আইনজীবীদের দক্ষতা বাড়াতে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ, পেশাদারিত্বের তাগিদ আইনমন্ত্রীর

আইনজীবীদের দক্ষতা বাড়াতে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ, পেশাদারিত্বের তাগিদ আইনমন্ত্রীর
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বাংলাদেশের বিচারিক ব্যবস্থা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পথে আইনজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের পেশাগত মেধা, দক্ষতা ও মান নিয়ে এক বড় ধরণের প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৮০ হাজার তালিকাভুক্ত আইনজীবী আইন পেশায় যুক্ত রয়েছেন। তবে এই বিশালসংখ্যক আইনজীবীর প্রকৃত পেশাগত যোগ্যতা ও মান নিয়ে গভীর সংশয় ব্যক্ত করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। শুক্রবার রাজধানীর ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) আইন বিভাগের উদ্যোগে নবীন আইনজীবীদের বরণ ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এই উদ্বেগের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

আরও পড়ুন: রাজবাড়ীর পাংশায় চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে কিশোরীর মর্মান্তিক মৃত্যু

আইনমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় সুপ্রিম কোর্টেই বর্তমানে প্রায় ১৮ হাজার আইনজীবী তালিকাভুক্ত হয়ে প্র্যাকটিস চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এই বিপুল পরিমাণের আইনজীবীদের মধ্যে কতজন প্রকৃত অর্থে যোগ্য, প্রজ্ঞাবান ও দক্ষ, তা সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করার কোনো সঠিক বা বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড আমাদের বিচারিক ব্যবস্থায় বিদ্যমান নেই। এই বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং আইনি সেবার গুণগত মানের ওপর এটি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার সুনিশ্চিত করতে হলে আইনজীবীদের যোগ্যতার সঠিক বিকাশ ও মূল্যায়ন জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

পেশাগত এই গুরুতর ঘাটতি দূর করতে এবং নতুন প্রজন্মের আইনজীবীদের বিশ্বমানের দক্ষতাসম্পন্ন করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি জানান, নবীন আইনজীবীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও আধুনিক ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ও আইনজীবীদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ইতিমধ্যে ৫০ কোটি টাকার বিশেষ অর্থ বরাদ্দ প্রদান করেছে। এই বরাদ্দের মাধ্যমে আইনজীবীদের পেশাগত মান বৃদ্ধি, আধুনিক আইনি কৌশল শিক্ষাদান এবং কাঠামোগত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন: নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি বেড়ে ১৬২, শতাধিক পর্যটক নিখোঁজ

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত নতুন গ্র্যাজুয়েট ও তরুণ আইনজীবীদের দিকনির্দেশনা দিয়ে মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আইন পেশা শুধু অর্থ উপার্জনের কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক মাধ্যম হতে পারে না। এটিকে একটি মহৎ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কেবল দ্রুত উপার্জনের পেছনে না ছুটে সর্বোচ্চ সততা, প্রজ্ঞা, কঠোর মেধা ও গভীর পেশাদারিত্বের চর্চা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি। একই সাথে আদালতের বিচারপ্রার্থী সাধারণ ও অসহায় মানুষের প্রকৃত আইনি সহায়তা প্রদানে আন্তরিকতার সাথে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করেন।

সমসাময়িক বিশ্ব ও পরিবর্তনশীল বিচারিক ব্যবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আইনমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সময়ে আইনি জটিলতা আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রযুক্তি, সাইবার আইন এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় যুক্ত হওয়ায় নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ফলে প্রথাগত ধারণার বাইরে গিয়ে আধুনিক গবেষণালব্ধ জ্ঞান অর্জন করা ব্যতিরেকে মানসম্পন্ন আইনজীবী হওয়া সম্ভব নয়। একজন ভালো আইনজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে নিয়মিত আইন পর্যালোচনা, উচ্চ আদালতের নজিরসমূহ বিশ্লেষণ এবং মৌলিক আইনি নীতি গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে হবে।

দেশের সকল নাগরিকের জন্য সহজ ও দুর্নীতিমুক্ত বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আইনজীবীদের নৈতিক ভূমিকা অনস্বীকার্য। মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, ৫০ কোটি টাকার বরাদ্দকৃত এই প্রশিক্ষণ তহবিল সঠিকভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে আগামী দিনে দেশের আইনজীবী সমাজের পেশাগত মান বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। যখন আইনজীবীরা সৎ ও যোগ্য হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করবেন, তখন দেশের বিচার প্রক্রিয়ার গতি ত্বরান্বিত হবে এবং মামলা জট কমাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে। নবীনদের হাত ধরেই দেশের বিচারাঙ্গনে এক নতুন ও স্বচ্ছ অধ্যায়ের সূচনা হবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।

সুশাসন ও মানবাধিকার সুরক্ষায় আইনজীবীদের দায়িত্ব অপরিসীম উল্লেখ করে মন্ত্রী সমাপনী বক্তব্যে বলেন, প্রতিটি মামলায় ন্যায্যতা বজায় রাখা এবং অহেতুক দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করা আইনজীবীদের নৈতিক দায়িত্ব। বিচারালয়ে পেশাদারিত্বের চরম প্রতিফলন ঘটানো গেলে সাধারণ জনগণের আস্থার জায়গাটি আরও শক্তিশালী হবে। ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের নবীন আইনজীবীরা দেশের সংবিধান ও আইনের শাসন রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে এবং সত্যের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেবে—এই আশাবাদ ব্যক্ত করে মন্ত্রী তাঁর দীর্ঘ ও গঠনমূলক বক্তব্য সমাপ্ত করেন।

সূত্র: নিজস্ব সংগ্রাহক ও বাসস।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন