প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান বিভাগীয় শহর খুলনার শান্ত ও স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে বিঘ্নিত করার উদ্দেশ্যে সক্রিয় থাকা অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান প্রতিনিয়ত পরিচালিত হয়ে আসছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সমাজের প্রতিটি কোণ থেকে খুন, সন্ত্রাস, মাদক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের শেকড় উপড়ে ফেলার লক্ষে পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাব অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে চলেছে। সম্প্রতি খুলনা মহানগরীর লবণচরা থানা এলাকা সংলগ্ন জনপদে ঘটে যাওয়া একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক ডাবল মার্ডারের ঘটনা পুরো দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। অত্যন্ত অল্প সময়ের ব্যবধানে সংঘটিত ওই জোড়া খুনের ঘটনার পর থেকে গা ঢাকা দেওয়া পলাতক অপরাধীদের খুঁজে বের করার জন্য গোয়েন্দা নজরদারি তীব্র করা হয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুই আসামিকে দেশের অন্য একটি জেলা থেকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে এলিট ফোর্স র্যাব-৬ এর সদস্যরা।
আরও পড়ুন: ফরিদপুরের সালথায় বিশ লিটার দেশি মদসহ এক যুবক গ্রেপ্তার
ঘটনার বিস্তৃত বিবরণ এবং র্যাব-৬ এর দাপ্তরিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত রোববার গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া থানা এলাকার অন্তর্গত বর্ণি দক্ষিণপাড়া নামক একটি নির্দিষ্ট স্থানে অত্যন্ত সফল ও গোপনীয় একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। র্যাব-৬ এর স্পেশাল কোম্পানির একটি চৌকস ও অভিজ্ঞ আভিযানিক দল সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য এবং প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে ওই এলাকায় অবস্থান নেয় এবং পলায়নপর আসামিদের অবস্থান নিশ্চিত করে তাদের ঘিরে ফেলে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সফল অভিযানে লবণচরার আলোচিত ডাবল মার্ডার মামলার এজাহারনামীয় দুই পলাতক আসামিকে হাতেনাতে পাকড়াও করা সম্ভব হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত এই দুই আসামির পরিচয় সম্পর্কে র্যাবের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, তাদের মধ্যে একজনের নাম মোড়ল মো. ফারুক, যার বয়স একুশ বছর এবং তার পিতার নাম নজরুল মোল্লা; অন্যজন হলেন মাসুদুল ইসলাম কদর, যার বয়স আঠারো বছর এবং তাঁর পিতার নাম আবু হোসেন বাবু। অপরাধ জগতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই দুই তরুণকে গোপালগঞ্জের দূরবর্তী গ্রাম থেকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের দীর্ঘদিনের পলাতক থাকার চক্রান্ত সফল হতে দেয়নি।
র্যাব জানিয়েছে যে, নিয়মিত মামলার তালিকাভুক্ত আসামি, বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত ও ওয়ারেন্টভুক্ত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করার পাশাপাশি অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, কুখ্যাত মাদক কারবারি এবং চাঞ্চল্যকর হত্যা কিংবা ধর্ষণ মামলার মতো গুরুতর অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য তারা সবসময় তৎপর রয়েছে। এরই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে খুলনার লবণচরা থানায় দায়েরকৃত চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের ঘটনার রহস্য উন্মোচন এবং জড়িতদের একে একে পাকড়াও করার জন্য এই বিশেষ অভিযানটি পরিচালিত হয়েছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত ফারুক ও কদর এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজেদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার বিষয়ে বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেছে বলে জানা গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরপরই তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত থেকে বাঁচার জন্য অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে খুলনা ছেড়ে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার ওই নির্জন এলাকায় আত্মগোপন করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের কারণে তারা পার পেয়ে যেতে পারেনি।
আরও পড়ুন: কুড়িগ্রামে সারের ডিলারের গোডাউন ভেঙে কৃষকদের বস্তা নিয়ে যাওয়ার ঘটনা
খুলনার লবণচরা এলাকায় সংঘটিত এই ডাবল মার্ডারের পেছনের পটভূমি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ছিল, যা কিছুদিন আগে পুরো অঞ্চলের মানুষকে শোকে ও আতঙ্কে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। গত ১৯ আগস্ট বুধবারের সেই নির্ধারিত দিনে মাত্র তিন ঘণ্টার স্বল্পতম ব্যবধানে পৃথক দুটি স্থানে অত্যন্ত নৃশংসভাবে দুই যুবককে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয় এবং কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই এলাকার অভ্যন্তরে পরপর সংঘটিত এই দুটি হত্যাকাণ্ডের ফলে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়েছিল, যা জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। ওই নির্দিষ্ট দিনটির সন্ধ্যার ঠিক প্রাক্কালে দুর্বৃত্তদের অতর্কিত গুলিবর্ষণের শিকার হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছিলেন বাইশ বছর বয়সী যুবক মঞ্জুরুল ইসলাম। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই একই দিন রাত পৌনে দশটার দিকে শিশুবাগান আশিবিঘা নামক অন্য একটি এলাকায় নাজমুল নামের উনিশ বছর বয়সী আরও এক যুবককে একইভাবে অত্যন্ত নির্মমভাবে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়, যা এই ডাবল মার্ডারকে আরও বেশি রহস্যজনক করে তোলে।
পরপর সংঘটিত এই জোড়া খুনের ঘটনার পর থেকে লবণচরা থানা এলাকা এবং তার আশপাশে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল এবং স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে বিভিন্ন মহলে সোচ্চার হয়েছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পরপরই খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে অপরাধীদের গ্রেফতারে মাঠে নামে এবং বিভিন্ন স্থানে চিরুনি অভিযান পরিচালনা শুরু করে। পরবর্তীতে দীর্ঘ তদন্ত ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় র্যাব নিশ্চিত হয় যে, সম্প্রতি গোপালগঞ্জে গ্রেপ্তারকৃত ফারুক ও কদর সরাসরি মঞ্জুরুল ইসলাম হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি এবং তাদের বিরুদ্ধে লবণচরা থানায় সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলা রুজু রয়েছে। জোড়া খুনের এই জোড়া ঘটনার একটি মামলার আসামিরা ধরা পড়ায় মামলার তদন্ত কার্যক্রমে এখন অনেক বড় ধরনের অগ্রগতি সাধিত হবে বলে আশা করছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
র্যাব-৬ এর পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমকে আরও জানানো হয়েছে যে, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া থেকে গ্রেপ্তারকৃত এই দুই আসামির বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন করার জন্য তাদের অবিলম্বে লবণচরা থানায় হস্তান্তর করা হবে। লবণচরা থানা পুলিশ এই আসামিদের আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এই জোড়া খুনের নেপথ্যে থাকা মূল কারণ, অন্যান্য সহযোগীদের পরিচয় এবং অস্ত্র সরবরাহের উৎস সম্পর্কে আরও অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে চাঞ্চল্যকর এই ডাবল মার্ডারের ঘটনায় জড়িত অন্যান্য পলাতক আসামিদেরও খুব শীঘ্রই আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানোর জন্য র্যাবের পক্ষ থেকে গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে। অপরাধী যতই চতুর হোক না কেন, আইনের হাত থেকে কেউ রেহাই পাবে না—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই দৃঢ় অঙ্গীকার খুলনার সাধারণ মানুষের মনে পুনরায় আশার আলো সঞ্চারিত করেছে।
পরিশেষে বলা যায় যে, খুলনার লবণচরায় চাঞ্চল্যকর ডাবল মার্ডার মামলার দুই আসামি কদর ও ফারুককে গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তারের ঘটনাটি অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় সাফল্য। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের জন্য এ ধরনের সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি। আমরা আশা করি দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ডাবল মার্ডার মামলার বাকি পলাতক আসামিরাও গ্রেপ্তার হবে এবং আদালতের মাধ্যমে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের জঘন্য অপরাধ করার সাহস না পায়। খুলনার মাটি থেকে সমস্ত সন্ত্রাসী কার্যক্রম চিরতরে নির্মূল হয়ে যাক এবং একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে উঠুক—এটাই এখন সমগ্র দেশবাসীর একান্ত কামনা।
প্রতিবেদনের সূত্র: র্যাব-৬ মিডিয়া সেল ও লবণচরা থানা পুলিশ প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।