নেপাল-তিব্বত সীমান্তে প্রলয়ংকরী হিমবাহ ধসে ধস ও বন্যা, অজি সহায়তা ঘোষণা

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে প্রলয়ংকরী হিমবাহ ধসে ধস ও বন্যা, অজি সহায়তা ঘোষণা
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চ ভৌগোলিক সংবেদনশীল নেপাল ও তিব্বত সীমান্ত এলাকায় এক আকস্মিক ও প্রলয়ংকরী হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্টি হয়েছে নজিরবিহীন ও ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা। পাহাড়ি উচ্চতায় বিশাল বরফখণ্ড ধসে পড়ার পর নিমেষের মধ্যে আঞ্চলিক নদীগুলোর পানি অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়ে উপচে পড়ে এবং সংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করে। এতে করে নদী অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চরম ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে। পার্বত্য এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই আকস্মিক প্রকৃতির তাণ্ডবের ফলে সীমান্তসংলগ্ন বিস্তীর্ণ পাহাড়ি জনপদ, পর্যটন কেন্দ্র ও চলাচলের প্রধান সড়কগুলো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আকস্মিক ধস ও পাহাড়ি কাদা-পানির তোড়ে অসংখ্য ঘরবাড়ি, সেতু এবং গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক মুহূর্তের মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে, যা সমগ্র অঞ্চলকে এক অভূতপূর্ব মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

উদ্বেগজনক এই প্রাকৃতিক দূর্যোগের মাঝে নতুন করে বড় ধরণের উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে বেশ কিছু বিদেশি পর্যটকের নিখোঁজ হওয়ার হৃদয়বিদারক খবর। প্রাথমিক সূত্রের ওপর ভিত্তি করে জানা গেছে, আকস্মিক এই বিপর্যয় ঘটার সময় ওই দুর্গম সীমান্ত এলাকায় অবস্থানরত অন্তত ৩৯ জন অস্ট্রেলীয় নাগরিকের সাথে সমস্ত প্রকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র দফতর বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে এবং নিখোঁজ নাগরিকদের দ্রততম সময়ে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষের সাথে সার্বক্ষণিক বৈশ্বিক সমন্বয় রক্ষা করে চলেছে। হঠাৎ করে স্বজনদের সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর মধ্যে চরম দুশ্চিন্তা ও গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

আরও পড়ুন: কিশোরগঞ্জে গর্ভবতী নারীর পেটে লাথির অভিযোগ, সন্তানহানি

হিমালয় পাদদেশের এই ভয়াল প্রাকৃতিক তাণ্ডবে প্রাণহানির মোট সংখ্যা প্রতিনিয়ত আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক জরুরি সেবা ও স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বিধ্বংসী এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৯০ জনেরও বেশি মানুষের নিশ্চিত প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া আকস্মিক স্থানান্তর ও আশ্রয়হীন হয়ে পড়া হাজার হাজার স্থানীয় অধিবাসী এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভ্রমণ পিপাসু পর্যটক মিলিয়ে এখনও প্রায় ১,৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। পাহাড়ি কাদা, বরফ ও পাথরের বিশাল স্তূপের নিচে বহু মানুষ চাপা পড়ে থাকায় নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা সময়ের সাথে সাথে সংকীর্ণ হয়ে আসছে, যা উদ্ধারকারীদের জন্য চরম মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

দুর্যোগকবলিত দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি এবং বৈরী আবহাওয়া বর্তমান উদ্ধার কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধানতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিমালয় সংলগ্ন এলাকার প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, ঘন কুয়াশা, অবিরাম বৃষ্টিপাত এবং জায়গায় জায়গায় নতুন করে ভূমিধসের কারণে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার ও ভারী যন্ত্রপাতি চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। যোগাযোগের প্রধান পথঘাট ও পাহাড়ি সেতুগুলো তোড়ে ভেসে যাওয়ায় উদ্ধারকারী বিশেষ দলগুলোকে প্রাণহাতে নিয়ে পায়ে হেঁটে দুর্গম পথ অতিক্রম করে অকুস্থলে পৌঁছাতে হচ্ছে, যা জীবন রক্ষাকারী জরুরি সহায়তার গতিকে অনেকটাই শ্লথ করে তুলেছে।

আরও পড়ুন: বেড়ায় কালবেলা প্রতিনিধির ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে প্রাণনাশের হুমকির ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি

হিমবাহ ধসের পর উদ্ভূত মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ ও শোক প্রকাশ করেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। এই বিশাল আকস্মিক মানবিক বিপর্যয় সফলভাবে মোকাবিলা করা এবং দুর্গত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে ৫ মিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলারের একটি বিশেষ মানবিক সহায়তা প্যাকেজ উন্মোচন করা হয়েছে। ক্যানবেরার পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে জানানো হয়েছে যে, দুর্যোগের এই কঠিন মুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে জীবন রক্ষাকারী সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ দায়িত্ব।

অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং এক প্রাতিষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে ঘোষিত এই সাহায্য তহবিলের সুনির্দিষ্ট বণ্টন ব্যবস্থা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, সহায়তার সিংহভাগ অর্থ জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি অর্থাৎ ডব্লিউএফপি (WFP) এবং বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত প্রধান মানবিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে দুর্গতদের মাঝে বিতরণ করা হবে। অতি দুর্গম এই দূর্যোগকবলিত অঞ্চলে গৃহহীন হয়ে পড়া হাজার হাজার মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য, নিরাপদ বিশুদ্ধ খাবার পানি, জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ এবং অস্থায়ী নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ নিশ্চিত করতে এই বিপুল অর্থ সরাসরি ব্যবহার করা হবে।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পরিবেশবিদ ও জলবায়ু বিশ্লেষকরা এই ধরণের আকস্মিক ও প্রলয়ংকরী হিমবাহ ধসকে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব হিসেবে দেখছেন। পর্বত অঞ্চলের সংবেদনশীল হিমবাহগুলো সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত গলে যাওয়ার কারণে উচ্চ পার্বত্য হ্রদগুলোতে পানির চাপ বিপজ্জনক সীমার ওপর পৌঁছে যাচ্ছে। এর ফলে এ জাতীয় আকস্মিক জলস্ফীতি বা গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (GLOF)-এর মারাত্মক ঝুঁকি বহু গুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা হিমালয় পরিবেশ ব্যবস্থার ওপর এক দীর্ঘমেয়াদী হুমকি সৃষ্টি করেছে।

নেপাল ও তিব্বতের সীমান্ত এলাকাটিতে বর্তমানে বৈশ্বিক বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থা, সশস্ত্র বাহিনী ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা সম্মিলিতভাবে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছেন। ধ্বংসস্তূপ সরাতে এবং নিখোঁজ নাগরিকদের অবস্থান নিশ্চিত করতে আধুনিক স্যাটেলাইট ও ড্রোন প্রযুক্তির সাহায্য গ্রহণ করা হচ্ছে। অস্ট্রেলীয় সরকার নিশ্চিত করেছে যে, তাদের নাগরিকদের সুনির্দিষ্ট সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত এবং দুর্গত এলাকার সার্বিক পুনর্নির্মাণ কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্তর্জাতিক ত্রাণ তৎপরতায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যাবে।

সূত্র: আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা ও সিএনএন।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন