রাজবাড়ীর পাংশায় চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে কিশোরীর মর্মান্তিক মৃত্যু

রাজবাড়ীর পাংশায় চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে কিশোরীর মর্মান্তিক মৃত্যু
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেললাইনের আশপাশের এলাকাগুলোতে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এবং জীবন বিসর্জনের হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলো প্রায়শই আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। অসচেতনতা কিংবা মানসিক নানান টানাপোড়েনের কারণে তরুণ প্রজন্মের একাংশ যখন চরম কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন তা কেবল একটি পরিবারের জন্যই নয়, বরং পুরো সমাজ ব্যবস্থার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনে। দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লেভেল ক্রসিং কিংবা উন্মুক্ত লাইনে নিরাপত্তা বেষ্টনীর অভাব এবং মানুষের অসাবধানতার কারণে দুর্ঘটনার হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন পারিবারিক কলহ, ব্যক্তিগত হতাশা কিংবা হঠাৎ করে তৈরি হওয়া মানসিক সংকটের বশবর্তী হয়ে অনেকেই নিজের অমূল্য জীবনকে এভাবে বিপন্ন করে তোলেন, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। সমাজ ও পরিবারের পক্ষ থেকে পারস্পরিক যোগাযোগের অভাব এবং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি উদাসীনতা অনেক সময় এই ধরনের মর্মান্তিক পথ বেছে নিতে কিশোর-কিশোরীদের প্ররোচিত করে থাকে। সম্প্রতি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি জনবহুল জনপদে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে এক অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীর প্রাণহানির অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও চাঞ্চল্যকর একটি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

আরও পড়ুন: লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকট নিয়ে সংসদে রুমিন ফারহানার তীব্র সমালোচনা

খবর এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে প্রাপ্ত অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যানুযায়ী, সম্প্রতি রাজবাড়ী জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ হিসেবে পরিচিত পাংশা উপজেলায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। গত বৃহস্পতিবারের নির্ধারিত সময়ে ঠিক বেলা এগারোটার দিকে উপজেলার জনাকীর্ণ কুড়াপাড়া রেলগেট সংলগ্ন এলাকায় এই আত্মঘাতী বা আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনাটি নজরে আসে। নিহত হওয়া ওই কিশোরীর নাম আফিয়ানা জান্নাত মুমু, যার বয়স আনুমানিক ষোল বছর বলে পরিবার ও স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। তিনি মূলত রাজধানী ঢাকার কেরানীগঞ্জ বা দৌলতপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হাইয়ের কন্যা বলে জানা গেছে, তবে তিনি বেশ কিছুদিন ধরে পাংশা উপজেলার হাবাসপুর ইউনিয়নের চর আফড়া গ্রামে তার নিজ নানাবাড়িতে অবস্থান করছিলেন। ঘটনার দিন সকালে স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে ওই কুড়াপাড়া রেলগেট এলাকার আশপাশে অত্যন্ত সন্দেহজনকভাবে বা আনমনা অবস্থায় ঘোরাফেরা করতে দেখেছিলেন। কেউ বা তখন বুঝতে পারেননি যে ওই কিশোরীর মনে কী ধরনের ঝড় বইছে অথবা তিনি এ ধরনের কোনো মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই দিন সকালের দিকে খুলনা অভিমুখী আন্তঃনগর ট্রেন হিসেবে পরিচিত জনপ্রিয় সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি যখন নির্দিষ্ট গতিতে ওই এলাকা অতিক্রম করছিল, তখন পরিস্থিতি হুট করে বদলে যায়। ট্রেনটি কুড়াপাড়া রেলগেট এলাকায় পৌঁছানোর ঠিক পূর্বমুহূর্তে কিশোরী আফিয়ানা জান্নাত মুমু হঠাৎ করেই রেললাইনের ওপর ছুটে যান এবং চলন্ত ট্রেনের সামনে সরাসরি ঝাঁপ দেন। চোখের পলকে ঘটে যাওয়া এই আকস্মিক ঘটনায় ট্রেনের প্রচণ্ড ধাক্কায় তিনি ছিটকে রেললাইনের পাশে দূরে গিয়ে পড়ে যান এবং মারাত্মকভাবে জখম হন। আশপাশের লোকজন মুহূর্তের মধ্যে চিৎকার করে ছুটে এসে তাকে রক্তাক্ত ও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় দেখতে পান এবং দ্রুত উদ্ধার করার জন্য এগিয়ে আসেন। পরবর্তীতে স্থানীয়দের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তাকে দ্রুত ওই এলাকার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয় যাতে চিকিৎসকদের মাধ্যমে তার জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়। কিন্তু সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ওই কিশোরী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং তার চিরবিদ ঘটে।

আরও পড়ুন: নেত্রকোনায় ভিডিও ফাঁসের ভয় দেখিয়ে কিশোরীকে চার বছর ধরে নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্ত গ্রেপ্তার

এই মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নিহতের পরিবার এবং এলাকাবুত্তের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে এবং চারদিকে এক ধরনের থমথমে পরিবেশ তৈরি হয়। নিহত মুমুর মা আমেনা বেগম গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং জানান যে তাদের মূল বাড়ি ঢাকায় হলেও মেয়েটি তার নানাবাড়িতে থাকত। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে কী কারণে বা কোন অভিমানে তার কিশোরী মেয়ে এমন একটি পথ বেছে নিয়ে চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিল, সে বিষয়ে তাদের পরিবার সম্পূর্ণ অজ্ঞ। অন্যদিকে নিহত কিশোরীর স্বামী আকাশ আলী তার বক্তব্যে জানান যে সকালে মুমু তার কাছে একটি মোবাইল ফোন চেয়েছিল, কিন্তু তিনি কর্মস্থলে যাওয়ার সময় ফোনটি নিজের সঙ্গেই নিয়ে যান। তিনি দাবি করেন যে তার স্ত্রী কখন এবং কার অগোচরে বাড়ি থেকে বের হয়ে ওই রেলগেট এলাকায় চলে গিয়েছিল সে বিষয়ে তার বিন্দুমাত্র কোনো ধারণাই ছিল না। পরবর্তীতে অন্যের মুখে সংবাদ পেয়ে তিনি জানতে পারেন যে ট্রেনের ধাক্কায় তার স্ত্রীর মর্মান্তিক জীবনাবসান ঘটেছে।

ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় থানা পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে ও হাসপাতালে তাদের প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। পাংশা মডেল থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি শেখ মঈনুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে সংবাদ পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য এবং মৃত্যুর সঠিক কারণ উদঘাটন করার উদ্দেশ্যে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। এই অপমৃত্যুর ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা কিংবা প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রক্রিয়া বর্তমানে আনুষ্ঠানিকভাবে চলমান রয়েছে বলে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এই ধরনের মর্মান্তিক আত্মহনন বা দুর্ঘটনা রোধে পরিবারের সদস্যদের আরও বেশি মনস্তাত্ত্বিক যত্নশীল হওয়া এবং তরুণ প্রজন্মের মানসিক অবসাদ দূর করার প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে সমাজবিশ্লেষকরা মনে করছেন।

পরিশেষে বলা যায় যে, রাজবাড়ীর পাংশায় কিশোরী আফিয়ানা জান্নাত মুমুর এই করুণ পরিণতি আমাদের সমাজ ব্যবস্থার এক নির্মম ও বেদনাদায়ক বাস্তবতাকে উন্মোচন করে দিয়েছে। প্রতিটি পরিবারের উচিত কিশোর-কিশোরী ও তরুণ বয়সের সন্তানদের মনের ভাব বোঝা এবং তাদের যেকোনো মানসিক সংকট নিরসনে বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়ানো। সামান্য ভুল সিদ্ধান্ত বা অভিমানের বশে অমূল্য জীবন বিসর্জন দেওয়ার এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের তরুণ সমাজকে রক্ষা করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি—এটাই সকলের প্রত্যাশা।

প্রতিবেদনের সূত্র: পাংশা মডেল থানা পুলিশ ও স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন