প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের বিভিন্ন জনপদে মাদকদ্রব্যের অবৈধ কেনাবেচা এবং এর অপব্যবহার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত তৎপরতা ও কঠোর অভিযান প্রতিনিয়ত পরিচালিত হয়ে আসছে। সমাজের তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার রোধে পুলিশ প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে মাঠে কাজ করছে। সম্প্রতি দেশের মধ্যাঞ্চলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল জেলা ফরিদপুরের সালথা উপজেলা এলাকায় এমন একটি সফল অভিযান পরিচালিত হয়েছে, যা স্থানীয় অপরাধ জগতের অবৈধ কারবারকে অনেকটাই নাড়া দিয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের নিয়মিত ওয়ারেন্ট তামিল এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালানো বিশেষ এই অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ দেশীয় মাদকদ্রব্যসহ এক কুখ্যাত কারবারিকে হাতেনাতে আটক করা হয়েছে, যদিও পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মূল হোতা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন তৎপরতা সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে এবং মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই ইরানে বিশাল নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে যে, আজকের এই চাঞ্চল্যকর অভিযানটি পরিচালিত হয়েছে সোমবার ভোরের দিকে যখন চারপাশের আকাশ সবেমাত্র ফর্সা হতে শুরু করেছিল। ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত সালথা উপজেলার বড় খারদিয়া দক্ষিণপাড়া নামক একটি নির্দিষ্ট গ্রামে পুলিশের অপরাধ দমন ও ওয়ারেন্ট তামিলকারী বিশেষ দলটি তাদের পূর্বনির্ধারিত দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে উপস্থিত হয়েছিল। পুলিশ সদস্যরা যখন ওই নির্দিষ্ট এলাকার বিভিন্ন অলিগলি ও বাড়িঘরের আশপাশে অবস্থান করছিলেন, ঠিক তখনই তাদের কাছে অত্যন্ত গোপন ও বিশ্বস্ত একটি সূত্র থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসে পৌঁছায়। সূত্রটি জানায় যে, ওই গ্রামেরই এক ব্যক্তির বসতবাড়ির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত সুকৌশলে অবৈধ দেশীয় মদের কেনাবেচা এবং নিয়মিত মাদকসেবীদের আড্ডা ও সেবন কার্যক্রম চলে আসছে। এই খবরের সত্যতা যাচাই করার জন্য পুলিশ দেরি না করে তাৎক্ষণিকভাবে সেই নির্দিষ্ট বাড়িটির দিকে অগ্রসর হয় এবং অত্যন্ত সুকৌশলে চারদিক থেকে বাড়িটি ঘিরে ফেলে অভিযান শুরু করে।
পুলিশের উপস্থিতি টের পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওই অবৈধ আস্তানার মূল মালিক বা কারবারি চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং পলায়নের পথ খুঁজতে শুরু করেন। অভিযানের সময় বাড়ির মূল মালিক ও মাদক ব্যবসার মূল হোতা সুজন ওরফে সুজাত অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে পুলিশের নজর এড়িয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন, যার ফলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে ঘরের ভেতরে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ মাদক সেবনরত অবস্থায় আবুল শেখ নামের পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী এক যুবককে হাতেনাতে পাকড়াও করতে সক্ষম হয়, যিনি ওই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ধৃত আবুল শেখকে সঙ্গে রেখে পুলিশ ওই বাড়িটির ভেতরে এবং বিভিন্ন গোপন কোণায় তল্লাশি চালিয়ে বিভিন্ন আকৃতির প্লাস্টিকের বোতল ও বড় বড় কন্টেইনারে সংরক্ষণ করে রাখা বিপুল পরিমাণ তরল দেশীয় মদ উদ্ধার করে। পরিমাপ করে দেখা যায় যে সেখানে সব মিলিয়ে প্রায় উনিশ থেকে বিশ লিটার দেশীয় মদ অবৈধভাবে মজুত করে রাখা হয়েছিল, যা খুচরা ও পাইকারি মূল্যে বিক্রির প্রস্তুতি চলছিল।
আরও পড়ুন: হালুয়াঘাটে বাজারের ব্যাগ থেকে দুটি লজ্জাবতী বানর উদ্ধার করেছে বন অধিদপ্তর
উদ্ধারকৃত মাদকদ্রব্যের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পর্কে পুলিশ জানিয়েছে যে, জব্দ করা এই বিপুল তরল মদের মধ্যে সাতশ পঞ্চাশ মিলিলিটার ধারণক্ষমতার মোট দশটি আলাদা প্লাস্টিকের কাঁচ বা প্লাস্টিক বোতল ছিল। এছাড়া একটি আট লিটারের বড় কন্টেইনারের ভেতরে প্রায় সাত লিটার এবং অপর একটি পাঁচ লিটারের কন্টেইনারে প্রায় সাড়ে চার লিটার পরিমাণের খোলা ও প্রক্রিয়াজাত দেশীয় মদ সংরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। পুলিশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই সমস্ত আলামত ও বোতলগুলো জব্দ করে এবং আইনগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার জন্য ধৃত আবুল শেখকে হাতকড়া পরিয়ে সরাসরি থানায় নিয়ে আসে। পরবর্তীতে সালথা থানা পুলিশের পক্ষ থেকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি সুনির্দিষ্ট ও জোরালো মামলা দায়ের করা হয়, যার মাধ্যমে এই অবৈধ কারবারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়। আইনি সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর পুলিশ ধৃত আসামিকে কঠোর নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফরিদপুরের বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করেছে।
ঘটনার সার্বিক বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলে সালথা থানার সম্মানিত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি মো. বাবলুর রহমান খান বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করেছেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এই আকস্মিক অভিযানে প্রায় বিশ লিটার দেশীয় মদসহ একজনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যাওয়া মূল অভিযুক্ত সুজন ওরফে সুজাতকে আইনের আওতায় আনার জন্য পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং খুব দ্রুত তাকেও গ্রেপ্তার করে আইনের মুখোমুখি করা হবে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেওয়া হবে না এবং সালথা উপজেলাকে সম্পূর্ণ মাদক মুক্ত করতে পুলিশের এই ধরনের বিশেষ অভিযান ভবিষ্যতেও আরও কঠোরভাবে পরিচালনা করা হবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। স্থানীয় সচেতন মহল পুলিশের এই সময়োপযোগী ও সাহসী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং এই অপরাধ চক্রের বাকি সদস্যদেরও দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।
মাদকদ্রব্যের বিস্তার যেকোনো এলাকার সামাজিক শৃঙ্খলা এবং শান্তি বিনষ্ট করার জন্য প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করে থাকে, আর তাই সালথার এই ঘটনাটি সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মফস্বল অঞ্চলগুলোতে এ ধরনের দেশীয় মদের আডডা ও চোরাচালান বন্ধ করতে হলে কেবল পুলিশের অভিযানই যথেষ্ট নয়, বরং স্থানীয় এলাকাবাসী ও জনপ্রতিনিধিদেরও সমানভাবে সচেতন হতে হবে। মাদক ব্যবসায়ীরা যতই চতুর হোক না কেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত নজরদারি থাকলে তারা পার পেয়ে যেতে পারে না, যার প্রমাণ আজকের এই সফল অভিযান। ফরিদপুরের সালথায় বিপুল পরিমাণ মদ উদ্ধার এবং অপরাধী গ্রেপ্তারের এই ঘটনাটি অন্য এলাকার অসাধু কারবারিদের জন্যও একটি বড় ধরনের কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
পরিশেষে বলা যায় যে, ফরিদপুরের সালথায় প্রায় বিশ লিটার দেশীয় মদসহ আবুল শেখ নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার এবং পলাতক সুজনকে ধরার পুলিশি চেষ্টা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্বের এক অনন্য নিদর্শন। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা এই মাদক কারবারিদের শক্ত হাতে দমন করার মাধ্যমেই কেবল একটি সুস্থ, সুন্দর ও অপরাধমুক্ত প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে। আমরা আশা করি পলাতক আসামি খুব শীঘ্রই গ্রেপ্তার হবে এবং এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত পুরো সিন্ডিকেটটি চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে। সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় দেশ থেকে মাদক নামক এই সামাজিক ক্যানসার চিরতরে নির্মূল হয়ে যাক—এটাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
প্রতিবেদনের সূত্র: সালথা থানা পুলিশ ও স্থানীয় প্রতিনিধি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।