প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান কৃষিপ্রধান অঞ্চল হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত রাজশাহী জেলার বিভিন্ন জনপদে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা এবং কৃষিকাজে ব্যবহৃত সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি রোধ করার লক্ষ্যে প্রশাসন সবসময় অত্যন্ত কঠোর ও সজাগ দৃষ্টি রেখে চলেছে। ফসলের উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে এবং সাধারণ কৃষকদের নায্যমূল্যে সার প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য অসাধু সিন্ডিকেট ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে নিয়মিত বিরতিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা একটি অত্যন্ত অপরিহার্য ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজশাহী জেলার বিভিন্ন উপজেলা এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুসংহত রাখতে এবং সার ও কীটনাশক ব্যবসার আড়ালে চলা নানা অনিয়ম দমন করতে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে অত্যন্ত কঠোর আভিযানিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। প্রশাসনের এই ধরনের যুগোপযোগী ও তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপের ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা অবৈধভাবে কৃষিপণ্য লুকিয়ে রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির সাহস পাওয়ায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এবং সাধারণ কৃষকরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছেন।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শ্রমিকের মৃত্যু
ঘটনার সম্পূর্ণ পটভূমি এবং স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে প্রাপ্ত বিস্তারিত তথ্যাবলি থেকে জানা যায় যে, ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী গত ১৮ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের সকালে, অর্থাৎ সপ্তাহের অত্যন্ত ব্যস্ততম একটি দিনে এই বিশেষ ও সফল অভিযানটি পরিচালিত হয়েছিল। রাজশাহী জেলার অন্তর্গত ঐতিহাসিক ও জনবহুল জনপদ পুঠিয়া উপজেলার অধীনস্ত অত্যন্ত পরিচিত একটি বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে খ্যাত ধোপাপাড়া বাজার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিয়মবহির্ভূতভাবে সার অবৈধভাবে মজুত করে আসছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছিল। স্থানীয় কৃষকদের মাঝে এই নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছিল কারণ ঠিক যখন ধানের বা ফসলের ক্ষেতে সারের চরম প্রয়োজন দেখা দেয়, তখনই একশ্রেণির মুনাফালোভী ব্যবসায়ী বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। সাধারণ মানুষের এই দুর্ভোগ দূর করতে এবং আইনের শাসন কঠোরভাবে বলবৎ করতে উপজেলা প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় এই বিশেষ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং মুহূর্তের মধ্যে তা বাস্তবায়িত হয়।
উক্ত সফল অভিযান পরিচালনার নেপথ্য কৌশল ও নেতৃত্ব সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায় যে, পুঠিয়া উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক উদ্যোগে পরিচালিত এই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা টিমের নেতৃত্ব প্রদান করেন অত্যন্ত কৃতি ও সৎ প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট শিবু দাস। ধোপাপাড়া বাজার এলাকার নির্দিষ্ট একটি গুদাম ও দোকানে আচমকা এই অভিযান পরিচালনা করার সময় ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয় সরেজমিন সবকিছু খতিয়ে দেখেন এবং ব্যবসায়ীর বৈধ কাগজপত্রের সাথে বাস্তবের অসঙ্গতি দেখতে পান। আইন অমান্য করে অবৈধভাবে সার মজুত করার সুনির্দিষ্ট অপরাধ হাতেনাতে প্রমাণিত হওয়ার পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। অসাধু ব্যবসায়ীকে আইন লঙ্ঘনের দায়ে নগদ ত্রিশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য কঠোরভাবে সতর্ক করে দেওয়া হয়।
অভিযান চলাকালীন সময়ে ধৃত ব্যবসায়ীর দোকান ও গুদাম থেকে উদ্ধারকৃত অবৈধ মালামালের বিবরণ দিতে গিয়ে প্রশাসন জানিয়েছে যে, কেবল কীটনাশক বিক্রির বৈধ লাইসেন্স সঙ্গে রেখে তার আড়ালে সম্পূর্ণ অনুমোদনহীন ও অবৈধভাবে বিশাল পরিমাণ রাসায়নিক সার লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। তল্লাশি চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে সর্বমোট ৩৪ বস্তা টিএসপি (TSP) সার এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল ৮ বস্তা ডিএপি (DAP) সার সম্পূর্ণ জব্দ করা হয়, যা বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। সারের এই অবৈধ চালানগুলো জব্দ করার পর স্থানীয় কৃষকদের মাঝে যেন কোনো ধরনের হাহাকার বা চাষাবাদে বিঘ্ন না ঘটে, তার জন্য এক অভিনব ও জনকল্যাণমুখী যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। জব্দকৃত এই সমস্ত সার পরবর্তীতে সরকার নির্ধারিত বা নিয়মানুযায়ী সঠিক মূল্যের বিনিময়ে এলাকার সাধারণ ও প্রকৃত কৃষকদের মাঝে উন্মুক্তভাবে বিক্রয়ের সুব্যবস্থা করা হয়, যা স্থানীয় কৃষকদের দারুণভাবে উপকৃত করেছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে আরও জানানো হয়েছে যে, কৃষিপণ্য ও রাসায়নিক সারের বাজারে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বা কালোবাজারি বরদাস্ত করা হবে না এবং এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকবে। পুঠিয়া উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে তদারকি আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে কোনো ব্যবসায়ী লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করে অতিরিক্ত মুনাফার লোভে কৃষকদের জিম্মি করতে না পারে। সাধারণ কৃষকরা প্রশাসনের এই সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপে অত্যন্ত আনন্দ প্রকাশ করেছেন এবং আশা করছেন যে এর ফলে সার নিয়ে চলা অসাধু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং কৃষকদের নায্য অধিকার নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসনের এই ধরনের কঠোর নজরদারি পুরো রাজশাহী জেলা জুড়ে এক ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, রাজশাহীর পুঠিয়ার ধোপাপাড়া বাজারে অবৈধভাবে সার মজুতের বিরুদ্ধে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই সফল অভিযানটি প্রমাণ করে যে অপরাধী যেই হোক না কেন, আইনের চোখে সে কখনোই ছাড় পাবে না। সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিবু দাসের নেতৃত্বাধীন এই অভিযান সাধারণ কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে এবং বাজার ব্যবস্থায় এক ধরনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে। আমরা আশা করি, ভবিষ্যতে এই ধরনের নজরদারি আরও জোরদার করা হবে এবং দেশের কৃষিখাতকে সুরক্ষিত রাখতে এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে। সবার সম্মিলিত সচেতনতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধই একটি দুর্নীতিমুক্ত ও সমৃদ্ধশালী সমাজ বিনির্মাণের প্রধান শর্ত হিসেবে সবসময় অতند প্রহরীর মতো কাজ করে যাবে।
সূত্র: উপজেলা প্রশাসন প্রেস উইং ও স্থানীয় সংবাদাতা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।