প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
চীন ও নেপালের সংবেদনশীল সীমান্তসংলগ্ন তিব্বতের দুর্গম গিরং এলাকায় পর্বত ধসের পর গড়ে ওঠা একটি বিপজ্জনক কৃত্রিম হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ পুনরায় ভেঙে যাওয়ার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদে এক তীব্র ও আকস্মিক প্রলয়ংকরী বন্যার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির চরম অবনতি ও নতুন করে প্লাবনের ঝুঁকির বিষয় বিবেচনা করে দুর্ঘটনাকবলিত এলাকায় নিয়োজিত সকল উদ্ধারকারী সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবী কর্মীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়েছে। আকস্মিক এই বাঁধ ভাঙার ঘটনা ইতোমধ্যে চলমান উদ্ধার প্রক্রিয়ায় চরম শঙ্কার সৃষ্টি করেছে, যা পুরো সীমান্ত অববাহিকার সার্বিক মানবিক পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও নাজুক করে তুলেছে।
আজ ২৮ আগস্ট ২০২৬ শুক্রবার চীন ও নেপালের দায়িত্বশীল সীমান্ত প্রশাসন যৌথ বিবৃতিতে এই অনাকাঙ্ক্ষিত অঘটন ও নদী স্ফীতির খবরের সত্যতা সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করেছে। সরকারি সূত্র থেকে জানানো হয়েছে যে, পাহাড়ি মাটির বিশাল স্তূপ ও কাদার ধসে তৈরি হওয়া ওই সাময়িক জলাধারের পার ভেঙে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত পানি হঠাৎ অতি দ্রুত গতিতে নদীর দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাবে সীমান্তবর্তী দুটি গুরুত্বপূর্ণ জলধারা—ভোটে কোশি এবং ত্রিশূলী নদীর পানির উচ্চতা অস্বাভাবিক গতিতে বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। দুটি নদীর পানির এই উন্মত্ত স্ফীতি নদী তীরবর্তী এলাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ দুর্ঘটনাস্থলে অবস্থানরত উদ্ধারকর্মীদের জীবনের জন্য চরম বিপদ ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: নেপাল-তিব্বত সীমান্তে প্রলয়ংকরী হিমবাহ ধসে ধস ও বন্যা, অজি সহায়তা ঘোষণা
উল্লেখ্য, গত বুধবার সংঘটিত প্রলয়ংকরী পাহাড়ি বিপর্যয় ও ভয়াবহ ভূমিধসের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই এই নতুন দুর্যোগের মুখে পড়ল সমগ্র সীমান্ত জনপদ। সপ্তাহের মাঝপথে হওয়া ওই স্মরণকালের ধ্বংসাত্মক তাণ্ডবে ইতোমধ্যে প্রায় ৪০০ মানুষের করুণ প্রাণহানি ঘটেছে। তাছাড়াও পাহাড় থেকে নেমে আসা বরফ ও কাদার ধ্বংসস্তূপের নিচে বিপুল সংখ্যক ঘরবাড়ি চাপা পড়ার কারণে এখনও ১,৪০০ জনেরও বেশি অধিবাসী ও পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ স্বজনদের আশায় যখন উদ্ধারকারী দলগুলো প্রতিকূল আবহাওয়ার মাঝে নিরলস পরিশ্রম চালিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই কৃত্রিম হ্রদটিতে নতুন করে এই প্লাবনের ঘটনা পুরো উদ্ধার তৎপরতাকে সাময়িকভাবে থমকে দিল।
নতুন করে পাহাড়ি ঢল ও প্লাবনের বাস্তব আশঙ্কার মুখে উদ্ধারকাজে নিয়োজিত কর্মীদের জীবন সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই লক্ষ্যে নিখোঁজদের অনুসন্ধান কার্যক্রম এবং উপদ্রুত জনপদে জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণের সকল প্রশাসনিক কাজ আপাতত সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। উদ্ধার কার্যক্রম তদারকিতে নিয়োজিত কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বয়ে চলা নদীগুলোর তলদেশ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল মুহূর্তেই প্লাবিত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি থাকায় কোনো অবস্থাতেই কর্মী ও উদ্ধারকারীদের জীবন বিপন্ন হতে দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে নদীর এই অস্বাভাবিক পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনাস্থলে নতুন করে কোনো উদ্ধার মিশন চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
আরও পড়ুন: উল্লাপাড়ায় পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ে গ্রাহকদের বিক্ষোভ, অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ
ভৌগোলিক বিন্যাসের দিক থেকে তিব্বতের এই গিরং সীমান্ত অঞ্চলটি অত্যন্ত খাড়া, দুর্গম ও ভূতাত্ত্বিকভাবে সংবেদনশীল অবস্থানের ওপর অবস্থিত। অতিবৃষ্টি বা ভূকম্পনের কারণে এখানকার পাহাড়ি ঢালে প্রায়শই ছোট-বড় ভূমিধসের ঘটনা ঘটে, যা নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহকে আটকে ভঙ্গুর জলাশয়ের সৃষ্টি করে। এসব কৃত্রিম জলাধারের বাঁধ যখন অতিরিক্ত পানির চাপে হঠাৎ ভেঙে পড়ে, তখন নিম্নাঞ্চলের নদীগুলোতে তীব্র গতিতে পাহাড়ি ঢল নেমে আসে। বর্তমানে ভোটে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর গতিপথ ধরে বরফগলা পানি যেভাবে তীব্র গতিতে ধেয়ে আসছে, তাতে নেপালের উত্তরের সীমান্ত জেলাগুলোর বেশ কয়েকটি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
নেপাল সরকারের প্রশাসনিক তরফ থেকে ইতোমধ্যেই নদীর অববাহিকাসংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার সাধারণ অধিবাসীদের দ্রুত নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সাথে নদী তীরবর্তী সংযোগ সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় নিয়োজিত ত্রাণ প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, একের পর এক দুর্যোগের কারণে দুর্ঘটনাকবলিত মানুষের মাঝে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধ পৌঁছানো এখন বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। সার্বিক নদী স্ফীতি ও পানির তীব্রতা কমলে তবেই স্থগিত হওয়া মূল উদ্ধার অভিযান ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে।
সূত্র: আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা ও সিএনএন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।