দেশীয় ও পরিযায়ী পাখি আমাদের পরিবেশের ক্ষতিকর পোকামাকড় ও শামুক খেয়ে কৃষির সুরক্ষায় এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য ভূমিকা পালন করে থাকে। অথচ সেই উপকারী পাখিগুলোর মাথার ওপর এভাবে বুলডোজার চালানো বা গাছ কেটে তাদের বংশ ধ্বংস করা কেবল আইনগত অপরাধই নয়, বরং এক ধরনের সামাজিক ও নৈতিক অপরাধও বটে। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার রামনগর গ্রামের এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি প্রমাণ করে দিয়েছে যে, প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি করলে আইন তার নিজস্ব গতিতে কঠোর হাতে অপরাধীকে দমন করবে। ভবিষ্যতে দেশের কোথাও যেন আর কখনো কোনো লোভী মানুষ নিজ স্বার্থের টানে এভাবে নির্বিচারে পাখির বাসা ও ছানা ধ্বংস করার মতো দুর্ধর্ষ সাহস দেখাতে না পারে, সে বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ এবং সচেতন জনসাধারণকে সর্বদা সতর্ক ও কঠোর পাহারা বজায় রাখতে হবে।
সূত্র: শেরপুর থানা প্রেস নোট ও স্থানীয় অনুসন্ধানী সংবাদ বিবরণী।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।