প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
দক্ষিণ এশিয়ার হিমালয় কন্যা নেপালে চলমান নজিরবিহীন প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও ভয়াবহ প্লাবনের মাঝেই এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও মানবতাহীন অপরাধের খবর সামনে এসেছে। আকস্মিক ঢল ও প্রলয়ংকরী বন্যায় নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়া একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাঁজোয়া লকার বা ভল্ট ভাঙচুর করে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটের অপরাধে ২৯ জন স্থানীয় অধিবাসীকে গ্রেফতার করেছে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রলয়ংকরী বন্যায় সৃষ্ট জনজীবনের সীমাহীন দুর্ভোগের সুযোগ নিয়ে এই অর্থ চুরির ঘটনা ঘটে। ধাদিং জেলার পাশ দিয়ে প্রবাহিত প্রমত্তা ত্রিশুলি নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া ওই বিশেষ লোহার ভল্টটি তছনছ করে আত্মসাৎ করা অন্তত ৯২ লাখ ৬৮ হাজার নেপালি রুপি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে স্থানীয় নেপাল পুলিশ। মানুষের প্রাণহানি ও হাহাকারের মাঝে এমন হীন চুরির ঘটনা দেশটির সামাজিক মাধ্যমে তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছে।
আরও পড়ুন: ময়মনসিংহে ১৭ বছর বয়সের মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে পিতা গ্রেপ্তার
পুলিশি তদন্ত ও স্থানীয় উদ্ধারকারী দল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত পার্বত্য রসুয়া জেলার একটি অর্থলগ্নি ব্যাংকের শাখা কার্যালয় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পানির তোড়ে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়। পাহাড়ি ঢলে ধসে পড়া ওই ব্যাংক ভবন থেকেই শক্তিশালী ধাতব ভল্টটি ভেসে এসে বহুদূরে ধাদিং জেলার ত্রিশুলি নদীর চরে এসে আটকা পড়ে। পানির স্রেاتے তীরে উঠে আসা লকারটি দেখতে পেয়ে একদল স্থানীয় দুর্বৃত্ত ও কৌতূহলী মানুষ একত্রিত হয়ে তা প্রযুক্তি ও হাতিয়ার দিয়ে ভেঙে ফেলে। ভেতরে রক্ষিত গচ্ছিত অর্থ লুটপাট করে তারা আত্মগোপনে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে। খবর পেয়ে নেপাল পুলিশের একটি বিশেষ টিম অভিযান চালিয়ে ঘটনার সাথে জড়িত ২৯ জন অভিযুক্তকে আটক করে এবং উদ্ধারকৃত প্রায় ৯২.৬৮ লাখ নেপালি মুদ্রা রাষ্ট্রীয় হেফাজতে গ্রহণ করে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষাদময় পরিস্থিতির মাঝে নীতিবোধের অবক্ষয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে আরও একটি মর্মান্তিক ঘটনায়। বন্যায় ভেসে আসা এক দুর্ভাগ্যবান মৃত নারীর দেহ থেকে কানের সোনার দুল ও অলংকার চুরির অপরাধে পৃথক অভিযানে আরও দুজনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বানের পানিতে ভেসে যাওয়া নিথর মরদেহ থেকে গয়না খুলে নেওয়ার এই চরম অমানবিক ঘটনা পুলিশি অনুসন্ধানে প্রমাণিত হওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দুর্যোগের এই কঠিন মুহূর্তে দুর্গত মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে এমন অপরাধমূলক মনস্তাত্ত্বিক তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি জারি করেছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর।
আরও পড়ুন: তিব্বতে কৃত্রিম হ্রদের বাঁধ ভেঙে ফের প্লাবন, থমকে গেল উদ্ধারকাজ
এদিকে নেপাল জুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে স্মরণকালের সবচেয়ে প্রলয়ংকরী এই বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৬২৬ জনে দাঁড়িয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা মারাত্মক কাদা-পানির তোড় এবং নদীর প্লাবনে বহু গ্রাম ও নগর ধসে পড়েছে। এখনও পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ৪২৬ জন ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ৫১৭ জন বিদেশী পর্যটক ও প্রবাসী নাগরিক রয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সূত্রে জানা গেছে। নিখোঁজদের খোঁজে ও বানের জলে আটকে থাকা দুর্গত মানুষদের জীবন রক্ষার্থে নেপাল সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং স্থানীয় উদ্ধারকারী দলসমূহের যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
হিমালয় ঘেরা অঞ্চলগুলোতে টানা প্রবল বর্ষণে প্রধান সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গম পার্বত্য এলাকায় উদ্ধারকারী যান ও ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নেপাল সরকার ইতোমধ্যেই উপদ্রুত এলাকাগুলোতে জরুরি অবস্থা জারি করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে মানবিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। গৃহহীন হয়ে পড়া হাজার হাজার পরিবার অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে জাতীয় বিপদের এই মুহূর্তে যেকোনো ধরনের চুরি বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রুখতে দুর্গত এলাকাগুলোতে পুলিশি টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য, দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে কেউ জনসম্পদ বা ব্যাংকের সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সামগ্রিক এই ভূ-রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক সংকটে সমগ্র নেপাল জুড়েই এক বিভীষিকাময় পরিবেশ বিরাজ করছে। উদ্ধার পাওয়া সম্পদ এবং গ্রেফতার হওয়া অপরাধীদের আদালতে সোপর্দ করার আইনি প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। নেপালের সাধারণ জনগণ মানবিক মূল্যবোধ বজায় রেখে দুর্গতদের সহায়তায় এগিয়ে আসার অঙ্গীকার করছেন। আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপে খুব দ্রুততম সময়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছানোর ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে দেশটির প্রশাসন।
সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও নেপাল পুলিশ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।