প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
আমাদের সমাজের অন্ধকার কোণে আজও নারীর ওপর পারিবারিক নির্যাতন এবং অমানবিক নিপীড়নের ঘটনাগুলো যেভাবে অব্যাহত রয়েছে, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং লজ্জায় অবনমিত করে। বিয়ের পবিত্র সম্পর্কের পর যেখানে পারস্পরিক ভালোবাসাবন্ধন এবং শ্রদ্ধাবোধ দিয়ে একটি সুন্দর সংসার গড়ে ওঠার কথা, সেখানে লোভের বশবর্তী হয়ে পৈশাচিক নির্যাতন চালানোর মতো নৃশংসতা সমাজকে প্রতিনিয়ত কলুষিত করছে। বিশেষ করে যৌতুকের মতো একটি অভিশপ্ত সামাজিক ব্যাধির কারণে বহু নিরীহ নারীর জীবন মুহূর্তের মধ্যে নরকতুল্য হয়ে ওঠে এবং তাদের স্বপ্নগুলো চিরতরে অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়ে যায়। আইনি নিষেধাজ্ঞা এবং সচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এখনো লোমহর্ষক উপায়ে গৃহবধূদের ওপর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার চালানোর সংবাদ আমাদের বিচলিত করে তোলে। পরিবারের আপন মানুষগুলো যখন ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিংবা অতিরিক্ত লালসার কারণে একজন অসহায় নারীর ওপর বর্বরোচিত আচরণ করে, তখন তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না। সম্প্রতি ময়মনসিংহের একটি শান্ত ও গ্রামীণ জনপদে এমনই এক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে, যা চারদিকে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় তুলেছে।
আরও পড়ুন: নেপালের প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানির ঘটনায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির গভীর শোক প্রকাশ
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এবং স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্যানুযায়ী, সম্প্রতি ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা উপজেলার একটি প্রত্যন্ত জনপদে এই অমানবিক ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছে। তারাকান্দা উপজেলার অন্তর্গত শান্ত পরিবেশের পলাশকান্দা গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে পরিচিত এক দম্পতির সংসারে এই কলঙ্কজনক অধ্যায় রচিত হয়েছে। ভুক্তভোগী ওই গৃহবধূর নাম অন্তরা, যিনি তার পিতা ওয়াসিম ও মাতা ফাতেমা আক্তারের অত্যন্ত আদরের সন্তান হিসেবে একটি সাধারণ পরিবারে বড় হয়ে উঠেছিলেন। পারিবারিকভাবে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ বা সামাজিক আলোচনার মধ্য দিয়ে পলাশকান্দা গ্রামেরই নিবাসী রাসেল নামের এক যুবকের সঙ্গে অন্তরার আক্দ্ বা বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল। বিয়ের প্রারম্ভিক সময়গুলোতে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও খুব অল্পদিনের মধ্যেই সেই সাজানো সংসারে কালো মেঘের ছায়া নেমে আসে এবং স্বামীর প্রকৃত রূপ উন্মোচিত হতে শুরু করে। বিয়ের কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পরপরই স্বামী রাসেল বিভিন্ন অজুহাতে যৌতুকের দাবি তুলতে শুরু করেন এবং তার জেরে অন্তরার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই নির্যাতনের মাত্রা কেবল বৃদ্ধিই পায়নি, বরং তা এক পর্যায়ে চরম পৈশাচিক রূপ ধারণ করে এবং গৃহবধূর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে।
নির্যাতনের এই ভয়ংকর ধারাবাহিকতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে ভুক্তভোগী নারী অন্তরা জানান যে, তাদের সংসারে একটি ফুটফুটে ছেলেসন্তান জন্ম নেওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি আরও বেশি বিপজ্জনক ও অসহনীয় হয়ে ওঠে। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সমস্ত কষ্ট সহ্য করার চেষ্টা করলেও স্বামী রাসেলের লোভ এবং তার পরিবারের সদস্যদের অমানবিক মানসিকতা কোনোভাবেই প্রশমিত হয়নি। যৌতুকের জন্য নতুন করে চাপ প্রয়োগ করার পাশাপাশি তাঁকে নিয়মিত মারধর করা হতো, মানসিকভাবে চরম হেনস্তা করা হতো এবং ঘরের ভেতর তালাবদ্ধ করে আটকে রাখা হতো। শুধু তাই নয়, নির্যাতনের মাত্রা যখন সমস্ত সীমা অতিক্রম করে যায়, তখন অপরাধীরা তার মাথার লম্বা চুলগুলো অত্যন্ত নির্মমভাবে কেটে দেয়, যা নারীর সামাজিক মর্যাদার ওপর চরম আঘাত। নিজের সম্ভ্রম বাঁচাতে এবং এই অমানবিক অত্যাচারের প্রতিবাদ করার কোনো সুযোগ না পেয়ে অন্তরা কেবল নিরবে চোখের জল ফেলেছেন এবং জীবনের চরম মুহূর্তগুলো পার করেছেন। দিনের পর দিন এই অশ্বনীয় নির্যাতন সহ্য করতে করতে যখন তার বেঁচে থাকার সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে আসছিল, তখন তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
আরও পড়ুন: যশোরে স্বামীর মৃত্যুর পর সম্পত্তির বিরোধে সত্তর বছরের মাকে বাড়ি থেকে তাড়াল ছেলেরা
অবস্থা যখন সম্পূর্ণ অসহনীয় এবং জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়াল, তখন অন্তরা তার কোলের সেই অবুঝ ছোট সন্তানটিকে সঙ্গে নিয়ে স্বামীর গৃহ থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। রাতের আঁধারে বা অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে পালিয়ে এসে তিনি তার পিতা ওয়াসিম ও মাতা ফাতেমা আক্তারের নিরাপদ আশ্রয়ে অর্থাৎ নিজের পিতৃগৃহে গিয়ে পৌঁছান। বর্তমানে তিনি তার সেই ছোট্ট সন্তানটিকে বুকে আগলে নিয়ে অত্যন্ত কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করছেন এবং মানসিকভাবে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন। স্বামীর বাড়ি থেকে পালিয়ে আসার পরও নির্যাতনকারী পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অনুশোচনা বা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়নি, বরং তারা সম্পূর্ণ উদাসীনতা প্রদর্শন করেছে। অন্তরার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ অনুযায়ী, স্বামীর এই অমানবিক আচরণের কথা স্থানীয়ভাবে বা পারিবারিকভাবে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত স্বামীর পক্ষ থেকে কোনো প্রকার খোঁজখবর বা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চরম আশঙ্কায় দিন কাটানো এই অসহায় নারীর কান্নায় তার পিতা-মাতার বুকও ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।
এই ভয়াবহ নির্যাতনের ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী অন্তরা এবং তার পরিবার অত্যন্ত গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছেন এবং তারা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। বর্তমানে প্রশাসন এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার আশু হস্তক্ষেপ কামনা করে অন্তরা নিজের ও তার কোলের ছোট্ট সন্তানটির পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আকুল আবেদন জানিয়েছেন। স্বামীর গৃহের নির্যাতন থেকে মুক্তি পাওয়ার পর এখন তারা আইনগত লড়াইয়ের মাধ্যমে এই জঘন্য অপরাধের সঠিক বিচার পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মহলের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। স্থানীয় সচেতন মহল এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এই বর্বরোচিত ঘটনার তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছে এবং অভিযুক্ত স্বামীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জোরালো করে তুলেছে। সমাজের প্রতিটি মানুষের উচিত এই ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো অবলা নারীকে এভাবে যৌতুকের বলি হতে না হয়।
পরিশেষে বলা যায় যে, ময়মনসিংহের তারাকান্দায় যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূ অন্তরার ওপর শারীরিক নির্যাতন এবং চুল কেটে দেওয়ার এই নির্মম ঘটনাটি সমাজের চরম অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি। নির্যাতিতা নারী ও তার সন্তানের পূর্ণ নিরাপত্তা এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আজ প্রশাসন ও সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের ওপর বর্তায়। আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা সমাজ থেকে চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব—এটাই আজকের দিনে আমাদের সকলেরকান্ত প্রত্যাশা।
প্রতিবেদনের সূত্র: স্থানীয় প্রতিনিধি ও সংবাদ মাধ্যম।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।