প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের আধুনিকায়ন এবং দূরপাল্লার যাত্রীদের যাতায়াত প্রক্রিয়াকে অধিকতর আরামদায়ক করে তোলার ক্ষেত্রে বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে স্লিপার এসি বাসগুলো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। সাধারণ সিটের পরিবর্তে বাসের ভেতরে শোয়ার সুব্যবস্থা সংবলিত এই বিশেষ যাত্রীবাহী বাসগুলো দেশের সাধারণ মানুষের দীর্ঘপথের ভ্রমণক্লান্তি দূর করার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সাম্প্রতিক সময়ে এই সম্ভাবনাময় আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি কুচক্রী ও স্বার্থান্বেষী মহল নানা ধরনের ষড়যন্ত্র এবং অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে, যা পুরো পরিবহন শিল্পকে গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং আকস্মিক অযৌক্তিক অভিযানের প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ স্লিপার এসি বাস মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত জোরালো কণ্ঠে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে, কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছাড়াই যদি এভাবে স্লিপার বাস চলাচলের ওপর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়, তবে এই খাতে জড়িত প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগ এবং প্রায় আড়াই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান চিরতরে চরম হুমকির মুখে পতিত হবে।
আরও পড়ুন: বগুড়ায় ২১০০ পিস ইয়াবা ও নগদ টাকাসহ শীর্ষ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এবং বাংলাদেশ স্লিপার এসি বাস মালিক সমিতির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য অনুযায়ী, গত রোববার রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বনানী এলাকায় বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি বা বিআরটিএ কার্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা হয়। ছুটির রেশ কাটিয়ে সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসের ব্যস্ত সকালে সমিতির পক্ষ থেকে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত পরিবহন মালিক, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমের বিশিষ্ট সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। সমিতির সম্মানিত সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বাবু অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও জোরালো ভাষায় সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের মুখোমুখি হয়ে স্লিপার বাসের বর্তমান স্থবির অবস্থা এবং প্রশাসনের কিছু আকস্মিক পদক্ষেপের ফলে সৃষ্ট জটিলতাগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন যে, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের প্রধান প্রধান মহাসড়কগুলোতে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে এই বিশেষ সেবা প্রদানকারী বাসগুলো চলাচল করে আসছে এবং এর মাধ্যমে হাজার হাজার যাত্রীর জীবন সহজ হয়েছে, অথচ হঠাৎ করেই একটি মহল এর বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বাবু অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কিছু ঐতিহাসিক ও বাস্তবিক তথ্য তুলে ধরে বলেন যে, ২০১০ সাল থেকেই বাংলাদেশের দূরপাল্লার মহাসড়কগুলোতে যাত্রীদের উন্নত সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে স্লিপার বাস চলাচল শুরু করেছিল। দীর্ঘ এই চৌদ্দ বছরের পথপরিক্রমায় পরিবহন ব্যবসায়ীরা নিজেদের কষ্টার্জিত মূলধন বিনিয়োগ করে এই আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের বাসগুলো রাস্তায় নামিয়েছেন, যার ফলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার এক বিশাল রূপান্তর ঘটে গেছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন রুটে সব মিলিয়ে প্রায় এক হাজারেরও বেশি আধুনিক স্লিপার এসি বাস নিয়মিতভাবে চলাচল করছে এবং লক্ষাধিক যাত্রীকে প্রতিদিন নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী ও মনগড়া ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মহল তাদের নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিল করার অসৎ উদ্দেশ্যে এই স্লিপার বাসগুলোর বৈধতা নিয়ে নানা ধরনের মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে প্রশাসনকে ভুল বোঝাচ্ছে এবং তার ফলশ্রুতিতে সড়কে হঠাৎ করে নানা ধরনের দমনমূলক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: কুষ্টিয়ায় বিয়ের রাতে স্ট্যান্ড ফ্যান পড়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নববরের মৃত্যু
মালিক সমিতির পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, স্লিপার বাসের আইনি বৈধতা এবং চলাচলের অনুমতি সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যেই দেশের উচ্চ আদালত বা হাইকোর্টে রিট মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় কোনো ধরনের প্রশাসনিক হয়রানি করা আইনসম্মত নয়। আদালতের বিচারাধীন কোনো বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো চূড়ান্ত রায় বা নির্দেশনা আসার আগেই তড়িঘড়ি করে সড়কগুলোতে এই বাসগুলোর চলাচল বন্ধ করার পাঁয়তারা চালানো হলে তা দেশের আইনের প্রতি চরম অসম্মানের শামিল হবে বলে তারা মন্তব্য করেন। সংবাদ সম্মেলনে আরও জোরালো দাবি জানিয়ে বলা হয়েছে যে, যেহেতু এই আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে এবং যাতায়াতকে বহুলাংশে স্বস্তিদায়ক করে তুলেছে, তাই একে কোনো অবস্থাতেই বেআইনি ঘোষণা করা উচিত নয়। বরং এর পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগ, বিআরটিএ এবং পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও মালিকদের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট, সময়োপযোগী এবং বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন করা হোক, যাতে সবাই সেই নীতিমালার আলোকেই ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।
পরিবহন খাতের এই শীর্ষস্থানীয় নেতা তৌহিদুল ইসলাম বাবু আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সময়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি যখন নানা বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে পরিবহন খাতের মতো একটি বিশাল উৎপাদনশীল ও সেবামূলক খাতে আঘাত হানা কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। দেশের বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে উদ্যোক্তারা এই স্লিপার বাসগুলোতে যে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগ করেছেন, তা আকস্মিক বন্ধ হয়ে গেলে অর্থনীতির চাকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেবল আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং এই এক হাজার বাসের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকা ড্রাইভার, সুপারভাইজার, হেল্পার, মেকানিক, কাউন্টার মাস্টার এবং মালিক পক্ষের কর্মচারীসহ প্রায় আড়াই লাখ কর্মক্ষম মানুষের জীবনজীবিকা ও তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে পড়বে। লক্ষাধিক মানুষের এই বিশাল কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই স্লিপার বাস বন্ধের যে কোনো ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিরত থাকতে হবে বলে তিনি কঠোর আহ্বান জানান।
বিআরটিএ কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনের পর থেকেই দেশের পরিবহন অঙ্গনে এবং সাধারণ যাত্রীদের মাঝে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বহু দূরপাল্লার নিয়মিত যাত্রী এবং সাধারণ মানুষ মনে করছেন যে, বর্তমান সময়ে সাধারণ সিটের বাসে দীর্ঘ পথ ভ্রমণ করা অত্যন্ত কষ্টকর, বিশেষ করে বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষদের জন্য স্লিপার বাসগুলো এক প্রকার আশীর্বাদস্বরূপ কাজ করছে। তাই কোনো ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা না করে বা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন না করে হঠাৎ করে এই আধুনিক বাসগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হলে তা জনদুর্ভোগকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। মালিক সমিতির পক্ষ থেকে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের প্রতি আকুল আবেদন জানানো হয়েছে যেন তারা এই বিষয়টি অত্যন্ত মানবিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করেন। স্বার্থান্বেষী মহলের অপপ্রচারে কান না দিয়ে বরং একটি ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করার জন্য তারা বারবার জোর দাবি জানিয়েছেন।
পরিশেষে বলা যায় যে, রাজধানী ঢাকার বনানীতে বাংলাদেশ স্লিপার এসি বাস মালিক সমিতির আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত দাবিগুলো দেশের পরিবহন অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং আড়াই লাখ মানুষের রুটি-রুজির সঙ্গে জড়িত এই সংবেদনশীল ইস্যুটিকে পাশ কাটিয়ে কোনো একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও পরিবহন খাতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে পারে। আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করে এবং একটি সুশৃঙ্খল নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমেই কেবল এই আধুনিক পরিবহন সেবাটি টিকিয়ে রাখা সম্ভবপর হতে পারে। আমরা আশা করি সরকারের সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করবেন এবং উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটি সুষম ও জনবান্ধব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, যাতে বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাকে এবং সাধারণ যাত্রীরাও নির্বিঘ্নে তাদের সেবা উপভোগ করতে পারেন।
প্রতিবেদনের সূত্র: বাংলাদেশ স্লিপার এসি বাস মালিক সমিতি ও বিআরটিএ প্রাঙ্গণ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।