রাঙামাটির বিলাইছড়ির দুর্গম বড়থলি ইউনিয়ন: স্কুল, চিকিৎসা ও নেটওয়ার্কহীন বিচ্ছিন্ন জনপদে ৫ হাজার মানুষের মানবেতর জীবন

রাঙামাটির বিলাইছড়ির দুর্গম বড়থলি ইউনিয়ন: স্কুল, চিকিৎসা ও নেটওয়ার্কহীন বিচ্ছিন্ন জনপদে ৫ হাজার মানুষের মানবেতর জীবন
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড এবং আধুনিক সভ্যতার আলো থেকে শতযোজন দূরে অবস্থিত পার্বত্য জেলা রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার অন্তর্গত অত্যন্ত দুর্গম ও সীমান্তবর্তী বড়থলি ইউনিয়ন যেন এক অদ্ভুত ও বিচ্ছিন্ন মানচিত্রের নাম। ভৌগোলিক অবস্থান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম বিপর্যয়ের কারণে এই জনপদের মানুষের জীবনযাত্রা আধুনিক যুগের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত রয়েছে। এই ইউনিয়নের একদিকে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের সীমান্ত এবং অন্যদিকে মিয়ানমারের চিন রাজ্যের পাহাড়ি সীমানা বেষ্টিত রয়েছে, যার চারপাশজুড়ে কেবল দুর্গম পাহাড়, গভীর অরণ্য আর প্রাকৃতিক বিপদের হাতছানি। প্রায় ২৭৮ বর্গকিলোমিটার সুবিশাল আয়তনের এই জনপদে ২৪টি আলাদা গ্রামে বসবাসকারী প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবন সংগ্রাম অত্যন্ত কঠিন ও কণ্টকাকীর্ণ। এখানকার মানুষের কাছে নাগরিক সেবা, উন্নত চিকিৎসা, সুশিক্ষা কিংবা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া পাওয়া এক সুদূরপরাহত কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সমস্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বিচ্ছিন্ন এই পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সাথে লড়াই করে তাদের জীবন অতিবাহিত করছেন, যা একবিংশ শতাব্দীতেও আমাদের দেশের উন্নয়ন কাঠামোর এক নিদারুণ এবং অবহেলিত বাস্তবতার করুণ চিত্র ফুটিয়ে তোলে।

আরও পড়ুন: নারীদের অনার্স পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করার ঘোষণা দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

এই দুর্গম জনপদের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সুদৃশ্য রাইখ্যং হ্রদ, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আনুমানিক ১ হাজার ২০০ ফুট উচ্চতায় অত্যন্ত উঁচুতে পাহাড়ি উপত্যকায় অবস্থিত। প্রায় এক মাইল দীর্ঘ এই প্রাকৃতিক হ্রদ এবং এর চারপাশের দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণেই মূলত এই ইউনিয়নটির সাথে রাঙামাটি জেলা সদর কিংবা দেশের অন্যান্য সমতল এলাকার কোনো ধরনের সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে জানা যায় যে, ২০১৩ সালে ফারুয়া ইউনিয়নের দুটি ওয়ার্ডকে আলাদা করে সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বড়থলি ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত সরকারি জনশুমারি অনুযায়ী এই জনপদে ৩ হাজার ৫৯ জন মানুষের স্থায়ী বসবাসের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করা হলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিজ্ঞ ও বাস্তবসম্মত দাবি অনুযায়ী বর্তমানে এখানকার মোট জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজারে উন্নীত হয়েছে। অত্যন্ত অদ্ভুত ও দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই ইউনিয়নের দেখভালের জন্য নির্ধারিত ইউনিয়ন পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয়টি নিজেদের জেলায় নয়, বরং পার্শ্ববর্তী বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলায় স্থাপন করা হয়েছে, যা ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে স্থানীয় সেবাগ্রহীতাদের জন্য আরও বড় এক প্রশাসনিক ও যাতায়াতগত জটিলতার সৃষ্টি করেছে।

আরও পড়ুন: কাজিপুরে অপহৃত স্কুলছাত্র বেলকুচি থেকে উদ্ধার, মূল অপহরণকারী গ্রেপ্তার

বড়থলি ইউনিয়নের জনমিতির দিকে তাকালে দেখা যায় যে, এটি মূলত একটি বহুসংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যময় জনপদ, যেখানে তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, ত্রিপুরা, খুমী এবং ম্রো নামক মোট পাঁচটি পাহাড়ি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সম্প্রীতির সাথে বসবাস করে আসছেন। পাহাড়ি এই জনপদের মানুষের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র প্রধান অবলম্বন হলো পাহাড়ের বুকে প্রচলিত প্রাচীন জুমচাষ, যার ওপর নির্ভর করেই তাদের সারা বছরের খাদ্য ও অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাতে হয়। এখানকার স্থায়ী বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী হওয়ায় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আচার-অনুষ্ঠান পালনের জন্য এই ইউনিয়নে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০টি গির্জা এবং দুটি সুদৃশ্য বৌদ্ধবিহার রয়েছে। জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল এই সহজ-সরল মানুষগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত অসচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও তারা নিজ নিজ কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে অত্যন্ত মানবেতর ও কষ্টকর জীবন অতিবাহিত করছেন। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনো প্রণোদনা এই জুমচাষী মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না বললেই চলে, ফলে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার ওপর তাদের প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যেতে হয়।

শিক্ষার মতো একটি মৌলিক ও পবিত্র অধিকারের ক্ষেত্রে বড়থলি ইউনিয়নের চিত্রটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও হতাশাজনক। পুরো ইউনিয়নজুড়ে কেবল নয়টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও এখানে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য একটিও মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা হাইস্কুল নেই। এর ফলে কোমলমতি শিশুরা যখন তাদের জীবনের প্রাথমিক স্তরের পড়াশোনা বা পঞ্চম শ্রেণির গণ্ডি পার হয়, তখন উচ্চশিক্ষার কোনো সুযোগ না থাকায় তাদের একটি বিশাল অংশ পড়াশোনা থেকে চিরতরে ঝরে পড়ে। অল্প বয়সেই তাদের অনেকে জুমচাষের সাথে কিংবা পারিবারিক নানা কাজে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়। এলাকার কিছু শিক্ষার্থী তীব্র ইচ্ছা শক্তি ও অদম্য জেদ নিয়ে বিপজ্জনক হ্রদ ও পাহাড়ি পথ পাри দিয়ে পাশের ইউনিয়নের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে নিজেদের নাম লেখালেও বর্ষাকাল শুরু হলে তাদের সেই শিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন থমকে দাঁড়ায়। পাহাড়ি ঢল, প্রবল বর্ষণ এবং পাহাড়ি ছড়া ও নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে তখন শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী হওয়ার সমস্ত রাস্তা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং জীবনের চরম ঝুঁকি তৈরি হয়।

বর্ষা ঋতুতে এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার ভয়াবহতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে গিয়ে বড়থলির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পলথনপাড়ার সম্মানিত কারবারি মতি ত্রিপুরা অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে গণমাধ্যমকে জানান যে, তাদের এলাকার ছোট ছোট কোমলমতি শিশুরা লেখালেখির প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী এবং তারা পড়াশোনা করতে চায়। কিন্তু প্রকৃতি যখন রূপ বদলায় এবং বর্ষাকালে পাহাড়ি ঝরনা ও নদীর পানি থৈ থৈ করে ফুলেফেঁপে ওঠে, তখন জীবনের চরম ঝুঁকি মাথায় নিয়ে শিশুদের কোনোভাবেই স্কুল কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো সম্ভব হয় না। সপ্তাহের পর সপ্তাহ, এমনকি মাসের পর মাস তাদের পড়াশোনার সমস্ত কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হয়। পঞ্চম শ্রেণির গণ্ডি পেরোতেই এখানকার শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ে এবং উচ্চশিক্ষার কোনো আলোর মুখ দেখতে পায় না। তিনি আরও গভীর আক্ষেপের সাথে জানান যে, যদি এই দুর্গম অঞ্চলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি অন্তত একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা যেত, তবে এখানকার অবহেলিত ও বঞ্চিত মানুষগুলো ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষার আলো পেত।

বড়থলি ইউনিয়নের বাসিন্দাদের দৈনন্দিন যোগাযোগ ও যাতায়াত ব্যবস্থার দুর্দশার কোনো তুলনা হয় না। রাঙামাটি জেলা সদরে যাতায়াত করার কথা তো চিন্তাই করা যায় না, এমনকি নিজেদের প্রশাসনিক উপজেলা সদর তথা বিলাইছড়ি সদরে পৌঁছাতেও এখানকার সাধারণ মানুষকে প্রায় দুই দিন সময় ব্যয় করতে হয়। তুলনামূলকভাবে ভৌগোলিক সান্নিধ্যের কারণে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় যাতায়াত কিছুটা সহজ বলে মনে হলেও সেখানে পৌঁছাতেও প্রায় একটি পূর্ণ একদিন সময় লেগে যায়। দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্রতম কোনো প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় চাল, ডাল, লবণ ও তেলসহ অন্যান্য জিনিসপত্র ক্রয় করতে হলে বাসিন্দাদের অত্যন্ত কষ্ট করে প্রায় ২৭ কিলোমিটার বন্ধুর ও পাথুরে পাহাড়ি পথ হেঁটে পাড়ি দিতে হয়। বাজারের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সম্পন্ন করে ঘরে ফিরতেই সাধারণ মানুষের মূল্যবান দুই দিন সময় কেবল যাতায়াতের পেছনেই অপচয় হয়ে যায়, যা আধুনিক যুগে কোনো সভ্য এলাকার মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব।

পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্কের সম্মানিত সাধারণ সম্পাদক এবং ১২৪ নম্বর নাড়াইছড়ি মৌজার হেডম্যান শান্তি বিজয় চাকমা অত্যন্ত জোরালো ও বাস্তবসম্মত ভাষায় এই জনপদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে জানিয়েছেন যে, বড়থলি ইউনিয়নটি মূলত ভৌগোলিক দিক থেকে দেশের অন্যতম অত্যন্ত দুর্গম একটি এলাকা। এখানকার সাধারণ মানুষকে সামান্যতম নাগরিক সেবা পাওয়ার জন্য কিংবা প্রশাসনিক কোনো কাজে বিলাইছড়ি সদরে উপস্থিত হতে হলে আড়াই থেকে তিন দিন সময় পায়ে হেঁটে পার করতে হয়। ন্যূনতম মানবিক অধিকার ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকায় এখানকার মানুষকে প্রতিনিয়ত চরম দুর্ভোগ ও অপিরসীম দুর্দশার মুখোমুখি হতে হয়। বড়থলি ইউনিয়ন পরিষদের সম্মানিত চেয়ারম্যান জামাইয়া তঞ্চঙ্গ্যা তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এই ইউনিয়নে প্রায় ২ হাজার ১০০ জন ভোটারসহ মোট পাঁচ হাজারের কাছাকাছি জনসংখ্যা বসবাস করা সত্ত্বেও এখানে মানুষের চিকিৎসার জন্য কোনো কার্যকর চিকিৎসাকেন্দ্র বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো বালাই নেই।

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আরও অত্যন্ত হতাশার সুরে বর্ণনা করেছেন যে, তাদের দাপ্তরিক কাজের মূল ঠিকানা ইউনিয়ন পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয়টি নিজেদের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে তো নেইই, বরং তা অন্য জেলার প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ফলে জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ কিংবা যেকোনো ধরনের সরকারি সহায়তা পেতে হলে বা প্রদান করতে হলে জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষকে এই সুদীর্ঘ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে চরম কষ্ট স্বীকার করতে হয়। এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার সদাইয়ের জন্য ২৭ কিলোমিটার হেঁটে যাতায়াত করতেই মানুষের দুই দিন সময় ফুরিয়ে যায়। সরকারের তরফ থেকে পূর্বে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুর্গমতার মাত্রা এত বেশি যে সেবার পরিধি স্বাভাবিক নিয়মেই বারবার ব্যাহত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতীতে বড়থলি এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার মহান উদ্দেশ্যে একটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল, যা নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে একসময় আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, চরম যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, পাহাড়ি এলাকার দুর্গমতা এবং পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী-সংকটের গুরুতর সমস্যার কারণে বর্তমানে সেই স্কুলটিরও নিয়মিত কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থগিত রাখা হয়েছে।

সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগের সুফল এই অঞ্চলে সঠিকভাবে না পৌঁছানোর প্রধান কারণ হিসেবে যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম অনুপস্থিতি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া না থাকাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাকির হোসেন এই এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত মন্তব্য করে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, পুরো এলাকাটি সত্যি বলতে অত্যন্ত দুর্গম এবং চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ভৌগোলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত সহজ ও কাছাকাছি হওয়ার সুবাদেই মূলত বান্দরবানের রুমা উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষা বড়থলি ইউনিয়ন পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয় থেকে প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়, যা অন্যথায় অসম্ভব ছিল। তিনি আরও নিশ্চিত করেছেন যে, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিপূর্বে সেখানে একটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং আশানুরূপ শিক্ষার্থী-সংকট দেখা দেওয়ার কারণে বাধ্য হয়ে আপাতত সেই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম স্থগিত রাখতে হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগের এই চরম সংকটের কারণে এখানকার মানুষের ভাগ্য বদলানোর প্রক্রিয়া বারবার হোঁচট খাচ্ছে।

পরিবেশগত দিক থেকে পাহাড়, গভীর অরণ্য, সীমান্তঘেঁষা ভৌগোলিক অবস্থান এবং রাইখ্যং হ্রদের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা বড়থলি ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের বর্তমান জীবনযাত্রা এখনো পুরোপুরি নির্ভর করে দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া, আদিম জুমচাষ এবং অত্যন্ত সীমিত ও অনুন্নত স্থানীয় ব্যবস্থার ওপর। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এখানকার মানুষকে প্রতিটি পদক্ষেপে প্রকৃতির নিষ্ঠুর রূপের সাথে সংগ্রাম করতে হয়। শিক্ষা অর্জনের সুযোগ নেই, উন্নত চিকিৎসার অভাবে সাধারণ রোগেও মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে, আর যোগাযোগের জন্য মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক বা পাকা সড়ক তো এখানকার মানুষের কাছে রূপকথার গল্পের মতো। ন্যূনতম নাগরিক অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম আধুনিকায়ন ছাড়া এই জনপদের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানো অসম্ভব। সরকারের নীতিনির্ধারক মহল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদী সুপরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমেই কেবল এই বিচ্ছিন্ন জনপদের পাঁচ হাজার মানুষের মুখে হাসি ফোটানো সম্ভব এবং তাদের মূলধারার উন্নয়নের সাথে যুক্ত করা যেতে পারে।

সূত্র: স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য, উপজেলা প্রশাসন এবং অনুসন্ধানী সংবাদ প্রতিবেদন।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন