চট্টগ্রামে ৫৫তম ঐতিহাসিক জশনে জুলুস ও লাখো মানুষের ঢল

চট্টগ্রামে ৫৫তম ঐতিহাসিক জশনে জুলুস ও লাখো মানুষের ঢল
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বাংলাদেশের বন্দরনগরী হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম নগরীতে প্রতিবছর অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য, উৎসাহ এবং ব্যাপক উৎসবমুখর পরিবেশে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে এক বিশাল ধর্মীয় শোভাযাত্রা বা জশনে জুলুস অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই পৃথিবীতে শুভাগমনের পবিত্র স্মৃতিকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করার জন্য আয়োজিত এই ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানটি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে। প্রতিবারের ন্যায় এবারও চট্টগ্রাম অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ গভীর ভালোবাসা ও আকুতির সঙ্গে এই ঐতিহাসিক দিবসটি উদযাপনের উদ্দেশ্যে রাজপথে নেমে এসেছেন এবং এক অভূতপূর্ব আধ্যাত্মিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। সুদীর্ঘ পঞ্জিকার পাতা উল্টে এ বছর এই জুলুসটি তার গৌরবময় পঞ্চান্নতম বা ৫৫তম বর্ষে পদার্পণ করেছে, যা এই অনুষ্ঠানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং ধারাবাহিকতাকে আরও বেশি সমৃদ্ধ করেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার নবীপ্রেমিক মানুষ এই দিনটিতে চট্টগ্রামে এসে সমবেত হন এবং মহানবীর প্রতি নিজেদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেন।

আরও পড়ুন: পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দেশজুড়ে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দঘন পরিবেশ

ঘোষিত কর্মসূচি এবং স্থানীয় আয়োজকদের ব্যবস্থাপনার বিস্তারিত বিবরণ অনুযায়ী, পবিত্র এই জশনে জুলুসটি আজ বুধবার সকালের দিকে নির্ধারিত সময়ে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। দিনটির সকাল প্রায় সাড়ে নয়টার দিকে চট্টগ্রাম নগরীর ষোলশহর এলাকার ঐতিহ্যবাহী জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসা সংলগ্ন বিখ্যাত আলমগীর খানকা-এ কাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া প্রাঙ্গণ থেকে এই বর্ণাঢ্য মিছিলের সূচনা হয়। ঐতিহাসিক এই জুলুসের নেতৃত্ব প্রদানের পবিত্র দায়িত্ব পালন করেছেন প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব দরবারে সিরিকোটের সম্মানিত সাজ্জাদানশীন পীর আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ, যাঁর উপস্থিতিতে পুরো পরিবেশ ধন্য হয়ে ওঠে। তাঁর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত বিশিষ্ট আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ এবং লাখো সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ অত্যন্ত বিনম্র হৃদয়ে দরুদ ও সালাম পাঠ করতে করতে এই মিছিলে পদব্রজে অংশ নেন। শুরুর মুহূর্ত থেকেই চারপাশের পুরো আকাশ-বাতাস নবীপ্রেমিকদের কণ্ঠে উচ্চারিত পবিত্র স্লোগান এবং ইয়া নবী সালাম আলাইকা ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে, যা উপস্থিত সকলের মনে এক গভীর আনন্দের সৃষ্টি করে।

নির্ধারিত রুট ও পরিকল্পনা অনুযায়ী চলমান এই বিশাল জুলুসটি নগরীর বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সড়ক প্রদক্ষিণ করে নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কর্মসূচি রয়েছে। সূচি অনুযায়ী এই শোভাযাত্রাটি মুরাদপুর এলাকা অতিক্রম করে ক্রমান্বয়ে দুই নম্বর গেট, জিইসি মোড়, ওয়াসা মোড়, দামপাড়া এবং লালখান বাজার হয়ে টাইগারপাস সংলগ্ন এলাকা প্রদক্ষিণ করবে। দীর্ঘ এই পথ পরিক্রমার সময় রাস্তার দুই পাশের বহুতল ভবন, দোকানপাট ও ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ফুল ছিটিয়ে এবং বিভিন্নভাবে এই জুলুসকে স্বাগত জানান ও সম্মান প্রদর্শন করেন। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে এই দীর্ঘ মিছিলে অংশগ্রহণকারী লাখো মানুষের মাঝে সুপেয় পানি, শরবত এবং হালকা খাবার বিতরণের মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যা পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছে। সুশৃঙ্খল এই শোভাযাত্রাটি নির্ধারিত বিভিন্ন পয়েন্ট প্রদক্ষিণ শেষ করে পুনরায় মূল আয়োজক প্রতিষ্ঠান জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসা মাঠে গিয়ে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

আরও পড়ুন: বাউফলের বগা ইউনিয়নে মাদকবিরোধী অভিযানে শ্রমিক দলের নেতা গ্রেপ্তার

মাদরাসা মাঠে পৌঁছানোর পর এই ঐতিহাসিক আয়োজনের অংশ হিসেবে একটি বিশাল ইসলামী মহাতিফ, পবিত্র জোহরের নামাজ আদায় এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। এই জমায়েতে অংশ নেওয়া লাখো মানুষের সুশৃঙ্খল উপস্থিতি এবং ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি তাদের অগাধ নিষ্ঠা পুরো দেশের মানুষের নজর কেড়েছে এবং গণমাধ্যমে এটি বিশেষভাবে প্রচারিত হচ্ছে। আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে এবারের এই ৫৫তম জুলুসে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষের উপস্থিতির কারণে এটি একটি জনসমুদ্রে রূপ নিয়েছে এবং লাখো মানুষের মহাসমাবেশ ঘটেছে। এই বিশাল আয়োজনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। পুলিশের পাশাপাশি আয়োজক কমিটির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রায় দশ হাজার প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার রক্ষার কাজে সক্রিয়ভাবে নিয়োজিত রয়েছেন।

চট্টগ্রামের এই ঐতিহ্যবাহী জশনে জুলুসের নিরাপত্তা ও সুব্যবস্থাপনার জন্য স্থানীয় প্রশাসন এবং ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যাতে সাধারণ মানুষের চলাচলে কোনো ধরনের বড় দুর্ভোগের সৃষ্টি না হয়। পবিত্র এই দিনটির তাৎপর্য তুলে ধরে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন নানান ধরনের সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। মহানবীর আদর্শকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করার মধ্য দিয়ে একটি সুন্দর, বৈষম্যহীন এবং শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠার ওপর বক্তারা বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বারোপ করে আসছেন। প্রতিবছরের মতো এবারও এই বিশাল জনস্রোত প্রমাণ করেছে যে এ দেশের মানুষের হৃদয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রতি ভালোবাসা কতখানি গভীর ও অবিচল রয়েছে।

পরিশেষে বলা যায় যে, চট্টগ্রামে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হওয়া এই ৫৫তম ঐতিহাসিক জশনে জুলুস সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি অত্যন্ত আনন্দের ও গৌরবের বিষয়। লাখো মানুষের এই শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল জমায়েত ইসলামের প্রকৃত শান্তি, সাম্য ও মানবতার বার্তা বিশ্ববাসীর সামনে সফলভাবে তুলে ধরেছে। আমরা মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি যেন এই পবিত্র আয়োজনের বরকতে আমাদের দেশ ও জাতি সব ধরনের বালা-মুসিবত থেকে রক্ষা পায় এবং শান্তি বজায় থাকে। সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় আগামী দিনেও এই ঐতিহাসিক ঐতিহ্য আরও বেশি মহিমান্বিত হয়ে উঠবে—এটাই আজকের এই দিনে দেশবাসীর প্রধান প্রত্যাশা।

প্রতিবেদনের সূত্র: আয়োজক কমিটি ও স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন