প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ বা নীতিনির্ধারণী অঙ্গনে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জ্বালানি খাতের অচলাবস্থা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে জনপ্রতিনিধিদের সরব উপস্থিতি সবসময়ই জনমনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে থাকে। দেশের সাধারণ মানুষ যখন চরম মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং কর্মসংস্থানের ঘাটতির কারণে মানবেতর জীবনযাপন করেন, তখন সংসদের ভেতর দাঁড়িয়ে সেই বাস্তব চিত্র তুলে ধরা বিরোধী বা স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের অন্যতম প্রধান নৈতিক দায়িত্ব। সরকারের নীতিগত সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার খতিয়ান তুলে ধরে গঠনমূলক সমালোচনা করার মাধ্যমেই কেবল সংসদীয় গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য ও কার্যকারিতা পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হতে পারে। সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং জীবনযাত্রার সংকটগুলোকে যখন নীতিনির্ধারকদের সামনে সুনির্দিষ্ট যুক্তির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়, তখন তা প্রশাসনের টনক নড়াতে বাধ্য করে। দেশের চলমান জ্বালানি সংকট, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির নানা দিক নিয়ে সম্প্রতি জাতীয় সংসদের উচ্চমঞ্চে এক জোরালো আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে দেশের বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে বক্তব্য প্রদান করেছেন বিশিষ্ট স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা।
আরও পড়ুন: বেড়ায় কালবেলা প্রতিনিধির ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে প্রাণনাশের হুমকির ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি
খবর ও সংসদীয় কার্যক্রম সূত্রে প্রাপ্ত অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যানুযায়ী, চলতি সপ্তাহের গত বৃহস্পতিবারের নির্ধারিত সময়ে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ ধারার বিধান অনুযায়ী এই বিশেষ বক্তব্যটি প্রদান করা হয়। সংসদের ভেতরে দাঁড়িয়ে দেশের জ্বালানি খাতের ভঙ্গুর দশা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের চরম বিপর্যয়ের চিত্র অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন এই সংসদ সদস্য। তাঁর বক্তব্যে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের লুকোচুরি খেলা এবং এর ফলে সাধারণ গ্রাহকদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের বিষয়টি অত্যন্ত ব্যঙ্গাত্মক ও বাস্তবসম্মত ভাষায় ফুটে ওঠে। বর্তমান সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তীব্র গরমে বিদ্যুতের যে লুকোচুরি খেলা চলছে, তার কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট এবং কর্মসংস্থানের করুণ চিত্র তুলে ধরে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা আরও বলেন যে, একদিকে যখন আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিদ্যুতের জন্য সাধারণ মানুষ হাহাকার করছে, ঠিক তখন উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে শ্রমবাজারে। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পূর্বে সাধারণ মানুষের কাছে প্রতি বছর কোটির অধিক নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে ফুলঝুরি বা প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়েছিল, তার বাস্তবতা অত্যন্ত করুণ বলে তিনি দাবি করেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন খাতের প্রায় বাষ্পীভবনের মাধ্যমে ৬২ হাজারেরও বেশি খেটে খাওয়া মানুষ তাদের চাকরি হারিয়ে সম্পূর্ণ বেকার হয়ে পড়েছেন বলে তিনি সংসদে উল্লেখ করেন। এর পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ইতোমধ্যে দেশের প্রায় নয়শতাধিক ছোট-বড় কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হওয়া তো দূরের কথা, উল্টো বিদ্যমান কর্মসংস্থানগুলো টিকিয়ে রাখাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কর্মরত চাকরিজীবীরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিনিয়ত চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আরও পড়ুন: লালমনিরহাট সীমান্তে বিএসএফের অনুপ্রবেশ ও কৃষকদের মারধরের ঘটনায় অস্ত্র জব্দ
সরকারের পূর্বঘোষিত অগ্রাধিকারমূলক কর্মপরিকল্পনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করে তিনি বলেন যে, বর্তমান প্রশাসনের প্রথম দিকের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারের তালিকায় মূলত তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্যে প্রথমটি হলো সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সাধন, দ্বিতীয়টি হলো সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে দ্রব্যমূল্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং তৃতীয়টি হলো দেশের জ্বালানি খাতের শতভাগ নিশ্চয়তা প্রদান করা। কিন্তু বাস্তবে এই তিনটি খাতের একটিতেও সফলতার মুখ দেখা যায়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং তা নিয়ে দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন এবং বলেন যে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আজ চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
দেশের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরেন। বর্তমান বাজারে হাত বাড়ালেই আগুন, যেখানে প্রতি কেজি সাধারণ সবজির দাম আশি টাকার নিচে কোনোভাবেই পাওয়া যাচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। আমিষের চাহিদা মেটানোর প্রধান উপাদান ডিমের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি পেয়ে সাধারণ ক্রেতাদের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে এবং প্রধান খাদ্য চালের দামও প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রধান পছন্দ মিনিকেট চালসহ বিভিন্ন চালের চড়া মূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। খোলা বাজারে সরকারের ভর্তুকিমূল্যে বিক্রয়কৃত টিসিবির পণ্য সংগ্রহ করার জন্য প্রতিদিন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেশের অর্থনৈতিক সংকটের প্রকৃত চিত্রকেই ফুটিয়ে তোলে বলে তিনি তার বক্তব্যে জোরালোভাবে মন্তব্য করেন।
পরিশেষে বলা যায় যে, জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার এই সাবলীল ও কঠোর সমালোচনা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি জ্বলন্ত দলিল হয়ে রয়েছে। সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের তরফ থেকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে জনদুর্ভোগ আরও বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। সংসদের ভেতরে বিরোধী কণ্ঠের এমন জোরালো উপস্থিতি দেশের গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে এবং নীতিনির্ধারকদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। জনগণের মৌলিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানের মাধ্যমেই কেবল একটি বৈষম্যহীন ও শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব—এটাই আজকের দিনে আমাদের সকলেরকান্ত প্রত্যাশা।
প্রতিবেদনের সূত্র: জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও সংবাদ মাধ্যম।

সুন্দর পোস্ট
উত্তরমুছুনএকটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।