প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে সমাজ ব্যবস্থার নানা নিয়ম-কানুন, বিচারালয়ের বাইরে স্থানীয়ভাবে সালিশ বৈঠক এবং নৈতিক স্খলনের অভিযোগ কেন্দ্র করে ঘটিত বিভিন্ন ঘটনা প্রায়শই জনমনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মতো সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত সলঙ্গা থানার অধীনস্থ নলকা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত চর ফরিদপুর গ্রামে সম্প্রতি এমনই এক চাঞ্চল্যকর ও অনভিপ্রেত ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যা স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে গোটা অঞ্চলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এলাকার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কর্মরত এক দপ্তরিকে এক গৃহবধূর সঙ্গে কথিত পরকীয়ার সম্পর্কের অভিযোগে স্থানীয় লোকজন কর্তৃক আটক করার পর সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতি এক নতুন মোড় নেয়। পরবর্তীতে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে একটি সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং সেই সালিশে অভিযুক্ত দপ্তরিকে মোটা অঙ্কের আর্থিক জরিমানা করার পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক নানা ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, যা নিয়ে আইন ও সচেতন মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে বাঘাবাড়ীঘাট বণিক সমবায় সমিতির নির্বাচন সম্পন্ন
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে স্থানীয় সূত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান যে, গত শুক্রবার রাতের বেলায় যখন পুরো গ্রাম নিস্তব্ধ হয়ে আসছিল এবং সাধারণ মানুষ নিজেদের ঘরে বিশ্রামে ছিল, ঠিক সেই সময়ই এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সূত্রপাত ঘটে। সলঙ্গা থানার চর ফরিদপুর গ্রামের মুক্তার নামক এক ব্যক্তির স্ত্রী শম্পার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি আরিফুল ইসলামের একটি অবৈধ ও অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরে গুঞ্জন চলছিল। শুক্রবার রাত আনুমানিক দশটার দিকে অভিযুক্ত দপ্তরি আরিফুল ইসলাম সবার অগোচরে ওই গৃহবধূর বাড়িতে প্রবেশ করেন এবং সেখানে অবস্থানকালে স্থানীয় কিছু যুবকের চোখে বিষয়টি ধরা পড়ে যায়। গ্রামের কয়েকজন তরুণ ও সচেতন যুবক অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ওই বাড়ijen ঘিরে ফেলেন এবং সন্দেহভাজন হিসেবে দপ্তরি আরিফুল ইসলামকে হাতেনাতে আটক করেন। মুহূর্তের মধ্যে এই খবর আশপাশের বাড়িতে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে সেখানে বিপুল সংখ্যক লোক সমবেত হন এবং উত্তেজিত জনতার রোষানলে পড়ে দপ্তরি ও ওই গৃহবধূ চরম হেনস্তার শিকার হন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তেজিত জনতা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ক্ষুব্ধ মানুষেরা অভিযুক্ত দপ্তরি আরিফুল ইসলাম ও গৃহবধূ শম্পাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও মারধর করেন। রাতের সেই উত্তাল পরিস্থিতিতে গ্রামের যুবকরা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে যেভাবে বিচার করার চেষ্টা করেন, তা গ্রামীণ সালিশি সংস্কৃতির এক পুরোনো রূপকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। ঘটনার আকস্মিকতায় পুরো চর ফরিদপুর গ্রামে এক থমথমে ও আতঙ্কজনক পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যা পরদিন সকাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এই ধরনের অনৈতিক কার্যকলাপ গ্রামীণ সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিরা। তবে আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে বিষয়টি পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত করা উচিত ছিল বলে সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করলেও তাৎক্ষণিক উত্তেজনার জেরে পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয় এবং স্থানীয় মাতবররা বিষয়টি মীমাংসার জন্য সালিশ বৈঠকের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
আরও পড়ুন: চাঁপাইনবাবগঞ্জে একশত ষাট পিস ইয়াবাসহ এক মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার
পরবর্তীতে এই অপ্রীতিকর ঘটনার রেশ ধরে গত শনিবার উভয় পক্ষের অভিভাবক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং মোড়লদের উপস্থিতিতে চর ফরিদপুর গ্রামে একটি স্থানীয় সালিশ বৈঠক বসল। দীর্ঘ আলোচনা ও সালিশি বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অভিযুক্ত দপ্তরি আরিফুল ইসলামকে তার অপরাধের জন্য সরাসরি দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং তাকে শাস্তি হিসেবে পাঁচ লক্ষ টাকা নগদ জরিমানা ধার্য করা হয়। স্থানীয় সালিশ বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ এই আর্থিক জরিমানার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং অভিযুক্ত দপ্তরিকে ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো অপকর্ম বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে আর কখনো জড়িত না হওয়ার জন্য অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দেন। শুধু তাই নয়, ওই সালিশ বৈঠকের মাধ্যমে গৃহবধূ শম্পার স্বামী মুক্তারের সঙ্গে তার স্ত্রীর দীর্ঘসংসারের ইতি ঘটিয়ে বিবাহবিচ্ছেদের একটি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তও জোরপূর্বক বা পারস্পরিক সম্মতির মাধ্যমে কার্যকর করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এছাড়াও এই সালিশ বৈঠকের আলোচনায় একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় সামনে আসে, যেখানে ওই গৃহবধূর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে জমানো বা সঞ্চিত থাকা তিন লক্ষ টাকা তাদের অবুঝ সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য হস্তান্তর করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়। গ্রামীণ সমাজের এই ধরনের সালিশি বৈঠকগুলোতে সাধারণত স্থানীয় মাতবররা আইনকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের ইচ্ছামতো রায় প্রদান করে থাকেন, যা এই ঘটনার ক্ষেত্রেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে সালিশ বসিয়ে লাখ লাখ টাকা জরিমানা ধার্য করা, পারিবারিক বিবাহবিচ্ছেদ সম্পন্ন করা এবং আর্থিক লেনদেনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এই পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে এখন এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে পক্ষে-বিপক্ষে নানা ধরনের আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইছে। এ ধরনের বিচার করার এখতিয়ার স্থানীয় সালিশদারদের কতটুকু রয়েছে, তা নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মাঝেও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কারণ দেশের প্রচলিত ফৌজদারি ও পারিবারিক আইনে এই ধরনের সালিশি রায়ের কোনো আইনি ভিত্তি বা কার্যকারিতা নেই।
ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমের নজরে আসার পর এবং এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হওয়ার পর সলঙ্গা থানার পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। সলঙ্গা থানার সম্মানিত অফিসার ইনচার্জ বা ওসি আসলাম আলী সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া তার বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, এই ধরনের কোনো ঘটনা বা সালিশ বৈঠকের বিষয়ে পুলিশকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানানো হয়নি এবং এ বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণভাবে অবগত নন। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, এই ঘটনায় যদি ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ বা সংক্ষুব্ধ কোনো ব্যক্তি থানা এসে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করেন, তবে পুলিশ আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী খুব দ্রুত যথাযথ তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় থানায় কোনো ধরনের লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে পুলিশ নিজেদের উদ্যোগে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বলে জানা গেছে।
পরিশেষে বলা যায় যে, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার সলঙ্গা থানার চর ফরিদপুর গ্রামে পরকীয়ার অভিযোগে দপ্তরিকে গণধোলাই এবং পরবর্তীতে সালিশ বসিয়ে পাঁচ লক্ষ টাকা জরিমানা আদায়ের এই পুরো ঘটনাটি গ্রামীণ সমাজের বিচার ব্যবস্থার একটি ভিন্ন দিক উন্মোচন করেছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং বিচারালয়ের বদলে স্থানীয়ভাবে সালিশের মাধ্যমে বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানা আদায়ের প্রবণতা সমাজে এক ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পারে। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এই ধরনের অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার কেবল আদালতের রয়েছে, তাই স্থানীয় পর্যায়ে এ ধরনের বিচার কার্যক্রম কতটুকু আইনসিদ্ধ, তা নিয়ে ভাববার সময় এসেছে। এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের আরও বেশি কঠোর ও নজরদারিমূলক ভূমিকা পালন করা অত্যন্ত জরুরি বলে সচেতন মহল মনে করেন।
প্রতিবেদনের সূত্র: স্থানীয় সংবাদদাতা ও গ্রামবাসী।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।