প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের নৈসর্গিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকা রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলায় অবস্থিত অত্যন্ত দুর্গম সীতাপাহাড়ে অ্যাডভেঞ্চার ট্র্যাকিং করতে গিয়ে দিকভ্রান্ত হয়ে গহিন অরণ্যে হারিয়ে যাওয়া চারজন ভ্রমণপিপাসু পর্যটককে সফল অভিযানের মাধ্যমে অক্ষত ও নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার ২৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখ সন্ধ্যার পর রাত সাড়ে সাতটার দিকে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স, স্থানীয় বন বিভাগ এবং উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ যৌথ উদ্ধারকারী দল চরম প্রতিকূল পরিবেশ ও অন্ধকারচ্ছন্ন পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের সুস্থ অবস্থায় খুঁজে বের করে। বিপদের মুখ থেকে নিরাপদে ফিরে আসার পর উদ্ধারকৃত পর্যটক ও তাঁদের স্বজনেরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। কাপ্তাই ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন ও স্থানীয় বন দপ্তরের রেঞ্জ অফিসার মামুনুর রহমান যৌথ অভিযানের বিষয়টি গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন।
আরও পড়ুন: প্রতারণার কষ্টে দুধ দিয়ে গোসল করে প্রেমের ইতি টানলেন জয়পুরহাটের যুবক
প্রশাসনিক ও উদ্ধারকারী সূত্রের বরাতে জানা যায়, শুক্রবার ভোরের দিকে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে চারজন তরুণের একটি পর্যটক দল নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ ও পাহাড় ট্র্যাকিংয়ের উদ্দেশ্যে কাপ্তাই এলাকায় আগমন করেন। তারা কাপ্তাইয়ের পরিচিত এলাকা বালুচর ঘাট পয়েন্ট দিয়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী কর্ণফুলী নদী ট্রলারে পার হয়ে রোমাঞ্চকর সীতাপাহাড়ের চূড়ার উদ্দেশ্যে হেঁটে ট্র্যাকিং যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু দিনভর পার্বত্যাঞ্চলে টানা মুষলধারে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় পাহাড়ি সরু পথগুলো অত্যন্ত পিচ্ছিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিকেলের সূর্য ডুবে গিয়ে চারদিক ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লে দুর্গম গিরিখাদ ও ঘন জঙ্গলের মাঝে তারা দিক হারিয়ে ফেলেন। লোকালয়ে ফিরে আসার পথ না পেয়ে তারা বনের গভীর এলাকায় আটকে পড়েন।
পরবর্তীতে কোনোক্রমে মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে খবর পাঠানো হলে কাপ্তাই উপজেলা প্রশাসন দ্রুত ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় বন বিভাগকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিত উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। অভিজ্ঞ ফায়ার সার্ভিস সদস্য ও পাহাড়ি পথের পরিচিত বনকর্মীদের একটি চৌকস দল দ্রুত সীতাপাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছায়। তীব্র অন্ধকার, ক্রমাগত বৃষ্টি এবং খাড়া পাহাড়ি পিচ্ছিল পথ অতিক্রম করে উদ্ধারকারী টিম সীতাপাহাড়ের গহিন জঙ্গলে নিবিড় অনুসন্ধান চালাতে থাকে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর রাত সাড়ে সাতটার দিকে চার পর্যটককে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে নিরাপদে লোকালয়ে নিয়ে আসা সম্ভব হয়। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ শেষে নিশ্চিত করা হয় যে উদ্ধারকৃতরা মানসিকভাবে শঙ্কিত হলেও শারীরিক দিক থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছেন।
আরও পড়ুন: রাজবাড়ীর পাংশায় চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে কিশোরীর মর্মান্তিক মৃত্যু
স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীরা জানান, সবুজ পাহাড় ও কাপ্তাই লেকের মোহনীয় সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রচুর পর্যটকের আগমন ঘটে। তবে অধিকাংশ দর্শনার্থী স্থানীয় গাইড বা অভিজ্ঞ কারও পরামর্শ ছাড়াই অনভিজ্ঞ অবস্থায় কর্ণফুলী নদী, লেকের নির্জন এলাকা কিংবা দুর্গম সীতাপাহাড়ের মতো বিপজ্জনক পাহাড়ি জঙ্গলে প্রবেশ করে থাকেন। এলাকাভিত্তিক ভৌগোলিক জ্ঞান না থাকা এবং আবহাওয়া সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার কারণে প্রায়শই পর্যটকরা পথ হারিয়ে ফেলা, খাড়া পাহাড় থেকে পিছলে পড়া কিংবা বন্য হাতির সামনাসামনি হওয়ার মতো মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখীন হন। স্থানীয় প্রশাসন ও পর্যটন সংস্থাসমূহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গাইড নেওয়ার ওপর জোর তাগিদ দিচ্ছে।
ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে কাপ্তাই উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের পক্ষ থেকে পর্যটকদের পাহাড়ি এলাকায় ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতামূলক দিকনির্দেশনা অনুসরণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে সীতাপাহাড়ের মতো দুর্গম ট্র্যাকিং ট্রেইলে যাওয়ার পূর্বে রেজিস্টার্ড স্থানীয় গাইড সঙ্গে রাখা এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে যাত্রা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উদ্ধার পাওয়া পর্যটকেরা তাদের অসাবধানতার কথা স্বীকার করে দ্রুত উদ্ধার করার জন্য প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। কাপ্তাইয়ে পর্যটকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর স্থানীয় তদারকি আরও জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সূত্র: কাপ্তাই প্রতিনিধি ও ফায়ার সার্ভিস।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।