নেতানিয়াহুর ছেলেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণনাশের হুমকি, ইসরায়েলে প্রত্যাবর্তন

নেতানিয়াহুর ছেলেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণনাশের হুমকি, ইসরায়েলে প্রত্যাবর্তন
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জ্যেষ্ঠ পুত্র ইয়াইর নেতানিয়াহুকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে চরম তোলপাড় শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও একাধিক কূটনৈতিক গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে জানা গেছে, প্রাণনাশের সুনির্দিষ্ট ও অত্যন্ত বিপজ্জনক ঝুঁকির মুখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে জরুরি ভিত্তিতে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে ইয়াইর নেতানিয়াহুকে। শনিবার (২৯ আগস্ট ২০২৬) স্থানীয় সময় ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা 'শিন বেট' (Shin Bet) বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে অবস্থান করে আসা প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের ওপর সম্ভাব্য হামলার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় তাকে এবং তার নিরাপত্তায় নিয়োজিত বিশেষ দলকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে মাতৃভূমি ইসরায়েলে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়।

আরও পড়ুন: মালয়েশিয়ায় ২ লাখ শ্রমিক নিয়োগ ও ২০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা

ইসরায়েলি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেট এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতির মাধ্যমে প্রকাশ করেছে যে, মার্কিন ভূখণ্ডে অবস্থানকালে ইয়াইরের ওপর হামলার একটি উল্লেখযোগ্য ও বাস্তবসম্মত ঝুঁকি উদ্ভূত হয়েছিল। এই সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই আর কোনো প্রকার বিলম্ব না করে অবিলম্বে তাঁকে ইসরায়েলে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ। তবে জাতীয় নিরাপত্তার স্পর্শকাতরতা এবং সার্বিক সামরিক গোয়েন্দা কৌশলের সুরক্ষার স্বার্থে এই মারাত্মক হুমকির মূল উৎস কিংবা সুনির্দিষ্ট হামলাকারী গোষ্ঠীর নাম প্রকাশ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থেকেছে প্রতিষ্ঠানটি। ঘটনাটি বৈশ্বিক কূটনৈতিক অঙ্গন এবং উচ্চ পর্যায়ের সামরিক মহলে ব্যাপক তোলপাড়ের জন্ম দিয়েছে, কারণ কোনো রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতার পরিবারকে মার্কিন ভূখণ্ড থেকে এভাবে জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত নজিরবিহীন।

এদিকে শিন বেটের দাপ্তরিক ঘোষণার আগে মার্কিন শীর্ষস্থানীয় খবরের মাধ্যম ‘নিউজম্যাক্স’-এর এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে চমকপ্রদ তথ্য উপস্থাপন করা হয়। উক্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট দাবি করা হয়েছিল যে, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে ফ্লোরিডায় অবস্থানকালে ইয়াইর নেতানিয়াহু ইরানের এক পরিকল্পিত গোপন গুপ্তহত্যা পরিকল্পনার মূল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যমটির দাবি অনুযায়ী, ইরানি নেটওয়ার্কের এই বিপজ্জনক চক্রান্তের তথ্য জানার পর পরই ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাত্ক্ষণিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের শীর্ষ প্রতিরক্ষা ও তদন্তকারী সংস্থাসমূহকে বিস্তারিত অবহিত করে। এর পর থেকেই ফ্লোরিডায় ইয়াইরের বাসভবন এবং তাঁর চলাচলের ওপর অভূতপূর্ব উচ্চমাত্রার বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন: লংমার্চের ১ লাখ লিটার তেল নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রীর

রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টিকে আরও ঘনীভূত করে তোলে যখন স্বয়ং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি দেওয়া এক বিশেষ গণমাধ্যম সাক্ষাৎকারে ইরানের বিরুদ্ধে এমন বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন। উক্ত সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু সরাসরি দাবি করেছিলেন যে, ইরানের গোপন নেটওয়ার্ক ফ্লোরিডায় তাঁর এক সন্তানকে হত্যার সুনির্দিষ্ট চক্রান্ত সম্পাদন করেছিল। বহু বছর ধরে ফ্লোরিডায় স্থায়ীভাবে বাস করা ইয়াইর নেতানিয়াহু প্রায়শই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর বাবার রাজনৈতিক নীতি সমর্থনের কারণে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতেন। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাঁকেও এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়েছিল, যা পরবর্তীতে তাঁর ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত বড় আকারের হুমকির উৎস হয়ে দাঁড়ায়।

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান ছায়াযুদ্ধ এবং সংঘাতময় পরিস্থিতির মাঝে এই ঘটনাটি জনসমক্ষে আসায় বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যুক্ত হলো। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে অত্যন্ত নিবিড় গোয়েন্দা সমন্বয় বজায় রেখে ইয়াইরকে ফিরিয়ে আনা হলেও দুই দেশের নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যে উচ্চ সতর্কতা বলবৎ রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো সর্বোচ্চ সুরক্ষিত রাষ্ট্রের মাটিতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ছেলের ওপর এমন ঝুঁকি তৈরি হওয়া মার্কিন নিরাপত্তার জন্যও এক বিরাট বার্তা। এর ফলে রাষ্ট্রপ্রধানদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার স্বার্থে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও সুরক্ষানীতি আরও কঠোর করা হতে পারে।

বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর ছেলের এই আকস্মিক প্রত্যাবাসন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে দেশের সামরিক বাহিনী যখন জটিল সংঘাতে নিয়োজিত, অন্যদিকে প্রবাসে দীর্ঘ অবস্থান নিয়ে এতদিন যে সমালোচনা চলছিল, তা নতুন মোড় নিল। নিরাপত্তা শঙ্কা ও প্রাণনাশের प्रत्यक्ष হুমকির কারণে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে সার্বিক প্রশাসনিক তৎপরতা ত্বরান্বিত হলো। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মোড় কোন দিকে ধাবিত হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও শিন বেট।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন