যশোরে পারিবারিক বিরোধে মাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ, ছেলে পলাতক

যশোরে পারিবারিক বিরোধে মাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ, ছেলে পলাতক
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

যশোর সদর উপজেলার পৈতৃক ভিটায় সংঘটিত এক অত্যন্ত নৃশংস ও মর্মান্তিক ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। নিজ জন্মদাত্রী মাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে এক পাষণ্ড ছেলের বিরুদ্ধে। মর্মান্তিক এই রোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার নরেন্দ্রপুর ইউনিয়নের বাজে দুর্গাপুর গ্রামে। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত সন্তান মামুনুর রশিদ মামুন (৪৫) এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। এই লোমহর্ষক ঘটনায় নিহত বৃদ্ধার নাম আনোয়ারা বেগম (৫৮)। ২৭ আগস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার শেষ বিকেলে ঘটে যাওয়া এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে পুরো বাজে দুর্গাপুর গ্রামসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে চরম শোক, বিষাদ ও গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এক সময়ের সম্মানিত শিক্ষক পদে কর্মরত এক সন্তান কীভাবে নিজের মায়ের প্রতি এমন বর্বরতা চালাতে পারে, তা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।

আরও পড়ুন: কক্সবাজারে হোটেল বারে সংঘাত, হামলাকারীসহ ২ যুবকের প্রাণহানি

স্থানীয় সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী, নিহত আনোয়ারা বেগমের ছেলে অভিযুক্ত মামুনুর রশিদ মামুন পূর্বে ঝিকরগাছা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী লাউজানী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বাজে দুর্গাপুর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আলতাফ হোসেন মাস্টারের ছেলে। একটি সুপরিচিত ও শিক্ষানুরাগী পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে মামুন তীব্র পারিবারিক অসন্তোষ, দাম্পত্য অস্থিরতা এবং গভীর মানসিক হতাশায় ভুগছিলেন। স্বজনদের ভাষ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক টানাপোড়েন এবং মানসিক বিশৃঙ্খলার কারণে তিনি স্বাভাবিক আচার-আচরণ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছিলেন, যা পরবর্তীতে এই ভয়াবহ সংঘাত ও সহিংসতায় রূপ নেয়।

স্বজন ও প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অভিযুক্ত মামুনের ব্যক্তিগত জীবনে নানা মানসিক জটিলতা ছিল। তিনি ইতিপূর্বে দুটি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু উভয় সংসারেই চরম কলহের কারণে শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদ ঘটে। দুটি সংসার ভেঙে যাওয়ার পেছনে মামুন সবসময় তাঁর নিজের মা আনোয়ারা বেগমকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দায়ী করতেন। তাঁর মনে এক ধরণের অন্ধ ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল যে, মায়ের হস্তক্ষেপের কারণেই তাঁর সংসার ও জীবন ধ্বংস হয়েছে। এই ক্ষোভের জেরে পূর্বেও বেশ কয়েকবার মা ও ছেলের মধ্যে তীব্র তর্ক-বিতর্ক এবং হাতাহাতির অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিল বলে স্থানীয় বাসিন্দারা নিশ্চিত করেছেন।

মানসিক স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটলে প্রায় তিন বছর আগে পরিবারের পক্ষ থেকে মামুনকে সুচিকিৎসার জন্য পাবনা মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে তিনি দুই থেকে তিন মাস আবাসিক চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং পরবর্তীতে কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। তবে পরিবারের ওপর জমে থাকা ক্ষোভের কারণে গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি নিজের বাড়ির বাইরে অবস্থান করছিলেন। দীর্ঘ সময় পর গত বৃহস্পতিবার হঠাৎ করেই বাজে দুর্গাপুর গ্রামে পৈতৃক ভিটায় ফিরে আসেন মামুন। দীর্ঘদিন পর বাড়িতে ফেরার পর বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে একটি অতি সাধারণ পারিবারিক বিষয় নিয়ে মা আনোয়ারা বেগমের সাথে তাঁর তীব্র তর্কের সূত্রপাত হয়।

আরও পড়ুন: টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে পিকআপভর্তি মেয়াদোত্তীর্ণ সরকারি ওষুধ জব্দ, আটক এক

কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে মামুনের ভেতরের জমে থাকা অনিয়ন্ত্রিত ক্ষোভ চরম আকার ধারণ করে। তিনি অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে ঘর থেকে রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহৃত ধারালো বটি তুলে নিয়ে মায়ের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। উন্মত্ত মামুন বটি দিয়ে নিজ মায়ের ঘাড় ও গলার অংশে সরাসরি আঘাত করেন। ধারালো অস্ত্রের নির্মম আঘাতে ঘটনাস্থলেই আনোয়ারা বেগম রক্তভেজা মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। বৃদ্ধা মায়ের আকস্মিক আর্তচিত্কার শুনে আশেপাশের ঘরবাড়ি থেকে প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের আকস্মিক আগমন দেখে অভিযুক্ত মামুন রক্তাক্ত বটিটি ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে দ্রুত সটকে পড়েন এবং এলাকা ছেড়ে পালিয়ে আত্মগোপন করেন। প্রতিবেশীরা ঘরে ঢুকে আনোয়ারা বেগমকে নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে অবিলম্বে পুলিশে খবর দেন। খবর পেয়ে যশোর কোতোয়ালি থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঘটনার আলামত সংগ্রহ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে প্রাথমিক সুরতহাল প্রস্তুত করার পর মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে যশোর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুন খান জানান, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে যে পারিবারিক বিরোধ ও পুরোনো তিক্ততার জেরে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছে। তিনি আরও জানান, অভিযুক্ত সন্তানকে দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনার জন্য পুলিশের একাধিক দল ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে অভিযান শুরু করেছে। এ ব্যাপারে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে এবং পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হচ্ছে।

সূত্র: নিজস্ব সংগ্রাহক ও পুলিশ প্রশাসন।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন