প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার এবং বিশ্বের দীর্ঘতম বালুকাবেলা হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে সব সময়ই দারুণ আকর্ষণীয় একটি অবকাশ যাপন কেন্দ্র। সাগরের বিশাল ঢেউয়ের মিতালি আর উপকূলের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করার উদ্দেশ্যে প্রতিদিন হাজার হাজার ভ্রমণপিপাসী মানুষ এই সৈকতে ভিড় জমান এবং নানা ধরনের প্রমোদতরি বা জলযানে চড়ে সমুদ্রের বুকে ঘুরে বেড়ান। তবে সমুদ্রের আবহাওয়া এবং স্রোতের তীব্রতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকলে কিংবা হঠাৎ করে আবহাওয়া দুর্যোগপূর্ণ হয়ে উঠলে অনেক সময়ই এই আনন্দ ভ্রমণ এক ভয়াবহ ও মর্মান্তিক রূপ ধারণ করতে পারে। বিশ্বের দীর্ঘতম এই সমুদ্র সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে অতীতেও অনেক জলযান দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা পর্যটক এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সবসময় সতর্ক থাকার তাগিদ দিয়ে আসছে। সম্প্রতি কক্সবাজারের এমনই এক জনপ্রিয় সামুদ্রিক পয়েন্টে প্রমোদতরি ডুবে যাওয়ার এক লোমহর্ষক দুর্ঘটনা ঘটে গেছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক শোকের ছায়া ফেলেছে। বিদেশি পর্যটকদের নিয়ে ঘুরতে যাওয়া একটি জলযান হঠাৎ সাগরের প্রবল ঢেউয়ের মুখে পড়ে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাওয়ার ফলে এক কিশোরের প্রাণহানির এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে।
আরও পড়ুন: বিএনপি আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও জনপ্রিয় দলে পরিণত হয়েছে: রুহুল কবির রিজভী
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এবং স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে প্রাপ্ত অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যানুযায়ী, গত সপ্তাহের শুরুতে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের অত্যন্ত পরিচিত ও জনবহুল নাজিরারটেক পয়েন্টের কাছাকাছি এই দুর্ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল। পর্যটকদের নিয়ে সমুদ্রের বুকে আনন্দ ভ্রমণ করার জন্য নির্ধারিত আইল্যান্ড গার্ল নামক একটি প্রমোদতরি বা বিশেষ ধরনের বোট নিয়ে নিউজিল্যান্ড থেকে আগта একটি বিদেশি পরিবার সাগরে নেমেছিল। বোটটিতে থাকা ওই পরিবারের সদস্যরা সাগরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন, কিন্তু হঠাৎ করেই সমুদ্রের আবহাওয়া অত্যন্ত প্রতিকূল হয়ে ওঠে এবং প্রমোদতরিটির ওপর প্রবল ঢেউ ও পানির তীব্র স্রোত আছড়ে পড়ে। সাগরের পানির ওই প্রচণ্ড ধাক্কা এবং স্রোতের তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে আইল্যান্ড গার্ল নামের বোটটি মুহূর্তের মধ্যে মাঝবরাবর দুই টুকরো হয়ে ভেঙে যায় এবং এর ভেতরে থাকা যাত্রীরা সাগরের উত্তাল জলে ছিটকে পড়ে যান। বোটটি ভেঙে যাওয়ার পরপরই সেখানে চরম আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় এবং পরিবারের সদস্যরা নিজেদের জীবন বাঁচাতে সাঁতার কেটে বা অন্যের সহায়তায় বাঁচার আকুতি জানাতে শুরু করেন। আকস্মিক এই বিপদের মুহূর্তে আশপাশের মৎস্যজীবী ও স্থানীয় সচেতন মানুষ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে এসে তাদের উদ্ধারের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালান।
স্থানীয় লোকজনের সাহসিকতা এবং তাৎক্ষণিক তৎপরতার ফলে ওই প্রমোদতরিতে থাকা চারজন সদস্যের মধ্যে সৌভাগ্যক্রমে তিনজনকেই জীবিত অবস্থায় সফলভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল, যা বড় ধরনের প্রাণহানি কিছুটা হলেও রোধ করেছিল। কিন্তু উদ্ধারকৃতদের বাইরে পরিবারের ১৬ বছর বয়সী কিশোর সদস্য আলবার্ট নিখোঁজ হয়ে যান এবং উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের মাঝে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না বলে পরিবার সূত্রে জানা যায়। ঘটনার পরপরই নিখোঁজ ওই বিদেশি কিশোরকে জীবিত কিংবা মৃত উদ্ধারের উদ্দেশ্যে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে একটি বিশাল যৌথ উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়। বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ডের অভিজ্ঞ ডুবুরি দল, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকর্মী এবং স্থানীয় অভিজ্ঞ জেলেদের সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌথ দল সাগরের বুকে দীর্ঘ সময় ধরে তল্লাশি পরিচালনা করে। উত্তাল তরঙ্গ এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সাগরের পানির নিচে তল্লাশি চালানো অত্যন্ত দুরূহ হলেও উদ্ধারকর্মীরা বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে একটানা চেষ্টা চালিয়ে যান। নিখোঁজ কিশোরের পরিবারের সদস্যরা উপকূলের তীরে অত্যন্ত উৎকণ্ঠা ও বুকভাঙ্গা বেদনা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে থাকেন এবং প্রতিটি মুহূর্ত যেন তাদের জন্য এক দুঃসহ যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছিল।
আরও পড়ুন: খুলনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও চিকিৎসাসেবা পরিদর্শনে মহানগর বিএনপি নেতৃবৃন্দ
দীর্ঘ প্রায় একত্রিশ ঘণ্টা বা একদিনের বেশি সময় ধরে চলা এই টানা তল্লাশি অভিযানের পর অবশেষে কাঙ্ক্ষিত সেই দুঃখজনক সংবাদটি উপকূলের মানুষের কানে এসে পৌঁছায় এবং চারদিকে শোকের মাতম শুরু হয়। গত বুধবার বিকেলে আনুমানিক পাঁচটার দিকে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের নির্দিষ্ট পাড়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষ একটি মরদেহ ভেসে আসতে দেখেন এবং পুলিশকে তাৎক্ষণিকভাবে খবর দেন। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় থানা পুলিশ এবং উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং সৈকতের বালি থেকে মরদেহটি উদ্ধার করেন। পরবর্তীতে উদ্ধারকৃত মরদেহটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত করা হয় যে এটি আর কেউ নয়, বরং প্রমোদতরি ডুবিতে নিখোঁজ হওয়া নিউজিল্যান্ডের সেই ষোলো বছর বয়সী দুর্ভাগা কিশোর আলবার্টেরই মরদেহ। দীর্ঘ একত্রিশ ঘণ্টা ধরে সাগরের বুকে নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে তার মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ার মাধ্যমে এই উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘটে, যা উপস্থিত সকলের হৃদয়ে গভীর বেদনা সৃষ্টি করেছিল। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য উদ্ধারকৃত মরদেহটি দ্রুত কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে, যেখানে ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়।
বিদেশি পর্যটকদের নিয়ে পরিচালিত এই ধরনের প্রমোদতরিগুলোর চলাচলের সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও লাইফ জ্যাকেট পরিধানের বিষয়টি যথাযথভাবে মানা হচ্ছিল কি না, তা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের বিনোদনের ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ইজারাদার বা বোট চালকদের আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়া উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন। আকস্মিক আবহাওয়া পরিবর্তন বা সাগরের জোয়ার-ভাটার তীব্রতা মোকাবিলা করার মতো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া এ ধরনের জলযান সাগরে নামানো ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। জেলা প্রশাসন এবং ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে এই দুর্ঘটনার মূল কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে কঠোর নজরদারি বজায় রাখা হবে। বিদেশি নাগরিকের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে আন্তর্জাতিক মহলেও শোকের আবহ তৈরি হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
পরিশেষে বলা যায় যে, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের নাজিরারটেক পয়েন্টে প্রমোদতরি ডুবে গিয়ে নিউজিল্যান্ডের কিশোর আলবার্টের এই প্রাণহানির ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও বেদনাদায়ক। আনন্দের উদ্দেশ্যে সমুদ্র ভ্রমণে এসে একটি পরিবারের এমন মর্মান্তিক পরিণতি আমাদের পর্যটন খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। আমরা এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় নিহত কিশোরের আত্মার শান্তি কামনা করি এবং তার শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করি। সমুদ্র সৈকতগুলোতে পর্যটকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা চিরতরে রোধ করা সম্ভব হবে—এটাই আজকের দিনে সকলেরকান্ত প্রত্যাশা।
প্রতিবেদনের সূত্র: ট্যুরিস্ট পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।