প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বিশ্বের বিভিন্ন পাহাড়ি ও নদীমাতৃক অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব এবং প্রকৃতির খামখেয়ালি আচরণের কারণে বর্তমান সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার হিমালয় সংলগ্ন দেশগুলোতে বর্ষাকাল কিংবা ঋতু পরিবর্তনের সময় আকস্মিক বন্যা এবং প্রলয়ংকরী ভূমিধসের মতো বিপর্যয় মানবসভ্যতার সামনে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে পাহাড়ি ঢলের পানির তীব্রতা এবং পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ার কারণে জনপদগুলো নিমিষেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং হাজার হাজার মানুষের জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে পতিত হয়। এ ধরনের আকস্মিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলোর পূর্বাভাস দেওয়া অনেক সময়ই অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে, যার ফলে সাধারণ মানুষ কিংবা সেখানে বেড়াতে যাওয়া পর্যটকরা চরম বিপদের শিকার হন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই নির্মম রূপ কেবল স্থানীয় বাসিন্দাদেরই নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভ্রমণপিপাসী ও পর্যটকদের জীবনকেও মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। হিমালয়কন্যা খ্যাত আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপালের একটি জনবহুল ও পাহাড়ি অঞ্চলে সম্প্রতি এমনই এক বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনেছে, যা পুরো বিশ্ববাসীকে গভীরভাবে শোকাহত ও স্তব্ধ করে দিয়েছে।
আরও পড়ুন: নাটোরে পায়ুপথে অভিনব কায়দায় হেরোইন পাচারের সময় র্যাবের হাতে আটক দুই মাদক কারবারি
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে প্রাপ্ত অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যানুযায়ী, নেপাল রাষ্ট্রের মধ্যাঞ্চলীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত বাগমাতি প্রদেশের রসুয়া ও তার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে এই মর্মান্তিক বিপর্যয় সংঘটিত হয়েছে। ওই পাহাড়ি অঞ্চলে গত কয়েক দিন ধরে চলা অবিরাম বর্ষণ এবং এর ফলে সৃষ্ট আকস্মিক প্রলয়ংকরী বন্যা ও পাহাড় ধসের কারণে পুরো এলাকায় এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক তাণ্ডবের ফলে প্রমত্ত নদীর পানি উপচে পড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যে ঘরবাড়ি, পাকা সড়ক, সেতু এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের বহুমুখী অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়। গত কয়েকদিনের টানা উদ্ধার কার্যক্রম ও তল্লাশি অভিযান চলার পর স্থানীয় প্রশাসন নিশ্চিত করেছে যে এই ভয়ংকর আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃত্যুর সংখ্যা ইতিমধ্যে বৃদ্ধি পেয়ে একশো বাষট্টি জনে গিয়ে ঠেকেছে। উদ্ধারকর্মীরা দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের গভীর কাদা ও ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে একের পর এক মৃতদেহ উদ্ধার করছেন, যার ফলে প্রাণহানির এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রাকৃতিক এই বিপর্যয়ের সময় ওই অঞ্চলে অবস্থানরত বহু সংখ্যক সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি পর্যটকও মারাত্মক বিপদের মুখে পড়েছেন বলে সরকারি সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় এখন পর্যন্ত প্রায় পাঁচশো উনআশি জন পর্যটক বা সাধারণ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে, যাদের ভাগ্য নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নিখোঁজ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে চারশো জনেরও বেশি মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বেড়াতে আসা বিদেশি নাগরিক বলে নিশ্চিত করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। নিখোঁজ বিদেশি পর্যটকদের তালিকায় বিশ্বের বিভিন্ন পরাশক্তি ও প্রতিবেশী দেশের নাগরিকরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন, যা এই দুর্যোগের ব্যাপকতা ও ভয়াবহতাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্যানুযায়ী, নিখোঁজদের এই দীর্ঘ তালিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা আমেরিকার চৌ্পান জন নাগরিক, অস্ট্রেলিয়ার চৌত্রিশ জন নাগরিক এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য থেকে ভ্রমণ করতে যাওয়া একশো পাঁচ জন মানুষ রয়েছে। দেশের বাইরে বেড়াতে গিয়ে এই ধরনের প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতেও শোকের মাতম শুরু হয়েছে এবং স্বজনরা গভীর উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: কক্সবাজার সৈকতে প্রমোদতরি ডুবি: নিখোঁজ নিউজিল্যান্ডের কিশোরের মরদেহ কক্সবাজার
এমন এক মারাত্মক মানবিক সংকটের মুখে পড়ে নেপালের সাধারণ মানুষ এবং দুর্গত পর্যটকদের সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বিভিন্ন ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া শুরু হয়েছে। বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নেপালের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি পুনর্বাসন এবং উদ্ধারকাজের জন্য পাঁচ লক্ষ মার্কিন ডলার আর্থিক সহায়তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করেছে। নেপালের অভ্যন্তরে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ায় এবং দুর্গম পাহাড়ি রাস্তাঘাট কাদায় ডুবে থাকায় সাধারণ উদ্ধারকর্মীদের পক্ষে সহজে সেখানে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে নেপাল সেনাবাহিনী অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ময়দানে নেমে পড়েছে এবং আধুনিক হেলিকপ্টারসহ বিশেষ উদ্ধারকর্মী দল মোতায়েন করে দুর্গত এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। আকাশপথে খাদ্যসামগ্রী ও ওষুধপত্র পৌঁছানোর পাশাপাশি আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে আনার জন্য সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দিনরাত নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাও এই উদ্ধার কার্যক্রমে নেপাল সরকারকে সব ধরনের কারিগরি ও চিকিৎসাসেবা দিয়ে সহায়তা করার জন্য এগিয়ে আসছে বলে জানা গেছে।
এই প্রলয়ংকরী বন্যা ও ভূমিধসের মারাত্মক আঘাত কেবল নেপালের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এর প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে তিব্বতের বিভিন্ন অঞ্চলেও সমানভাবে অনুভূত হয়েছে। তিব্বতের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও পাহাড়ি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত গিরং কাউন্টিতেও এই আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তিব্বতের ওই নির্দিষ্ট কাউন্টিতে বন্যায় ভেসে গিয়ে বা চাপা পড়ে অন্তত তিন জন সাধারণ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজের সংখ্যা হু হু করে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিব্বতের গিরং কাউন্টি এলাকায় বন্যায় নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বর্তমানে বেড়ে গিয়ে পাঁচশো আটান্ন জনে দাঁড়িয়েছে, যা দুই দেশের সীমান্ত অঞ্চলেই এক বিশাল দুর্যোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সীমানার উভয় পাশেই প্রাকৃতিক এই ধ্বংসলীলার পর থেকে নিখোঁজ মানুষগুলোকে জীবিত কিংবা মৃত উদ্ধারের উদ্দেশ্যে দুই দেশের যৌথ বা পৃথক উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত জোরদার করা হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং বরফাবৃত পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে উদ্ধারকর্মীরা দুর্গম গিরিপথগুলোতে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন যাতে সম্ভাব্য জীবিত ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
পরিশেষে বলা যায় যে, নেপালের রসুয়া ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সংঘটিত আকস্মিক বন্যা এবং ভূমিধসের এই ঘটনাটি বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের একটি অত্যন্ত নির্মম ও ভয়ংকর বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ। শত শত মানুষের নিখোঁজ হওয়া এবং বহু মানুষের প্রাণহানি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার পাহাড়ি জনপদের সুরক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমরা এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিহত সকল মানুষের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি এবং নিখোঁজ পর্যটক ও নাগরিকদের দ্রুত অক্ষত অবস্থায় খুঁজে পাওয়ার জন্য প্রার্থনা জানাই। বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে এবং এ ধরনের আকস্মিক প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মহলের আরও বেশি সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি—এটাই আজকের দিনে সকলেরকান্ত প্রত্যাশা।
প্রতিবেদনের সূত্র: আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।