পাকিস্তানের হাসপাতালে এসির কম্প্রেসর বিস্ফোরণে ১৫ নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যু

পাকিস্তানের হাসপাতালে এসির কম্প্রেসর বিস্ফোরণে ১৫ নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যু
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম ত্রুটি ও অবহেলার কারণে মাঝে মাঝে এমন কিছু মর্মান্তিক বিপর্যয় ঘটে যায়, যা মানবসভ্যতাকে গভীরভাবে স্তব্ধ ও শোকাহত করে তোলে। মানুষের জীবন বাঁচানোর পবিত্র ব্রত নিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়, সেখানে যদি উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আকস্মিক কোনো দুর্ঘটনা ঘটে এবং তা নিষ্পাপ শিশুদের প্রাণ কেড়ে নেয়, তবে তা পুরো জাতির জন্য এক চরম কলঙ্ক ও বেদনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে হাসপাতালের মতো অতি সংবেদনশীল স্থানে আধুনিক বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা অবহেলার কারণে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর নিরাপত্তাব্যবস্থাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সম্প্রতি প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানের কেন্দ্রস্থল তথা রাজধানী ইসলামাবাদে অবস্থিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বাধুনিক সরকারি মেডিকেল প্রতিষ্ঠানে এমনই এক হৃদয়বিদারক, লোমহর্ষক এবং মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। চিকিৎসালয়টির ভেতরে ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের ফলে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই ঝরে গেছে প্রায় দেড় ডজন নিষ্পাপ নবজাতক শিশুর অমূল্য প্রাণ, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে ৫৫তম ঐতিহাসিক জশনে জুলুস ও লাখো মানুষের ঢল

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিশ্বস্ত কূটনৈতিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত অত্যন্ত বিস্তারিত বিবরণ অনুযায়ী, এই লোমহর্ষক ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ শহরে অবস্থিত দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস বা সংক্ষেপে পিআইএমএস হাসপাতালে। ঘটনার দিনটি ছিল সপ্তাহের একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক কর্মব্যস্ত দিন, যার সময়কাল ছিল গত ছাব্বিশ আগস্ট বুধবারের সকালের ভোরের সূর্যোদয়ের পরপরই। চিকিৎসালয়টির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল বিভাগ হিসেবে পরিচিত স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগের শিশু নার্সারি বা ইনটেনসিভ কেয়ার সংলগ্ন শিশু ওয়ার্ডটিতে সেই মুহূর্তে বেশ কয়েকজন সদ্যোজাত শিশু চিকিৎসাধীন অবস্থায় অবস্থান করছিল। চিকিৎসাধীন এই কোমলমতি শিশুগুলোর বয়স এতটাই কম ছিল যে তারা নিজেদের সুরক্ষার জন্য সম্পূর্ণভাবে হাসপাতালের কৃত্রিম পরিবেশ ও চিকিৎসকদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে অত্যন্ত আকস্মিক এবং অপ্রত্যাশিতভাবে ওই নার্সারি কক্ষের ভেতরে স্থাপন করা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসিটির মূল কম্প্রেসরটিতে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে যায়, যার তীব্রতা পুরো ভবনে অনুভূত হয়।

কম্প্রেসর বিস্ফোরণের শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই মুহূর্তের মধ্যে নার্সারির ভেতরে থাকা বৈদ্যুতিক সংযোগে শর্টসার্কিট ছড়িয়ে পড়ে এবং দাহ্য পদার্থের মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে আগুন চারদিকে মারাত্মকভাবে বিস্তার লাভ করতে শুরু করে। এসি বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া এবং লেলিহান শিখা মুহূর্তের মধ্যে প্রসূতি বিভাগের ওই নবজাতক ওয়ার্ডটিকে গ্রাস করে নেয়, যার ফলে সেখানে উপস্থিত নার্স ও চিকিৎসকদের মাঝে চরম আতঙ্ক ও হাতাশার সৃষ্টি হয়। ঘটনার অত্যন্ত আকস্মিকতায় কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুনের তীব্র কুণ্ডলী এবং বিষাক্ত ধোঁয়া পুরো শিশু ওয়ার্ডটিকে পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে ফেলে, যা শ্বাসরুদ্ধকর এক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছিল। দুর্ঘটনার ওই নির্দিষ্ট মুহূর্তে ওই নার্সারির নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে সর্বমোট ষোলজন সদ্যোজাত নবজাতক শিশু চিকিৎসাধীন অবস্থায় শয্যাগত ছিল বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে। আগুনের লেলিহান শিখা এবং প্রবল ধোঁয়ার কারণে মুহূর্তের মধ্যে রুমের ভেতরের অক্সিজেন মাত্রা কমে যায় এবং শিশুগুলো তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে শুরু করে।

আরও পড়ুন: ফরিদপুরের সালথায় বিশ লিটার দেশি মদসহ এক যুবক গ্রেপ্তার

হঠাৎ করে ছড়িয়ে পড়া এই ভয়ংকর অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকারী দল অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। চারপাশের প্রচণ্ড ধোঁয়া এবং আগুনের তীব্রতার কারণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের ভেতরে প্রবেশ করতে বেশ বেগ পেতে হয়, যার ফলে তাদের উদ্ধারকাজে কিছুটা বিলম্ব ঘটেছিল। পরবর্তীতে উদ্ধারকর্মীরা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে নার্সারি কক্ষের বাইরের জানালার শক্তিশালী কাচ ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করার পথ তৈরি করেন এবং দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালান। দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র লড়াইয়ের পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন সম্পূর্ণ নিভিয়ে ফেলতে সক্ষম হলেও ততক্ষণে সেখানে ঘটে গেছে ইতিহাসের অন্যতম এক বর্বরোচিত ও মর্মান্তিক শিশু মৃত্যুর ঘটনা। অগ্নিকাণ্ডের ভয়াল গ্রাস থেকে প্রসূতি বিভাগের ওই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন থাকা ষোলটি শিশুর মধ্যে মাত্র সৌভাগ্যক্রমে একজনমাত্র শিশুকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, বাকি পনেরোজন নিষ্পাপ নবজাতক শিশু অতিরিক্ত ধোঁয়া এবং আগুনে পুড়ে ঘটনাস্থলেই অত্যন্ত করুণভাবে মৃত্যুবরণ করেছে, যাদের কাউকেই বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

হাসপাতালের ভেতরে এমন একটি মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা ঘটার পর পুরো ইসলামাবাদ শহর জুড়ে এবং দেশের চিকিৎসা মহলে চরম শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এত বড় একটি সরকারি এবং গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে থাকা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ত্রুটি কেন আগে থেকে চিহ্নিত করা হলো না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও নিহত শিশুদের অভিভাবকরা তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন। অবহেলা ও উদাসীনতার দায়ে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করার জন্য দেশজুড়ে জোরালো দাবি ওঠার পর পাকিস্তানের প্রশাসনিক ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসেছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা এবং এই মারাত্মক যান্ত্রিক ত্রুটির পেছনে কোনো ধরনের প্রশাসনিক গাফিলতি বা দুর্নীতি রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখার জন্য অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের সরাসরি নেতৃত্বাধীন এই বিশেষ তদন্ত কমিটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরেজমিন তদন্ত সম্পন্ন করে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে যে এসির কম্প্রেসর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করার ফলে অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন হয়ে এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটেছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অপরাধমূলক অবহেলার শামিল। দায়িত্বহীনতার এই চরম নিদর্শন ফুটিয়ে তুলেছে যে কীভাবে সামান্য কিছু মানুষের অসচেতনতার কারণে একুশ শতকে এসেও এতগুলো নিষ্পাপ শিশুকে প্রাণ হারাতে হলো। পাকিস্তানের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও চিকিৎসা অধিকারকর্মীরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং দোষী ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়ে বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছেন। এই ধরনের দুর্ঘটনা যেন বিশ্বের আর কোনো দেশের হাসপাতালে আর কখনো পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো থেকেও সতর্কবার্তা উচ্চারণ করা হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায় যে, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের পিআইএমএস হাসপাতালে এসি কম্প্রেসর বিস্ফোরণে পনেরোজন নবজাতকের এই মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো বিশ্ববাসীর বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। চিকিৎসালয়ের মতো একটি নিরাপদ স্থানে এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এবং নবজাতক শিশুদের সুরক্ষায় চরম ব্যর্থতা কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য হতে পারে না। আমরা এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত সকল শিশুর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। ভবিষ্যতে হাসপাতালগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের নিয়মিত মান যাচাই নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল এ ধরনের হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব—এটাই আজকের দিনে আমাদের সকলের প্রত্যাশা।

প্রতিবেদনের সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও হাসপাতাল প্রশাসন।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন