প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হবেন অভিভাবকতুল্য, যিনি পরম স্নেহ ও মমতায় শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলবেন—এটিই স্বাভাবিক সামাজিক ও নৈতিক প্রত্যাশা। তবে মাঝে মাঝেই এমন কিছু নৃশংস ও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর সামনে আসে, যা পুরো সমাজব্যবস্থা ও শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায় একটি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়া মুখস্ত করতে না পারায় এক শিশু শিক্ষার্থীর ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতনের মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকের উপর্যুপরি প্রহারে শিশুটির মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে গেছে বলে ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে দাবি করা হয়েছে। ঘটনাটি কেন্দ্র করে স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দা ও সংবাদ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ঘটনাটি ঘটেছে মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার দয়হাটা এলাকার 'বাগে নুরানীয়া হাফেজীয়া মাদ্রাসা'য়। ভুক্তভোগী শিশুটি উক্ত প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত শিক্ষার্থী। অভিযোগ অনুযায়ী, শ্রেণিকক্ষে নির্ধারিত পড়া বলতে না পারায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। প্রাথমিক পর্যায়ে বেত দিয়ে শিশুটিকে বেধড়ক পেটানো হয়। একপর্যায়ে শিশুটি মাটিতে পড়ে গেলে উক্ত শিক্ষক তাকে উপুর্যুপরি লাথি মারতে থাকেন বলে অভিযোগ করা হয়।
সহিংস এই শারীরিক প্রহারের ফলে শিশুটি মারাত্মক শারীরিক আঘাত প্রাপ্ত হয় এবং তার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায়। প্রচণ্ড ব্যথায় শিশুটি আর্তনাদ করে কান্নাকাটি শুরু করলে অভিযুক্ত শিক্ষক মানবিক আচরণের বদলে আরও কঠোর রূপ ধারণ করেন। তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, 'যত বেশি কাঁদবি, তত বেশি মারা হবে।' ফলে চরম যন্ত্রণা ও ভীতিতে আচ্ছন্ন হয়ে অবুঝ শিশুটি নিজের কান্না চেপে রাখতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে বিষয়টি প্রকাশ পায় এবং স্বজনরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
আরও পড়ুন: টাঙ্গাইলে বিশ্বরেকর্ড গড়া ২০১ গম্বুজ মসজিদ: স্থাপত্যের এক অনন্য বিস্ময়
অভিযোগ নিয়ে গেলে অভিভাবককে হেনস্তার দাবি
ঘটনার পর ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবারের সদস্যরা এবং অন্যান্য কয়েকজন অভিভাবক বিষয়টি নিয়ে মাদ্রাসার প্রধান হুজুর বা দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ জানাতে যান। কিন্তু সুবিচারের আশায় গিয়ে তারা উল্টো অসৌজন্যমূলক আচরণের শিকার হন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিভাবকদের দাবি, প্রধান শিক্ষক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এই ঘটনার সুরাহা না করে উল্টো অভিভাবকদেরই নানাভাবে হেনস্তা করেন এবং বিষয়টি চেপে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
স্থানীয় অন্যান্য অভিভাবকদের সাথে কথা বলে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক জানান, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগেও অন্য এক শিক্ষার্থীর কাটা হাতে একই ধরনের নির্মম আঘাত করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিবেশ ও কিছু শিক্ষকের অতিরিক্ত কড়াকড়ি নিয়ে অনেক দিন ধরেই ভেতরে ভেতরে অসন্তোষ বিরাজ করছিল, যা এই ঘটনার মাধ্যমে প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে।
শিক্ষায় শারীরিক নির্যাতনের মানসিক ও শারীরিক প্রভাব
মনোবিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের মতে, শৈশবে এ ধরনের নিষ্ঠুর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন একজন শিশুর বিকাশকে চিরতরে ব্যাহত করে দিতে পারে। এতে শুধু যে শারীরিক ক্ষতি বা পঙ্গুত্ব বরণের ঝুঁকি থাকে তা নয়, বরং মানসিক ট্রমা সৃষ্টি হয় যা সারাজীবন তাকে তাড়া করে বেড়ায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভীতিজনক পরিবেশ থাকলে তা শিশুদের স্বাভাবিক মেধা বিকাশ ও পড়াশোনার প্রতি তীব্র অনাগ্রহ তৈরি করে।
আরও পড়ুন: ওমান উপকূলে তেলবাহী জাহাজে প্রজেক্টাইল হামলা, বিদ্যুৎ ও নিয়ন্ত্রণহীন ট্যাংকার
অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদদের মতে:
- মেধার বৈচিত্র্য অনুধাবন: প্রতিটি শিশুর শেখার গতি ও মেধা সমান নয়। একজন শিক্ষার্থী যে সময়ে পড়া মুখস্ত করতে পারবে, অন্য জন হয়তো সেই একই সময়ে তা পারবে না। শিক্ষকের কাজ হলো সহানুভূতির সাথে দুর্বল শিক্ষার্থীকে বোঝানো।
- আইনি নিষেধাজ্ঞা: সরকারি নির্দেশনানুযায়ী সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের ওপর যেকোনো ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইনের শাসন অমান্য করে হাত তোলা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়।
- মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি: শাসন মানে নির্যাতন নয়। কোমলমতি শিশুদের ভয়ের বদলে ভালোবাসার ছোঁয়ায় শিক্ষা দিতে হবে।
আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও করণীয়
অনেক সময় অভিভাবক বা সাধারণ মানুষ শিক্ষকের এই ধরনের আচরণকে 'শিশুর ভালোর জন্য' কিংবা 'ভুলবশত হয়ে গেছে' বলে মেনে নেওয়ার প্রবণতা দেখান। কিন্তু 'ভালো চাওয়া'র দোহাই দিয়ে একজন শিশুর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া কিংবা পঙ্গু বানিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। শিক্ষক সমাজকে বুঝতে হবে, শৃঙ্খলা আর শারীরিক নৃশংসতা এক জিনিস নয়।
শ্রীনগরের এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে নিরপেক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। ভবিষ্যতে যেন কোনো কোমলমতি শিক্ষার্থীকে এমন নৃসংশতার শিকার না হতে হয়, সেজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থার দাবি জানানো হচ্ছে। মাদ্রাসা কিংবা সাধারণ স্কুল—সর্বত্রই গড়ে তুলতে হবে শতভাগ নির্যাতনমুক্ত ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ।
সংবাদ সূত্র: স্থানীয় জনঅভিযোগ ও প্রাথমিক পারিবারিক বিবরণী থেকে সংগৃহীত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।