প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
পটুয়াখালী জেলার দশমিনা উপজেলায় বস্তুগত বিলাসিতা ও আধুনিক স্মার্টফোনের মোহে পড়ে নিজের দেড় বছর বয়সী রক্তজাগা শিশু সন্তানকে অর্থের বিনিময়ে অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার এক অতি শকিং ও হৃদয়বিদারক ঘটনার উন্মোচন হয়েছে। মূল্যবান আইফোন ক্রয়ের অনৈতিক ইচ্ছা পূরণ করতে নিজের কোলের ফুটফুটে শিশুপুত্রকে এক লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়ার মারাত্মক অভিযোগে মো. মারুফ মুন্সি নামের এক পাষণ্ড পিতাকে আটক করেছে থানা পুলিশ। একই সাথে চরম চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সুদৃঢ় ও তড়িৎ পদক্ষেপের মাধ্যমে বিক্রি হয়ে যাওয়া শিশুটিকে উদ্ধার করে তার স্বজনদের নিকট নিরাপদে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বেতাগী-সানকিপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত বড় গোপালদী গ্রামের নিজ বসতবাড়ি থেকে তড়িৎ অভিযানের মাধ্যমে অভিযুক্ত মারুফ মুন্সিকে গ্রেফতার করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সমগ্র উপজেলা জুড়ে তীব্র নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
আরও পড়ুন: রায়গঞ্জের নিমগাছি বাজারে অগ্নিকাণ্ডে ৭ দোকান ছাই, ক্ষতি ১০ লাখ
ঘটনার বিস্তৃত বিবরণ ও পরিবারের নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায় যে, গত শনিবার সকাল আনুমানিক আটটার দিকে অভিযুক্ত মারুফ মুন্সি অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তার নিজ মাতা তথা শিশুটির দাদি মাহমুদা বেগমকে ডেকে দেড় বছর বয়সের ছোট ছেলে মুসাকে সুন্দর জামাকাপড় পরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। এ সময় তিনি স্বজনদের নিকট প্রকাশ করেন যে, সন্তানকে সাথে নিয়ে স্থানীয় বাজারে একটু হেঁটে আসবেন। মায়ের সরল বিশ্বাসে শিশুটিকে পরিপাটি পোশাক পরিয়ে বাবার হাতে তুলে দেওয়ার পর মারুফ সন্তানকে সাথে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যান। তবে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও যখন বাবা ও ছেলে কারোরই ঘরে ফেরার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না, তখন পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা চরম উদ্বেগ ও আশঙ্কার মধ্যে পড়ে অনুসন্ধান চালাতে শুরু করেন। আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজাখুজি করেও তাদের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় পরিবারে গভীর ব্যাকুলতা তৈরি হয়।
পরবর্তীতে কোনো উপায় না পেয়ে মারুফের আপন মামা বাহাদুর মিয়ার মাধ্যমে তার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা হলে প্রকাশিত হয় এক ভীতিকর বাস্তবতা। মারুফ তার মামার নিকট নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন যে, তিনি তার কোলের নিষ্পাপ ছেলে মুসাকে পটুয়াখালীর পার্শ্ববর্তী আলীপুর ইউনিয়নের রামনাথসেন গ্রামের বাসিন্দা ইমরান হোসেন নামের এক ব্যক্তির কাছে নগদ এক লাখ টাকার বিনিময়ে সম্পূর্ণরূপে বিক্রি করে দিয়েছেন। কেবল সন্তান বিক্রির অপরাধেই ক্ষান্ত না হয়ে সে উক্ত অনৈতিক উপায়ের অর্থ পকেটে পুরে দ্রুততম সময়ে রাজধানী ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ঢাকায় গিয়ে নিজের পুরাতন ও সাধারণ মোবাইল সেটটি বদলে ফেলে সন্তান বিক্রির টাকায় একটি ব্র্যান্ডের দামি আইফোন কেনেন তিনি। এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার পর পরিবারের স্বজনরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং দ্রুত স্থানীয় থানা পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করা হয়।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নেওয়ার সংকল্প
পটুয়াখালীর দশমিনা থানা পুলিশ সূত্রে প্রকাশ, সন্তানকে বিক্রি করে ঢাকায় আত্মগোপনে থাকা অভিযুক্ত মারুফ মুন্সি সম্প্রতি ঢাকা থেকে নিজ গ্রাম বড় গোপালদীতে ফিরে এসেছেন—এমন এক গোপন তথ্য পুলিশের কাছে পৌঁছায়। এই তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের পর রোববার সন্ধ্যায় দশমিনা থানা পুলিশের একটি চৌকস দল মারুফের বসতবাড়িতে আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর সুযোগ না দিয়ে তাকে আটক করা হয় এবং পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসা হয়। থানা হাজতে তদারকি ও প্রথম পর্যায়ের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে মারুফ অবশেষে পুলিশের কাছে স্বীকার করেন যে তিনি নিজের ইচ্ছা পূরণে নিজ সন্তানকে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করেছিলেন।
আটক অভিযুক্ত মারুফ মুন্সির প্রদত্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দশমিনা থানা পুলিশ কালবিলম্ব না করে শিশুটির ক্রেতা ইমরান হোসেনকে শনাক্ত করে এবং তাকে সরাসরি থানায় ডেকে এনে দ্রুততার সাথে শিশুটিকে উদ্ধার করে ফেরত দেওয়ার কঠোর প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করে। প্রশাসনিক চাপ ও আইনি প্রক্রিয়ার মুখে ইমরান স্বীকার করেন যে, কেনা শিশুটিকে নিরাপদে রাখার উদ্দেশ্যে তিনি তার শ্বশুর মাহাবুব গাজীর বাড়ি অর্থাৎ পার্শ্ববর্তী গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস ইউনিয়নে পাঠিয়ে দিয়েছেন। পরবর্তীতে পুলিশের নির্দেশে ইমরানের শ্বশুর মাহাবুব গাজী রাতেই শিশু মুসাকে নিয়ে সরাসরি দশমিনা থানায় উপস্থিত হন এবং আনুমানিক রাত দশটার দিকে তাকে থানা কর্তৃপক্ষের হাতে সোপর্দ করেন।
দশমিনা থানা পুলিশের কর্মকর্তা ও সার্বিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ জানান, পুরো উদ্ধার প্রক্রিয়া শেষে উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ তদারকিতে হস্তান্তরের কাজ সম্পন্ন করা হয়। দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসানের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে উদ্ধার হওয়া শিশুপুত্র মুসাকে তার অভিভাবক অর্থাৎ দাদা মফিজ মুন্সী এবং দাদি মাহফুজা বেগমের জিম্মায় আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হয়। সন্তানকে ফিরে পেয়ে আনন্দাশ্রুতে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করেন পরিবারের স্বজনরা। এ বিষয়ে দশমিনা থানা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আতিকুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, শিশুটিকে নিরাপদে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে এবং গ্রেফতারকৃত বাবা মারুফ মুন্সির বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া ও কঠোর তদারকি অব্যাহত রয়েছে।
সামান্য একটি মোবাইল ফোনের লোভে নিজের রক্তের সন্তানকে বিক্রি করে দেওয়ার মতো ঘটনা সামাজিকভাবে কতটা মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে এনেছে, তা নিয়ে সচেতন মহল সরব হয়েছেন। স্থানীয় অধিবাসীরা অভিযুক্ত মারুফ মুন্সির দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার দুঃসাহস না দেখায়।
সূত্র: দশমিনা থানা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।