প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক ময়দানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান চরম কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান জ্বালানি শক্তিধর দেশ ইরান তাদের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি শক্তির ভাণ্ডারকে আরও বেশি সমৃদ্ধ করার এক বিশাল সাফল্যের ঘোষণা দিয়েছে। বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল এবং পশ্চিমা বিভিন্ন পরাশক্তির প্রবল চাপ সত্ত্বেও দেশটির খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের কার্যক্রম যে এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকেনি, এই নতুন আবিষ্কারটি তারই এক উজ্জ্বল ও শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় ভূখণ্ডের অন্তর্গত ঐতিহাসিক ফারস প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা ও ড্রিলিং কার্যক্রমের ফলশ্রুতিতে একটি বিশাল নতুন প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। দেশের জ্বালানি খাতের এই অভূতপূর্ব অর্জন এমন এক সময়ে সামনে এসেছে যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তেহরানের ওপর নানা ধরনের কৌশলগত চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে, যা দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও স্বনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাজ্যে ইরানের সাইবার হামলা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার নিয়ে নতুন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা
ইরানের সরকারি জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এই নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দেশটির সম্মানিত পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী মোহসেন পাকনেজাদ এক গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক বিবৃতির মাধ্যমে এই বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদের খনির বিস্তারিত তথ্য দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছেন। মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণাঞ্চলীয় ফারস প্রদেশের নির্দিষ্ট ভূগর্ভস্থ ভূস্তরে আবিষ্কৃত হওয়া এই নতুন গ্যাসক্ষেত্রটিতে প্রায় সাত দশমিক পাঁচ ট্রিলিয়ন বা আনুমানিক সাত লাখ পঞ্চাশ হাজার কোটি ঘনফুট বিশাল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত রয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ও নিখুঁত পরিমাপের মাধ্যমে ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা হিসাব করে দেখেছেন যে, এই বিপুল পরিমাণ মোট মজুতকৃত গ্যাসের মধ্য থেকে অন্তত পাঁচ দশমিক সাত ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরাসরি অত্যন্ত সফল উপায়ে অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনযোগ্য বা রিমেভেবল অবস্থায় রয়েছে।
এই নতুন গ্যাসক্ষেত্রের বিশেষ প্রযুক্তিগত ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব তুলে ধরে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী মোহসেন পাকনেজাদ আরও জানিয়েছেন যে, এই খনি থেকে উত্তোলিত সম্পদ অত্যন্ত উচ্চমানের 'সুইট গ্যাস' বা পরিশোধিত প্রকৃতির। এই ধরনের গ্যাসের মধ্যে হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো ক্ষতিকর ও জটিল উপাদানের পরিমাণ অত্যন্ত কম থাকে, যার ফলে এর প্রক্রিয়াকরণ, পরিশোধন এবং সামগ্রিক পরিচালন বা উৎপাদন ব্যয় প্রচলিত অন্যান্য গ্যাসক্ষেত্রের তুলনায় বেশ কম হবে। কম খরচে এবং কম সময়ে উচ্চমানের জ্বালানি আহরণ করার এই বিশেষ সুবিধাটি ইরানের রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমাবে এবং তেল-গ্যাস খাতের সামগ্রিক লাভজনকতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলবে। এছাড়া এই নতুন গ্যাসক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস কনডেনসেটের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় উপস্থিতির কথা নিশ্চিত করা হয়েছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্পায়ন এবং পেট্রোকেমিক্যাল খাতের কাঁচামালের চাহিদা পূরণে অত্যন্ত জাদুকরী ভূমিকা পালন করবে।
আরও পড়ুন: নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ১৭ কেজি গাঁজাসহ তিন মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, ফারস প্রদেশের এই বিশাল গ্যাসক্ষেত্রের আবিষ্কার কেবল একটি সাধারণ ভূতাত্ত্বিক সাফল্য নয়, বরং এটি ইরানের জাতীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে কয়েক হাজার কোটি মার্কিন ডলারের বেশি নতুন রাজস্ব যোগ করতে সক্ষম হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নানামুখী নিষেধাজ্ঞার কারণে যখন ইরানের তেল ও গ্যাস রপ্তানি খাত বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এই অভ্যন্তরীণ বিশাল জ্বালানি মজুতের সন্ধান দেশের অর্থনীতিকে নতুন প্রাণশক্তি জোগাবে। দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্প কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই আবিষ্কার এক প্রকার আশীর্বাদস্বরূপ কাজ করবে। ইরানের সাধারণ মানুষ এবং নীতিনির্ধারকরা এই সাফল্যে অত্যন্ত আনন্দিত, কারণ এটি প্রমাণ করে যে সমস্ত প্রতিকূলতা ও বৈদেশিক চাপকে পেছনে ফেলে দেশটি নিজেদের স্বনির্ভরতার পথে অত্যন্ত দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে চলমান তীব্র উত্তেজনার আবহে ইরানের এই নতুন জ্বালানি সম্পদ আবিষ্কার আন্তর্জাতিক কূটনৈমিতিক মহলেও গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে যখন সামরিক ও রাজনৈতিক সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে, ঠিক অন্যদিকে তেহরানের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধনের এমন ঘোষণা শত্রুপক্ষকে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেশটির অগ্রযাত্রা থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী মোহসেন পাকনেজাদ সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী, ভূতত্ত্ববিদ এবং গবেষকদের নিরলস পরিশ্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন যাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এই দুর্গম এলাকা থেকে এই ভূগর্ভস্থ সম্পদের সন্ধান পাওয়া সম্ভব হয়েছে। খুব দ্রুতই এই নতুন গ্যাসক্ষেত্রটি থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গ্যাস উত্তোলন এবং তা জাতীয় পাইপলাইন নেটওয়ার্কে যুক্ত করার কাজ শুরু হবে বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চরম বৈরিতা ও উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের ফারস প্রদেশে বিশাল এই নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্রায় সাড়ে সাত ট্রিলিয়ন ঘনফুটের এই গ্যাসভাণ্ডার এবং এর সহজলভ্য পরিশোধন প্রক্রিয়া ইরানের জ্বালানি নিরাপত্তাকে যেমন বহুলাংশে সুরক্ষিত করবে, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের রাজনীতিতে এই আবিষ্কার তেহরানের অবস্থানকে আরও অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষকরা। আমরা আশা করি এই প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ও পরিকল্পিত ব্যবহারের মাধ্যমে ইরানের সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে এবং দেশটির অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ আরও বেশি প্রদীপ্ত হয়ে উঠবে।
প্রতিবেদনের সূত্র: ইরানি পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বার্তা সংস্থা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।