পটুয়াখালীতে ফজরের নামাজে সেজদারত অবস্থায় ইন্তেকাল করলেন হাফেজ ইমাম আতাউল্লাহ

পটুয়াখালীতে ফজরের নামাজে সেজদারত অবস্থায় ইন্তেকাল করলেন হাফেজ ইমাম আতাউল্লাহ
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

পবিত্র ইসলাম ধর্মের অনুসারী ও ধর্মপ্রাণ মুমিন মুসলমানদের নিকট পার্থিব জীবনের এই বিশাল কোলাহল ছাপিয়ে পরম শান্তিময় ও পরম প্রাপ্তির চূড়ান্ত মাকাম হলো মহান আল্লাহর দরবারে ইবাদত-বন্দেগি করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা। একজন মুমিনের জীবনে এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে যে, সে দুনিয়ার সমস্ত মায়া ত্যাগ করে সরাসরি তার স্রষ্টার সামনে সেজদায় অবনত থাকা অবস্থায় চিরবিদায় নেবে। বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলের নদীমাতৃক এবং ঐতিহ্যবাহী উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর একটি শান্ত ও স্নিগ্ধ জনপদে সম্প্রতি এমনই এক বিরল, পরম ঈর্ষণীয় ও আধ্যাত্মিক সুবাস ছড়ানো হৃদয়বিদারক অথচ অত্যন্ত সৌভাগ্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। পটুয়াখালী সদর উপজেলার অন্তর্গত একটি জনবহুল এলাকার স্থানীয় মসজিদে পবিত্র ফজরের সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাজ আদায়ের সময় একান্ত বিনম্র ও শ্রদ্ধাবনত অবস্থায় সেজদায় লুটিয়ে পড়ে চিরকালের মতো না ফেরার দেশে চলে গেছেন হাফেজ মুহাম্মদ আতাউল্লাহ নামক এক নিবেদিতপ্রাণ ও ধর্মভীরু ইমাম। মৃত্যুর এমন এক পবিত্র ও বরকতময় মুহূর্ত কেবল ওই এলাকার মানুষকেই নয়, বরং পুরো দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মনে গভীর আধ্যাত্মিক নাড়া দিয়েছে এবং পরকালের চিরন্তন সত্যকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

আরও পড়ুন: তারাপীঠের বেসরকারি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: ঘুমন্ত অবস্থায় মর্মান্তিক মৃত্যু ৭ জনের, আহত বহু

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যপঞ্জি থেকে জানা যায় যে, ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী আজকের দিনটি অর্থাৎ ১৭ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের সোমবারের ভোরের স্নিগ্ধ আলো ফোটার ঠিক আগ মুহূর্তে পটুয়াখালী সদর উপজেলার দূরবর্তী ও গ্রামীণ পরিবেশের মৌকরন ইউনিয়নের অধীনস্থ পরিচিত এলাকা শ্রীরামপুর বাজার জামে মসজিদে এই অলৌকিক ও বেদনাঘন ঘটনাটি সংঘটিত হয়। প্রতিদিনের মতো সেদিনও রাতের শেষ প্রহরে ঘুম থেকে জেগে উঠে মুমিন মুসলমানরা যখন ফজর ওয়াক্তের পবিত্র জামাতে শরিক হওয়ার জন্য অজু সম্পন্ন করে মসজিদে সমবেত হতে শুরু করেন, তখন যথারীতি সেই পবিত্র মসজিদের ইমামের দায়িত্বে থাকা হাফেজ আতাউল্লাহ জামাত শুরুর আগে নিজস্ব নিয়মে দুই রাকাত ফজরের সুন্নত নামাজ আদায় করছিলেন। মসজিদের সুশৃঙ্খল পরিবেশ এবং ভোরের গভীর নিস্তব্ধতার মাঝে যখন তিনি অত্যন্ত একাগ্রচিত্ত ও খুশু-খুজুর সাথে সুন্নতের দ্বিতীয় রাকাতের সেজদায় অবনত হন, ঠিক সেই মুহূর্তে মহান রবের অসীম কুদরতিতে তাঁর জীবনের পরম অন্তিম সময় নির্ধারিত হয়ে যায়। সেজদারত অবস্থায় তিনি দীর্ঘক্ষণ স্থবির হয়ে থাকায় পেছনের কাতার থেকে সালাত আদায়রত মুসল্লিদের মনে সামান্য সংশয়ের সৃষ্টি হয় এবং সালাম ফেরানোর পর তাঁরা কৌতূহল ও উদ্বেগের সাথে তাঁর নিকট এগিয়ে যান।

কাছে গিয়ে মুসল্লিরা অত্যন্ত মর্মান্তিক ও অভূতপূর্ব এই দৃশ্যের মুখোমুখি হন যে, হাফেজ আতাউল্লাহ তখনো ঠিক সেজদার ভঙ্গিতেই শান্তভাবে শুয়ে আছেন, কিন্তু তাঁর পবিত্র দেহ থেকে চিরকালের মতো প্রাণবায়ু উড়ে চলে গেছে। তিনি সেজদায় যাওয়ার পর আর মাথা তুলে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেননি, বরং সেজদারত পবিত্র অবস্থাতেই তাঁর রূহের প্রয়াণ ঘটেছে। মুহূর্তের মধ্যে মসজিদের ভেতরে থাকা অন্যান্য মুসল্লি ও আশপাশের গ্রাম থেকে ছুটে আসা মানুষের মাঝে কান্নার রোল পড়ে যায় এবং এক অদ্ভুত নীরবতা ও শোকের ছায়া নেমে আসে। মৃত্যুর এই অসাধারণ ও বরকতময় ধরনটি চাউর হওয়ার সাথে সাথেই শ্রীরামপুর বাজার এবং এর আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে শত শত মানুষ একনজর তাঁকে দেখার জন্য মসজিদে ভিড় জমাতে শুরু করেন। পবিত্র কোরআনের হাফেজ হয়ে আল্লাহর ঘরের পবিত্র মেহরাবে দাঁড়িয়ে কিংবা সেজদায় অবনত থেকে এমন শান্তিময় মৃত্যু লাভ করার কারণে উপস্থিত সকলে সমস্বরে উচ্চারণ করতে থাকেন যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদেরই এমন মর্যাদাপূর্ণ ও সৌভাগ্যময় ইন্তেকাল নসিব করে থাকেন।

পরলোকগত হাফেজ মুহাম্মদ আতাউল্লাহর পারিবারিক পরিচয় ও তাঁর কর্মজীবনের অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ইতিহাস পর্যালোচনা করলে জানা যায় যে, তিনি ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত এক বংশের সন্তান। মরহুম আতাউল্লাহর সম্মানিত পিতা হলেন পার্শ্ববর্তী দুমকী উপজেলার বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ও ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা আব্দুস সালাম এবং তিনি ছিলেন তাঁর পিতার একমাত্র স্নেহের পুত্র সন্তান। পারিবারিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত দ্বীনি ও সুশিক্ষায় বড় হয়ে ওঠা হাফেজ আতাউল্লাহ তাঁর কর্মজীবনের একটা দীর্ঘ সময় ও মেধা ইসলামের খিদমায় উৎসর্গ করেছিলেন। গত প্রায় দেড় বছর ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠা, সততা, punctuality এবং পরম আন্তরিকতার সাথে তিনি পটুয়াখালীর এই শ্রীরামপুর বাজার জামে মসজিদে ইমাম হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। দীর্ঘ এই দেড় বছরের সুদীর্ঘ সময়ে তাঁর অনুপম চারিত্রিক গুণাবলি, অত্যন্ত শান্ত স্বভাব, অমায়িক ও নম্র আচরণ এবং কোমল কণ্ঠের কোরআন তেলাওয়াত পুরো এলাকার মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছিল। এলাকার কোনো মানুষ তাঁর সাথে কস্মিনকালেও খারাপ আচরণ বা উচ্চস্বরে কথা বলার সুযোগ পাননি, যার কারণে তাঁর এই আকস্মিক ও চিরবিদায়ের সংবাদে গোটা এলাকায় গভীর শোকের মাতম শুরু হয়েছে।

আরও পড়ুন: পাবনার ফরিদপুরে একই দিনে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের দুই দফা অনুষ্ঠান আয়োজন নিয়ে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে মরহুম হাফেজ মুহাম্মদ আতাউল্লাহ অত্যন্ত দায়িত্বশীল এক মানুষ ছিলেন এবং তিনি রেখে গেছেন তাঁর পরিবারের অসংখ্য অনুসারী ও স্বজনদের। তিনি দুনিয়াতে রেখে গেছেন তাঁর অত্যন্ত আদরের ও কচি দুটি অবুঝ সন্তান, যারা এখনো তাদের পিতার এই চিরবিদায়ের মর্মান্তিক আঘাত পুরোপুরি উপলব্ধি করার মতো বয়সেও পৌঁছাতে পারেনি। এছাড়া তাঁর শোকাহত স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন, মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্র এবং মসজিদের অসংখ্য মুমিল্লিম ও মুসল্লিরা তাঁর বিদায়ে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং সমাজসেবকদের সহযোগিতায় মরহুমের জানাজার নামাজ সম্পন্ন করার যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। শ্রীরামপুর বাজার সংলগ্ন ময়দানে কিংবা নির্ধারিত সামাজিক প্রাঙ্গণে তাঁর বিশাল জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর পারিবারিক কবরস্থানের শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশে তাঁকে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে দাফন সম্পন্ন করার যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে বলে পারিবারিক সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, পার্থিব এই ধূলিমলিন পৃথিবীতে মানুষ কত শত আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে জীবন কাটিয়ে দেয়, অথচ জীবন কতটা ঠুনকো এবং মৃত্যুর ফেরেশতা যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো অবস্থায় হাজির হতে পারে, তার এক প্রকৃষ্ট ও জীবন্ত দলিল হয়ে রইল হাফেজ মুহাম্মদ আতাউল্লাহর এই প্রয়াণ। মসজিদের মেহরাবে সেজদারত অবস্থায় রবের সামনে মাথা নত করা অবস্থায় পরপারে পাড়ি জমানোর এই ঘটনা প্রমাণ করে দেয় যে, যারা আমৃত্যু আল্লাহর ইবাদতে নিজেদের নিয়োজিত রাখেন, মালিক তাঁদের কতটুকুই না ভালোবাসেন। পটুয়াখালী জেলার মৌকরন ইউনিয়নের শ্রীরামপুর বাজার মসজিদের এই ইতিহাস এবং ইমাম সাহেবের এই সৌভাগ্যময় চলে যাওয়া যুগ যুগ ধরে এলাকার মানুষের মুখে মুখে স্মৃতির পাতায় অম্লান হয়ে থাকবে। আমরা পরম করুণাময় মহান আল্লাহর দরবারে বিনীত প্রার্থনা জানাই, তিনি যেন মরহুম হাফেজ মুহাম্মদ আতাউল্লাহর জীবনের সমস্ত ছোট-বড় নেক আমল কবুল করেন, তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সুউচ্চ মাকাম দান করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার ও একমাত্র পুত্র-কন্যাদের এই অসীম শোক সহ্য করার তৌফিক দান করেন।

সূত্র: স্থানীয় সংবাদাতা ও পারিবারিক প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন