পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দেশজুড়ে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দঘন পরিবেশ

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দেশজুড়ে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দঘন পরিবেশ
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক হিসেবে এই পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছিলেন শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যাঁর শুভাগমন বিশ্ববাসীর জন্য ছিল এক অপার রহমত। রবিউল আউয়াল মাসের এই পবিত্র ও মহিমান্বিত দিনটি মুসলিম উম্মাহর কাছে ঈদে মিলাদুন্নবী হিসেবে অত্যন্ত পবিত্র ও আনন্দের দিন হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে। সৃষ্টির সেরা মহামানবের দুনিয়াতে আগমন এবং এই ধরণী থেকে তাঁর তিরোধানের স্মৃতিবিজড়িত এই দিনটিতে বিশ্বজুড়ে মুসলিম সম্প্রদায় বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকেন। শান্তি, ন্যায়বিচার, সাম্য এবং মানবতার এক অবিস্মরণীয় বার্তা নিয়ে তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন, যা যুগে যুগে অন্ধকার সমাজকে আলোর পথ দেখিয়েছে। বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ অন্যান্য মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য, উৎসাহ এবং উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে এই পবিত্র দিনটি পালন করে থাকেন। সরকার ও বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে দিনটিকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নানা ধরনের ইসলামিক কর্মসূচি, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।

আরও পড়ুন: হাইওয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে এসপি মোহাম্মদ শাহিনুর আলমের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত

পবিত্র এই মহান দিনটির প্রাক্কালে দেশের বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ ইবাদত-বন্দেগী এবং মিলাদ মাহফিলের ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছিল। দিনটির সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই দেশের প্রতিটি অঞ্চলে জাতীয় পতাকা এবং কালিমা তাইয়্যেবা খচিত বিশেষ পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে দিবসের কর্মসূচির শুভ সূচনা করা হয়। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ভবনে আলোকসজ্জা এবং ধর্মীয় বাণী সংবলিত ব্যানার ও ফেস্টুন টানিয়ে পুরো পরিবেশকে এক উৎসবমুখর রূপ দেওয়া হয়। রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদসহ দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলার কেন্দ্রীয় মসজিদগুলোতে পবিত্র কোরআনখানি এবং হামদ-নাত প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা দলবদ্ধভাবে মসজিদে উপস্থিত হয়ে মহান রবের দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন এবং বিশ্ববাসীর শান্তি ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন। বিভিন্ন এতিমখানা ও দরিদ্র জনগণের মাঝে খাবার বিতরণ এবং বিশেষ কল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমে দিনটির প্রকৃত তাৎপর্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।

দিনব্যাপী আয়োজিত বিভিন্ন আলোচনা সভায় ইসলাম ধর্মের মূল শিক্ষা, মহানবীর অনুপম চরিত্র মাধুরী এবং তাঁর বিদায় হজের ভাষণের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। ইসলামিক স্কলার ও প্রথিতযশা আলেমে দ্বীনগণ তাদের মূল্যবান বয়ানে উল্লেখ করেন যে, রাসূলের সুন্নাহ বা আদর্শ অনুসরণ করাই একজন প্রকৃত মুমিনের জীবনের একমাত্র পথ। বর্তমান সময়ে সমাজে সৃষ্ট হানাহানি, অশান্তি এবং নৈতিক অবক্ষয় দূর করার জন্য মহানবীর আদর্শের কোনো বিকল্প নেই বলে বক্তারা জোরালোভাবে অভিমত প্রকাশ করেন। যুবসমাজকে ইসলাম ধর্মের প্রকৃত ও শান্তির বাণী ধারণ করে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ এবং সব ধরনের অন্যায় থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা আরও বলেন যে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর পুরো জীবনজুড়ে মানবকল্যাণ, নারী অধিকার রক্ষা, প্রতিবেশীর হক আদায় এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠার যে অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা আজও বিশ্ববাসীর জন্য অনুসরণীয়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করার যে শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন, তা বর্তমান অশান্ত বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

আরও পড়ুন: প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতের সঙ্গে জাইকা প্রতিনিধিদলের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়

রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় শহরে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে জশনে জুলুস বা আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়, যা এই দিনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে পরিচিত। লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষ সুদৃশ্য ব্যানার, প্ল্যাকার্ড এবং নানা রঙের ফেস্টুন হাতে নিয়ে রাজপথে এই আনন্দ মিছিলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। মিছিলে অংশ নেওয়া মানুষের কণ্ঠে দরুদ ও সালামের ধ্বনিতে পুরো আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে এবং এক অভূতপূর্ব আধ্যাত্মিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে এই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাগুলো নির্ধারিত রুট প্রদক্ষিণ করে নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে সমাপ্ত হয়। দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল এবং রেডিও স্টেশনগুলোতে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা, সিরাত বিষয়ক আলোচনা এবং হামদ-নাত সম্প্রচার করা হয়। জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোও এই বিশেষ দিনটির তাৎপর্য তুলে ধরে নানা ধরনের সুলিখিত নিবন্ধ ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে, যা সাধারণ পাঠকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে।

পবিত্র এই দিনটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মানুষের আত্মশুদ্ধি এবং নৈতিক চরিত্র গঠনের এক বড় উপলক্ষ হিসেবে কাজ করে। মহানবীর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় মানবজাতির জন্য এক আদর্শ জীবনবিধান, যা অনুসরণ করার মাধ্যমে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন সুন্দর করা সম্ভব। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে প্রকৃত ইমানদারের পরিচয় দিতে হয়, যা নবীজির জীবন থেকে পাওয়া অন্যতম বড় একটি শিক্ষা। আজকের এই পবিত্র দিনে দেশের শান্তি, অগ্রগতি এবং সমৃদ্ধির পাশাপাশি ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের নির্যাতিত মুসলিম উম্মাহর মুক্তি কামনায় বিশেষ দোয়া করা হয়। দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে এই মহান দিনটি উদযাপন করায় জাতীয় ঐক্যের এক চমৎকার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

পরিশেষে বলা যায় যে, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দেশজুড়ে পালিত বিভিন্ন কর্মসূচি ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য আমাদের মনে নতুন করে ঈমানি শক্তি জুগিয়েছে। মহানবীর সুমহান আদর্শ ও সুন্নাহ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত হলেই কেবল একটি বৈষম্যহীন, সুন্দর ও শান্তিময় সমাজ গঠন করা সম্ভব। আমরা মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি যেন আমাদের সবার জীবন নবীজির আদর্শে রাঙিয়ে ওঠে এবং দেশ ও জাতি উপকৃত হয়। বিশ্বমানবতার কল্যাণে মহানবীর দেখানো পথই হোক আমাদের আগামীর চলার একমাত্র পাথেয়—এটাই আজকের দিনে আমাদের সকলের অন্তরের গভীরতম কামনা।

প্রতিবেদনের সূত্র: ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন