প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া অন্যতম প্রধান ব্যাধি হলো মাদকদ্রব্যের অবাধ বিস্তার এবং এর যত্রতত্র অপব্যবহার। মাদকের এই ভয়াল ও কালো থাবা থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে নিয়মিতভাবে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালিত হয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী ও জনবহুল ত্রিশাল উপজেলা এলাকায় মাদকবিরোধী কার্যক্রমে এক বড় ধরনের সফলতা অর্জিত হয়েছে। স্থানীয় সচেতন জনতা এবং প্রশাসনের কঠোর নজরদারির ফলে সম্প্রতি ত্রিশাল পৌরসভার অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে মাদক সেবনের সুনির্দিষ্ট অপরাধে হাতেনাতে দুষ্কৃতকারীদের আটক করা হয়েছে। পরবর্তীতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে সেই অপরাধীদের তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ শাস্তি প্রদান করা হয়েছে, যা স্থানীয় অপরাধ জগতে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। মাদক নির্মূলের এই ধরনের সাহসী পদক্ষেপগুলো সমাজকে কলুষমুক্ত করতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করছেন এলাকার বিশিষ্টজনেরা।
আরও পড়ুন: ভাঙ্গায় বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে নিয়ে ছোট ভাইয়ের পলায়ন ও থানায় সংঘর্ষ
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সূত্রে জানা গেছে যে, গত শনিবার সন্ধ্যার ঠিক প্রাক্কালে, যখন ঘড়ির কাঁটায় প্রায় সন্ধ্যা ছয়টা বাজছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে ময়মনসিংহের ত্রিশাল পৌরসভার অত্যন্ত পরিচিত ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মন্ডলবাড়ী নামক এলাকায় আকস্মিক এই অভিযানটি পরিচালিত হয়। ওই এলাকার স্থানীয় কিছু সচেতন বাসিন্দা দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করছিলেন যে, কিছু বখাটে ও মাদকাসক্ত যুবক দিনের বিভিন্ন সময়ে এবং সন্ধ্যার পর ওই এলাকায় লুকিয়ে মাদকদ্রব্য সেবন করে আসছিল, যা এলাকার শান্ত পরিবেশ ও কোমলমতি শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। স্থানীয় সাধারণ মানুষ চরম ক্ষুব্ধ হয়ে এই অপকর্ম প্রতিহত করার জন্য নিজেদের উদ্যোগে একটি শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং ওই মাদকসেবীদের গতিবিধি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। পরবর্তীতে শনিবার সন্ধ্যায় যখন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বরাবরের মতো মন্ডলবাড়ী এলাকায় বসে মাদক সেবনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল কিংবা সেবন করছিল, তখন সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে স্থানীয় জনতা তাদের ঘিরে ফেলেন এবং পালিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ না দিয়ে দ্রুত তাদের আটক করতে সক্ষম হন।
স্থানীয় জনতা কর্তৃক হাতেনাতে আটক হওয়া এই দুই ব্যক্তির অপরাধের মাত্রা নিশ্চিত করার পর তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি ত্রিশাল উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়, যাতে তাৎক্ষণিক বিচারকার্য সম্পন্ন করা যায়। পরবর্তীতে পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তায় আটককৃতদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয় এবং জানা যায় যে তাদের বাড়িও ত্রিশাল পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডের ভেতরেই অবস্থিত। সাজাপ্রাপ্ত এই দুজন ব্যক্তির মধ্যে একজনের নাম আতিকুর রহমান, যাঁর বয়স ৩২ বছর এবং তাঁর পিতার নাম মোখলেছুর রহমান; এই অভিযুক্ত ব্যক্তি ত্রিশাল পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের স্থায়ী বাসিন্দা বলে জানা গেছে। অপর অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম সোহান, যাঁর বয়স মাত্র ১৯ বছর এবং তিনি পৌর এলাকারই অন্য একটি নিভৃত স্থানে বসবাস করেন। অল্প বয়সের এই যুবকেরা মাদকের মরণ নেশায় আসক্ত হয়ে কীভাবে নিজেদের জীবন ধ্বংসের পাশাপাশি সমাজের শান্তি শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করছিল, তা দেখে ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
আটক করার পর পরই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য এবং অপরাধের উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করতে ত্রিশাল উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে প্রাপ্ত বিস্তারিত তথ্যানুযায়ী, অপরাধের ধরন এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আদালত দুই আসামির জন্য ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদে শাস্তির রায় ঘোষণা করেন। তরুণ বয়সের অভিযুক্ত সোহানকে মাদক সেবনের তীব্রতা এবং অপরাধের গভীরতা বিবেচনা করে তিন মাসের কঠোর বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয় এবং এর পাশাপাশি তাকে চার হাজার টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত করা হয়। অন্যদিকে, তুলনামূলক বয়স্ক অপর অভিযুক্ত আতিকুর রহমানকে পনেরো দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং পাঁচশত টাকা নগদ অর্থদণ্ড প্রদান করা হয় ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারিক রায়ের মাধ্যমে। এই তাৎক্ষণিক ও সময়োপযোগী বিচারিক রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে এলাকার মাদকসেবীদের মনে কঠোর বার্তার সঞ্চার হয়েছে, যা ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে অন্যদের দূরে রাখতে বাধ্য করবে।
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি যাওয়া মোটরসাইকেল উদ্ধার করল পুলিশ
এই পুরো ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও বিচারিক কার্যক্রম অত্যন্ত সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছেন ত্রিশাল উপজেলার সহকারী কমিশনার ভূমি এবং একই সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবুর রহমান। তিনি নিজে উপস্থিত থেকে সমগ্র অভিযানটি তদারকি করেন এবং আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবুর রহমান এই সফল অভিযানের নেপথ্য কারণ ব্যাখ্যা করে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, সাধারণ এলাকাবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা এবং সময়মতো তথ্য দেওয়ার কারণেই মূলত এই অপরাধীদের হাতেনাতে আটক করা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দেশে প্রচলিত বলবৎকৃত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সুনির্দিষ্ট ধারাসমূহ প্রয়োগ করেই এই দুজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও আর্থিক জরিমানা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এমন কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতেও অপ্রীতিকর ঘটনা রোধে এবং মাদক ব্যবসা ও সেবন নির্মূল করার ক্ষেত্রে অব্যাহত থাকবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
মাদক সেবনের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এই সাজা প্রদানের সংবাদটি মুহূর্তের মধ্যে ত্রিশাল পৌরসভা এলাকা ছাড়িয়ে পুরো ময়মনসিংহে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় সাধারণ মানুষ, অভিভাবক এবং সামাজিক সংগঠনের কর্মীরা প্রশাসনের এই দ্রুত পদক্ষেপকে অত্যন্ত সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, পুলিশ ও প্রশাসনের একার পক্ষে সম্পূর্ণ সমাজ থেকে মাদক দূর করা কঠিন, যদি না সাধারণ মানুষ এইভাবে একত্রিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মন্ডলবাড়ী এলাকার মতো জনবহুল স্থানে এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের রুখে দাঁড়ানো এবং প্রশাসন কর্তৃক তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার এই ঘটনাটি অন্যান্য এলাকার যুবসমাজকেও সৎ পথে ফিরিয়ে আনতে এবং অপরাধ থেকে দূরে রাখতে দারুণভাবে উৎসাহিত করবে। ত্রিশাল থানা পুলিশ জানিয়েছে যে, এই ধরনের মাদকবিরোধী অভিযান আগামীতেও নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকবে এবং কেউ যদি আইন অমান্য করে মাদক ব্যবসা বা সেবনের সঙ্গে জড়িত থাকে, তবে তাকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।
পরিশেষে বলা যায় যে, ময়মনসিংহের ত্রিশালে মাদক সেবনের অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দুজনকে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়ার এই ঘটনাটি সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যুবসমাজকে রক্ষা করতে হলে মাদকের বিরুদ্ধে এভাবেই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং সামাজিকভাবেও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। স্থানীয় জনতা ও প্রশাসনের এমন সম্মিলিত ও কার্যকর প্রচেষ্টার ফলেই কেবল একটি মাদকমুক্ত, শান্তিপূর্ণ এবং নিরাপদ সমাজ গঠন করা সম্ভবপর হতে পারে। আমরা আশা করি ত্রিশালের এই সফল অভিযান দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, যাতে আমাদের আগামী প্রজন্ম একটি সুন্দর ও সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠার পূর্ণ সুযোগ লাভ করতে পারে।
প্রতিবেদনের সূত্র: উপজেলা প্রশাসন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।