নাটোরের লালপুরে ৭০ পিস ইয়াবাসহ গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রামের দুই যুবক গ্রেপ্তার

নাটোরের লালপুরে ৭০ পিস ইয়াবাসহ গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রামের দুই যুবক গ্রেপ্তার
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও কৃষিসমৃদ্ধ জেলা হিসেবে পরিচিত নাটোর জেলার বিভিন্ন জনপদে মাদকের ভয়াল থাবা বিস্তার রোধে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত কঠোর অভিযান পরিচালিত হয়ে আসছে। তরুণ সমাজ ও উদীয়মান যুবশক্তিকে ধ্বংসের অন্যতম প্রধান মরণনেশা ইয়াবা ট্যাবলেট এবং অন্যান্য অবৈধ মাদকদ্রব্যের চোরাচালান ও বিস্তার রোধে পুলিশ প্রশাসনের এই জিরো টলারেন্স নীতি অপরাধীদের মনে প্রতিনিয়ত আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সড়ক ও জনবহুল পয়েন্টে মাদক কারবারিরা অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের অপতৎপরতা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পুলিশের বিচক্ষণ নজরদারি ও সময়োপযোগী পদক্ষেপে তাদের সেই সমস্ত পরিকল্পনা একে একে ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের মুখে পড়ে সম্প্রতি লালপুর থানা এলাকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিচালিত বিশেষ ঝটিকা অভিযানে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্যসহ চিহ্নিত দুই মাদকবাহককে হাতেনাতে আটক করা হয়েছে, যা স্থানীয় সচেতন মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আরও পড়ুন: পাবনার ভাঙ্গুড়ায় চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে যুবককে পিটিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করল বিক্ষুব্ধ জনতা

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ও পুলিশের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট তথ্যাবলি থেকে জানা যায় যে, গত রোববার (১৬ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ) সন্ধ্যার ঠিক প্রাক্কালে, অর্থাৎ প্রায় পৌনে সাতটার দিকে, নাটোর জেলার লালপুর থানাধীন ওয়ালিয়া পুলিশ ফাঁড়ির আওতাধীন এলাকার কদিমচিলান থেকে চাঁদপুর বাজারগামী অত্যন্ত ব্যস্ততম গ্রামীণ সড়কের ঘাটচিলান নামক স্থানে এই সফল অভিযানটি পরিচালিত হয়। উক্ত এলাকার স্থানীয় কাচু মিস্ত্রির মালিকানাধীন জমির ঠিক পাশেই পাকা সড়কের ওপর ওয়ালিয়া পুলিশ ফাঁড়ির একটি বিশেষ চৌকস টহল দল পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আকস্মিক চেকপোস্ট বসিয়ে সন্দেহভাজন বিভিন্ন যানবাহন ও পথচারীদের তল্লাশি করা শুরু করেন। ঠিক সেই মুহূর্তে সন্দেহজনক গতিবিধি নিয়ে একটি মোটরসাইকেলে করে দুই যুবক ওই চেকপোস্টের দিকে এগিয়ে এলে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত পেশাদারিত্ব ও ক্ষিপ্রতার সাথে তাদের পথ রোধ করেন এবং গাড়িটি থামিয়ে তাদের থামার সংকেত দিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি কার্যক্রম শুরু করেন।

পুলিশি তল্লাশির মুখোমুখি হওয়ার পর ওই দুই যুবকের সাথে থাকা জিনিসপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তল্লাশি করে অত্যন্ত সুকৌশলে লুকিয়ে রাখা সর্বমোট ৭০ (সত্তর) পিস নিষিদ্ধ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। অবৈধ মাদকদ্রব্য বহন করার অপরাধে শুধু ইয়াবাই উদ্ধার করা হয়নি, বরং মাদকদ্রব্য পরিবহনের কাজে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ব্যবহৃত একটি উচ্চগতির মোটরসাইকেল এবং মাদক বিক্রির সিন্ডিকেটের সাথে ক্রমাগত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত দুটি দামি অ্যান্ড্রয়েড মুঠোফোন বা স্মার্টফোনও পুলিশ জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য এবং তাদের পরিচয় যাচাই করে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে, আটককৃত এই দুই যুবক মূলত সরাসরি মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত এবং তারা বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা সরবরাহের অসৎ উদ্দেশ্যে ওই নির্দিষ্ট স্থানে আগমন করেছিল। পুলিশের তাৎক্ষণিক ও দক্ষ পদক্ষেপে বড় ধরনের কোনো মাদকের চালান ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা সফলভাবে আটক করা সম্ভব হয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃত দুই যুবকের বিস্তারিত পরিচয় ও তাদের স্থায়ী ঠিকানা সম্পর্কে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে যে, তাদের মধ্যে একজনের নাম মো. নাঈম খাঁ (বয়স আনুমানিক ২২ বছর), যার পিতা হলেন মকবুল খাঁ এবং তাদের পারিবারিক ঠিকানা হলো নাটোর জেলারই পার্শ্ববর্তী বড়াইগ্রাম উপজেলার মাঝগ্রাম উত্তরপাড়া এলাকার বক্কুর মোড় সংলগ্ন জনপদ। অপর গ্রেপ্তারকৃত যুবকের নাম মো. আতিকুর রহমান আসিফ (বয়স আনুমানিক ২০ বছর), যার পিতা ওয়াজ আলী প্রামাণিক এবং তাঁর নিজ বাড়ি হলো গুরুদাসপুর উপজেলার কান্দাইল নামক এলাকায়। বয়সে তরুণ হওয়া সত্ত্বেও এই দুই যুবক অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে মাদক সরবরাহের মতো জঘন্য কাজের সাথে লিপ্ত ছিল, তা খতিয়ে দেখার জন্য পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে অধিকতর তদন্ত শুরু করেছে। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে সীমান্তবর্তী বা অভ্যন্তরীণ এই রুটগুলো ব্যবহার করে কীভাবে তারা মাদকের কারবার চালাত, সে বিষয়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: দেশভাগ স্মরণ দিবসে সম্প্রীতি ও উন্নত ভারত গড়ার বার্তা প্রধানমন্ত্রীর

এই পুরো অভিযান ও সফল আটকের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুচারুভাবে পরিচালনা করেন ওয়ালিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এবং অভিজ্ঞ পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. মনোয়ার জাহান, যিনি তাঁর বিশ্বস্ত ও কঠোর সঙ্গীয় পুলিশ সদস্যদের সাথে নিয়ে সম্পূর্ণ অপারেশনটি সফল করেন। ঘটনাস্থলে আইনগত প্রক্রিয়া এবং সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার পর উদ্ধারকৃত ৭০ পিস ইয়াবা, মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও দুটি অ্যান্ড্রয়েড ফোনসহ গ্রেপ্তারকৃত দুই যুবককে দ্রুত ওয়ালিয়া পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লালপুর থানায় হস্তান্তর করা হয়। এই ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত কঠোর আইন তথা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(১) সারণি-১০(ক), ৩৮ ও ৪১ ধারায় একটি নিয়মিত ও সুনির্দিষ্ট অপরাধ মামলা রুজু করা হয়েছে। আইনি সমস্ত প্রাথমিক প্রক্রিয়া ও দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর পুলিশ জানিয়েছে যে, গত সোমবার (১৭ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ) সকালের দিকে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামিকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

এই চাঞ্চল্যকর গ্রেপ্তার ও মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের সফল অভিযানের বিষয়ে নিজস্ব মতামত ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করতে গিয়ে দিগন্ত বাংলা নিউজের পক্ষ থেকে কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। সংবাদ পোর্টালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মাদক সরবরাহের বিরুদ্ধে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার এ ধরনের ঝটিকা অভিযান ও তৎপরতা সমাজকে বাঁচাতে অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রশংসনীয় একটি পদক্ষেপ। তবে সমাজ গবেষক ও সচেতন মহলের মতে, কেবল মাঠপর্যায়ে দুর্ঘটনাবশত বা চেকপোস্টে ধরা পড়া দু-একজন মাদক বহনকারী কিংবা খুচরা সরবরাহকারীকে গ্রেপ্তার করলেই মাদকের মতো এই সামাজিক ক্যান্সারের স্থায়ী কোনো সমাধান বা প্রতিকার পাওয়া সম্ভব হবে না। মাদকের মূল শেকড় উৎপাটন করতে হলে এর আসল উৎস কোথায়, কোন পাইকারি সিন্ডিকেট থেকে এসব ইয়াবা আসছে, সরবরাহের মূল নেটওয়ার্কটি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং এই অপরাধ সাম্রাজ্যের পেছনে থাকা অদৃশ্য মূল হোতারা কারা—তাদের সবাইকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে আইনের কঠোর কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।

পাশাপাশি, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তথা তরুণ সমাজকে সর্বনাশা মাদকদ্রব্যের করাল গ্রাস থেকে চিরতরে দূরে ও নিরাপদ রাখতে হলে কেবল পুলিশের একার চেষ্টার ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। এর জন্য পরিবার থেকে শুরু করে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সম্মানিত জনপ্রতিনিধি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এক মঞ্চে এসে অত্যন্ত জোরালোভাবে সমন্বিত ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের খেলাধুলা, সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা এবং নৈতিক শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত করতে পারলে তারা অপরাধের পথ থেকে দূরে থাকবে। লালপুর উপজেলাসহ সমগ্র নাটোর জেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়মিত, নিরপেক্ষ এবং কঠোর মাদকবিরোধী অভিযান ভবিষ্যতেও একইভাবে অব্যাহত থাকুক—এটাই বর্তমান সময়ের সর্বস্তরের সচেতন নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের একমাত্র ঐকান্তিক প্রত্যাশা।

সূত্র: লালপুর প্রেসক্লাব প্রতিনিধি ও ওয়ালিয়া পুলিশ ফাঁড়ি প্রেস নোট।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন