প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান ও প্রাচীন জনপদ রংপুর মহানগরীর শান্ত ও সুপরিচিত একটি আবাসিক এলাকায় সংঘটিত অত্যন্ত মর্মান্তিক, রহস্যজনক এবং রোমহর্ষক এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা পুরো দেশবাসীকে গভীরভাবে নাড়া দিয়ে গেছে। সমাজের একটি সুশিক্ষিত ও ভদ্র পরিবারকে এভাবে নির্মূল করে দেওয়ার এই পৈশাচিক ঘটনাটি স্থানীয় সাধারণ মানুষের মনে গভীর শোকের পাশাপাশি এক চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি করেছে। গত শনিবার রাতের বেলা রংপুর নগরীর জনবহুল মাছুয়াপাড়া নামক এলাকার একটি বহুতল আবাসিক ভবনের ভেতর থেকে তালা ভেঙে পুলিশ অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতিতে একই পরিবারের চারজন সদস্যের নিথর ও ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ উদ্ধার করেছে। নিহত এই মানুষগুলোর শরীরে বিভিন্ন ধরনের আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে এবং মৃতদেহগুলো ইতিমধ্যে পচে গিয়ে বাতাস ভারী করে তুলেছে। দীর্ঘ সময় ধরে বাড়ির ভেতর কোনো সাড়াশব্দ না পাওয়া এবং তীব্র দুর্গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে প্রতিবেশীরা যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে খবর দেন, তখনই এই বীভৎস দৃশ্যটি জনসমক্ষে উন্মোচিত হয়, যা পুরো এলাকাবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
আরও পড়ুন: রায়গঞ্জে পরকীয়ার অভিযোগে দপ্তরিকে জরিমানা ও সালিশ
ঘটনার বিস্তৃত বিবরণে স্থানীয় এলাকাবাসী ও তদন্তসংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে যে, মাছুয়াপাড়ার ওই আবাসিক বাড়িটি বেশ কিছুদিন ধরে বাইরে থেকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল। আশপাশের বাসিন্দারা গত কয়েক দিন ধরে ওই বাড়িটির চারপাশ থেকে এক অদ্ভুত ও উৎকট দুর্গন্ধ ছড়াতে অনুভব করেন এবং বাড়ির ভেতর থেকে স্বাভাবিক জীবনের কোনো সাড়াশব্দ বা মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করতে না পেরে গভীরভাবে সন্দেহ করেন। দুর্গন্ধের মাত্রা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং কোনো উপায় না পেয়ে স্থানীয়রা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি দেশের জরুরি সেবা ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে অবিহিত করেন। সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, গোয়েন্দা দল এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগের বিশেষজ্ঞ সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছান। সবার উপস্থিতিতে দীর্ঘ সময় ধরে তালাবদ্ধ থাকা ওই বাড়ির মূল দরজার তালা ভেঙে পুলিশ যখন ভেতরে প্রবেশ করে, তখন তাদের সামনে যে বীভৎস দৃশ্য ভেসে ওঠে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। পুরো ভবনের ভেতরে এক অসহনীয় পচা গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল এবং ঘরের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল রহস্যের জাল।
পুলিশ ও তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে যে, ওই দুর্গন্ধময় বাড়ির দ্বিতীয় তলার বিভিন্ন কক্ষ এবং সিঁড়ির অত্যন্ত সংবেদনশীল স্থানগুলোতে পড়েছিল পরিবারের চার সদস্যের মৃতদেহ। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে প্রাণ হারানো মানুষের পরিচয় পরবর্তীতে নিশ্চিত করা হয়েছে, যা স্থানীয় সমাজে আরও বেশি শোকের ছায়া নেমে এনেছে। নিহত ব্যক্তিরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অত্যন্ত সম্মানিত ও অবসরপ্রাপ্ত সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তাঁর সহধর্মিণী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা, তাঁদের যুবতী কন্যা প্রার্থী চক্রবর্তী এবং পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্য ছোট্ট ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী। একটি পুরো পরিবারকে এভাবে পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে ফেলার এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটার পেছনের কারণ এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও, ঘটনার ধরন দেখে বিশেষজ্ঞরা একে একটি পরিকল্পিত ও ঠান্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড বলে প্রাথমিক ধারণা করছেন। বিশেষ করে বাড়ির সিঁড়িতে মা ও মেয়ের ক্ষতবিক্ষত ও নিথর দেহ যেভাবে পড়ে ছিল, সেই দৃশ্যটি এতটাই লোমহর্ষক ছিল যে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও স্বজনরাও তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিতে গিয়ে শিউরে উঠছেন এবং ভয় পাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা ডিএনসিসি প্রশাসকের
ঘটনাস্থল নিবিড়ভাবে পরিদর্শন করার পর সিআইডি এবং পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে এই ঘটনার পেছনে একাধিক ক্লু থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। সিআইডির পরিদর্শক আবু হাসান কবির এবং ইনচার্জ সুমিত চৌধুরীসহ অন্যান্য তদন্তকারীরা জানিয়েছেন যে, মরদেহগুলোর অবস্থা দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ঘটনাটি আজকের নয়, বরং মৃত্যুর ঘটনাটি অন্তত তিন থেকে চার দিন আগের হতে পারে। কয়েক দিন ধরে ঘরের ভেতরেই মরদেহগুলো পড়ে থাকায় সেগুলোতে ইতিমধ্যেই পচন ধরতে শুরু করেছে এবং তীব্র দুর্গন্ধের কারণে সেখানে বেশিক্ষণ অবস্থান করাও দুরূহ হয়ে পড়েছিল। তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে পরিকল্পিত ডাকাতি অথবা অন্য কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছে। বাড়ির বিভিন্ন আলমারি, শোকেস এবং মূল্যবান জিনিসপত্র রাখার ড্রয়ারগুলো সম্পূর্ণ খোলা ও ভাঙচুর করা অবস্থায় পাওয়া গেছে, যা থেকে মনে হতে পারে যে দুষ্কৃতকারীরা বাড়িটিতে প্রবেশ করে ব্যাপক তছনছ চালিয়েছে এবং মূল্যবান সম্পদ লুট করার চেষ্টা করেছে।
তবে তদন্তকারীরা আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছেন যে, কেবল ডাকাতি করার জন্যই কি চারজন মানুষকে এভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো পূর্বশত্রুতা বা ব্যক্তিগত রেষারেষি কাজ করেছিল, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়ে গেছে। ঘরের ভেতরের বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পাওয়া গেছে এবং বাড়ির বিভিন্ন স্থানে মানুষের ধস্তাধস্তির চিহ্ন ও আঘাতের স্পষ্ট দাগ রয়েছে। নিহতদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ভারী বস্তু বা ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে চিকিৎসকরা ধারণা করছেন। এছাড়া গলায় রশি বা গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাদের হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলেও তদন্তের প্রাথমিক তালিকায় বিবেচনা করা হচ্ছে। একটি জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষকের মতো একজন সজ্জন মানুষের পরিবারকে এভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার পেছনে কারা জড়িত থাকতে পারে, তা উদঘাটন করার জন্য পুলিশের একাধিক টিম এখন মাঠে নেমে কাজ করছে।
এই রোমহর্ষক সংবাদটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সমগ্র রংপুর শহর জুড়ে গভীর শোক এবং চরম আতঙ্কের এক কালো মেঘের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলের মতো একজন শান্ত স্বভাবের মানুষ ও তার পরিবারের এমন পরিণতি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তার সহকর্মী, সাবেক শিক্ষার্থী এবং প্রতিবেশীরা। বাড়ির সামনে ভিড় জমানো সাধারণ মানুষ অত্যন্ত ক্ষোভ ও উদ্বেগের সঙ্গে এই পৈশাচিক ঘটনার দ্রুত বিচার দাবি করেছেন। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, নিহত চারজনের মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য দ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের সম্পূর্ণ প্রতিবেদন হাতে আসার পরই মূলত মৃত্যুর আসল কারণ এবং সঠিক সময় সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে। এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন ধরনের আঙুলের ছাপ, ডিজিটাল আলামত এবং অন্যান্য বস্তুগত প্রমাণগুলো পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে, যা অপরাধীদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায় যে, রংপুরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলসহ একই পরিবারের চার সদস্যের এই রহস্যজনক ও নির্মম মৃত্যু সমগ্র জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে। সুরক্ষিত একটি আবাসিক বাড়ির ভেতর থেকে এভাবে একটি পরিবারের সবাইকে পচাগলা অবস্থায় উদ্ধার করার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির একটি বড় ইঙ্গিত বহন করে। অপরাধীদের যত দ্রুত সম্ভব আইনের আওতায় নিয়ে আসা না হলে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে। তদন্তকারী সংস্থাগুলোর পেশাদারিত্ব এবং দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের আসল রহস্য খুব শীঘ্রই উন্মোচিত হবে এবং অপরাধীরা উপযুক্ত শাস্তির মুখোমুখি হবে—এটাই এখন সমগ্র দেশবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা ও জোরালো দাবি।
প্রতিবেদনের সূত্র: পুলিশ প্রশাসন ও অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।