কক্সবাজারে হোটেল বারে সংঘাত, হামলাকারীসহ ২ যুবকের প্রাণহানি

কক্সবাজারে হোটেল বারে সংঘাত, হামলাকারীসহ ২ যুবকের প্রাণহানি
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

পর্যটন নগরী কক্সবাজার শহরের প্রাণকেন্দ্র ঝাউতলা এলাকার একটি আবাসিক হোটেলের বারে মধ্যরাতে সংঘটিত এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় শেষ পর্যন্ত দুই যুবকের ট্র্যাজিক মৃত্যু ঘটেছে। সামান্য কথা-কাটাকাটি ও অভ্যন্তরীণ বাকবিতণ্ডাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সহিংসতা অতি দ্রুত প্রাণঘাতী হামলায় রূপ নেয়। এই নৃশংস ঘটনায় নাজিবুল হক রাশেদ (২৮) নামের এক যুবক ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ঘটনায় জড়িত অভিযুক্ত প্রধান হামলাকারী সালমান মিয়া (২৮) বিক্ষুব্ধ জনতার গণপিটুনির শিকার হন এবং পরবর্তীতে পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারান। পরপর দুটি মৃত্যুর ঘটনায় পুরো কক্সবাজার শহরের ঝাউতলা ও সংলগ্ন এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য, থমথমে পরিস্থিতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয়া ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ আগস্ট ২০২৬ বৃহস্পতিবার রাতের শেষভাগে ঝাউতলা এলাকায় অবস্থিত ‘রেনেসাঁ হোটেল’—এর নিজস্ব বারে এই মর্মান্তিক ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। সেখানে অবস্থানরত একদল বন্ধুর মধ্যে নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নিয়ে তুচ্ছ কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, মদ্যপ অবস্থায় থাকার কারণে অতি সামান্য মতভেদেও তাদের মধ্যকার উত্তেজনা দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। উত্তেজনার একপর্যায়ে অভিযুক্ত সালমান মিয়া ও তাঁর সঙ্গীরা উত্তেজিত হয়ে কাচের বোতল ভেঙে এবং সঙ্গে থাকা ধারালো ছুরি বের করে নাজিবুল হক রাশেদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা রাশেদের শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে এলোপাতাড়ি আঘাত ও পেটে ছুরিকাঘাত করে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করে।

আরও পড়ুন: আইনজীবীদের দক্ষতা বাড়াতে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ, পেশাদারিত্বের তাগিদ আইনমন্ত্রীর

ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় লোকজন ও হোটেলের অন্যান্য অতিথিরা তীব্র হট্টগোল শুনে এগিয়ে আসেন এবং রক্তাক্ত ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাশেদকে দ্রুত উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে আঘাত অত্যধিক গুরুতর হওয়ায় এবং শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক রাশেদকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষেই মৃত বলে ঘোষণা করেন। যুবকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে স্থানীয় বাসিন্দা ও সেখানে উপস্থিত উত্তেজিত জনতার মধ্যে চরম ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। তারা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে প্রধান অভিযুক্ত সালমান মিয়াকে ধরে ফেলে এবং ঘটনাস্থলেই বেধড়ক গণপিটুনি দেয়।

খবর পেয়ে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং মুমূর্ষু অবস্থায় সালমানকে উত্তেজিত জনতার হাত থেকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয়। চিকিৎসাসেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে পুলিশ প্রথমে তাঁকে দ্রুত কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করায়। কিন্তু সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে এবং আঘাত আশঙ্কাজনক হওয়ায় সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসকদের পরামর্শে সালমানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাতেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে নিবিড় পরিচর্যায় চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় আজ ২৮ আগস্ট শুক্রবার সকালে সালমানেরও মৃত্যু ঘটে।

আরও পড়ুন: স্লিপার বাস বন্ধ হলে দুই হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে: মালিক সমিতি

জোড়া মৃত্যুর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও থমথমে রাখা নিশ্চিত করতে প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্দেশে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট ‘রেনেসাঁ হোটেল’—এর বারটি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পর্যটন নগরীর নিরাপত্তা বজায় রাখতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে নৈশকালীন মদ বিক্রির বাণিজ্যিক স্থানগুলোর নিরাপত্তা বিধান ও তদারকি জোরদার করার তাগিদ দিচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।

কক্সবাজারের দায়িত্বপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, প্রাথমিক তদন্তে এটিকে পরিচিত জনদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত ও তাৎক্ষণিক বিরোধের চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং মূল সহিংসতায় আরও কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইন্ধন জুগিয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের একাধিক তদন্ত দল কাজ শুরু করেছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট হোটেলের অভ্যন্তরীণ ও বাইরের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং পুলিশ সেটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করছে। ফুটেজ দেখে ঘটনায় জড়িত অন্যান্য অভিযুক্তদের শনাক্ত করার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

ঘটনায় জড়িত অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করার জন্য কক্সবাজার শহরের সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান ও চিরুনি তল্লাশি জোরদার করেছে পুলিশ। একই সাথে নিহত দুই যুবকের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করতে কক্সবাজার সদর হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় পৃথক মামলার প্রস্তুতি চলছে এবং আইনগত সব ধরণের প্রক্রিয়া দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করা হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।

পর্যটন শহর কক্সবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল বাণিজ্যিক এলাকায় হোটেল বারের অভ্যন্তরে এমন রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও প্রাণহানির ঘটনা সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং নৈশকালীন বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। প্রশাসন আশ্বস্ত করেছে যে, এই ঘটনায় আইন অনুযায়ী কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং দোষী কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

সূত্র: নিজস্ব সংগ্রাহক ও পুলিশ প্রশাসন।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন