প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান ও জনবহুল বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক বগুড়া জেলাকে মাদকের ছোবল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং পুলিশ প্রশাসন প্রতিনিয়ত সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া এই বিষাক্ত মাদকদ্রব্যের বিস্তার রোধে গোয়েন্দা নজরদারি এবং নিয়মিত টহল কার্যক্রমের ফলে বহু কুখ্যাত অপরাধী একের পর এক ডালের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে আইনের মুখোমুখি হতে বাধ্য হচ্ছে। সম্প্রতি বগুড়া সদর উপজেলার অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জনবহুল একটি নির্দিষ্ট এলাকায় পুলিশ প্রশাসনের বিশেষ একটি দল অত্যন্ত সফল অভিযান পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য এবং অবৈধ অর্থসহ এলাকার দীর্ঘদিনের তালিকাভুক্ত এক শীর্ষ মাদক সম্রাটকে হাতেনাতে পাকড়াও করতে সক্ষম হয়েছে। একাধিক ফৌজদারি মামলার আসামি হিসেবে ইতিপূর্বেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর খাতায় নাম থাকা এই কুখ্যাত মাদক কারবারির গ্রেপ্তারের খবরটি পুরো জেলাজুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে এবং অপরাধ জগতের অন্ধকার চক্রে এক বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
আরও পড়ুন: প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতের সঙ্গে জাইকা প্রতিনিধিদলের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও গোয়েন্দা সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত রোববার সকালে ঘড়ির কাঁটায় যখন দিনটির কার্যক্রম শুরু হচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ই এই সফল ও নাটকীয় অভিযানটি পরিচালিত হয়। বগুড়া জেলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সদর উপজেলার অন্তর্গত মাটিডালী নামক এলাকার করতোয়াপাড়া নামক নির্দিষ্ট উপ-অঞ্চলে ফুলবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত চৌকস কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ দলটি এই অভিযান পরিচালনা করেন। গোপন সূত্রে প্রাপ্ত অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও সুনির্দিষ্ট খবরের ভিত্তিতে পুলিশ সদস্যরা আগে থেকেই ওই এলাকাটি কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে নিজেদের নজরদারির আওতায় নিয়ে এসেছিলেন এবং সন্দেহভাজন স্থানগুলোতে ওঁৎ পেতে বসেছিলেন। রবিবারের ভোরের আলো ফোটার পর পরই যখন মাদক কারবারিরা তাদের অবৈধ লেনদেন বা স্থান পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই ফুলবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির অভিযানিক দল চারদিক থেকে অত্যন্ত সুকৌশলে ওই আস্তানাটি সম্পূর্ণ ঘিরে ফেলে এবং অপরাধীকে পলায়নের বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।
পুলিশের এই আকস্মিক ও ঝটিকা অভিযানে হাতেনাতে ধরা পড়া কুখ্যাত মাদক অপরাধীর পরিচয় পরবর্তীতে যাচাই-বাছাই করে নিশ্চিত করা হয়েছে, যা এলাকাবাসীকেও অবাক করে দিয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত এই শীর্ষ মাদক কারবারির নাম মনোয়ার হোসেন মোহন, যাঁর বয়স আনুমানিক পঁয়তাল্লিশ বছর এবং তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে যে, এই মনোয়ার হোসেন মোহন বগুড়ার স্থানীয় মাটিডালী করতোয়াপাড়া এলাকারই বাসিন্দা এবং তাঁর পিতার নাম মৃত হারুন অর রশিদ। এলাকার সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে থেকে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে সে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নিজের অবৈধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করে আসছিল। একাধিক মাদক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত ও তালিকাভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও সে বারবার নানা কৌশলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রবিবারের এই সফল অভিযানে পুলিশের জালে চিরতরে বন্দি হলো সে।
আরও পড়ুন: ভাঙ্গায় বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে নিয়ে ছোট ভাইয়ের পলায়ন ও থানায় সংঘর্ষ
মাটিডালী করতোয়াপাড়ার ওই নির্দিষ্ট বাড়িতে ফুলবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির দলটি তল্লাশি চালানোর সময় অপরাধীর কাছ থেকে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও অপরাধের অকাট্য প্রমাণাদি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অপরাধী পালানোর চেষ্টা করলেও তল্লাশি দলের সদস্যরা তার হেফাজত এবং তার ব্যবহৃত গোপন স্থান থেকে ঠিক একুশশ পিস অত্যন্ত মাদকদ্রব্য হিসেবে আমদানিকৃত ও নিষিদ্ধ ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করেন। এত বিপুল পরিমাণে ইয়াবা ট্যাবলেটের এই চালানটি সে সম্ভবত কোনো বড় কোনো চক্রের কাছ থেকে সংগ্রহ করে খুচরা ও পাইকারি মূল্যে বিতরণের জন্য মজুত করে রেখেছিল। কেবল মাদকদ্রব্য উদ্ধার করেই পুলিশ ক্ষান্ত হয়নি, বরং তল্লাশির সময় তার কাছ থেকে মাদক ব্যবসার অবৈধ লেনদেন থেকে প্রাপ্ত নগদ অর্থও উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত মোট নগদ টাকার পরিমাণ ছিল সাঁত্রিশ হাজার পাঁচশত টাকা, যা সে বিগত কয়েক দিনে মাদক বিক্রির মাধ্যমে উপার্জন করে অত্যন্ত যত্নে নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছিল বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ এবং রেকর্ডপত্র বিশ্লেষণ করে জানা গেছে যে, ধৃত মনোয়ার হোসেন মোহন কোনো সাধারণ বা চুনোপুঁটি মাদক বিক্রেতা নয়, বরং সে একজন সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের মূল হোতা। তার বিরুদ্ধে এর আগেও দেশের বিভিন্ন থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনসহ বিভিন্ন গুরুতর অপরাধে ঠিক সাতটি আলাদা মামলা বিচারাধীন রয়েছে বা তদন্তাধীন রয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। এতগুলো মামলা থাকার পরও জামিনে মুক্ত হয়ে কিংবা নানা ফাঁকফোকর গলিয়ে সে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়েছিল এবং এলাকার তরুণ সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছিল। ফুলবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ও অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে সম্পূর্ণ অভিযানটি পরিচালনা করেন এবং আইনানুগ সকল প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করে উদ্ধারকৃত ইয়াবা বড়ি ও নগদ টাকাগুলো জব্দ তালিকার অন্তর্ভুক্ত করেন। জনবহুল একটি এলাকায় এভাবে প্রকাশ্য মাদকের চালানসহ শীর্ষ অপরাধীর গ্রেপ্তার হওয়া স্থানীয় সাধারণ মানুষকে দারুণভাবে আনন্দিত করেছে এবং তারা পুলিশ প্রশাসনের এই সাহসী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
গ্রেপ্তার সম্পন্ন হওয়ার পর পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমকে জানানো হয়েছে যে, এই মাদক কারবারির বিরুদ্ধে প্রচলিত বলবৎকৃত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে আরও একটি নতুন মামলা রুজু করার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। রবিবার দুপুরের দিকে তাকে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তার মাধ্যমে বগুড়া সদর থানা থেকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং আদালতের মাধ্যমে তাকে জেলহাজতে প্রেরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে যে, মনোয়ার হোসেন মোহনকে আদালতে রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, যাতে তার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য গডফাদার ও সংযোগকারী চক্রের সদস্যদের নাম খুব শীঘ্রই বের করে আনা সম্ভব হয়। বগুড়া জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় থেকে বারবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে যে, মাদকের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপস করা হবে না এবং জেলার প্রতিটি প্রান্তে মাদক ব্যবসায়ীদের শিকড় এভাবেই উৎপাটন করা হবে। সাধারণ মানুষের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে সমাজ থেকে এই অভিশাপ চিরতরে দূর করা সম্ভব হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
পরিশেষে বলা যায় যে, বগুড়ার মাটিডালী করতোয়াপাড়া এলাকায় ২১০০ পিস ইয়াবা বড়ি, মাদক বিক্রির নগদ অর্থ এবং সাতটি মামলার আসামি মনোয়ার হোসেন মোহনকে গ্রেপ্তারের এই ঘটনাটি পুলিশের অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের ঐতিহাসিক সাফল্য। সমাজকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে হলে এই ধরনের দাগী অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিয়মিতভাবে এ রকম কঠোর অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি। আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল যুবসমাজকে একটি সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়া সম্ভব হতে পারে। আমরা আশা করি বগুড়া পুলিশ প্রশাসনের এই ধারাবাহিক তৎপরতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে এবং দেশের মাটি থেকে সকল ধরনের মাদক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চিরতরে নির্মূল হয়ে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে উঠবে।
প্রতিবেদনের সূত্র: ফুলবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ি ও বগুড়া সদর থানা প্রশাসন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।