প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণী অবৈধভাবে পাচার করার একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এক মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা হালুয়াঘাটে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের একটি বিশেষ দল সফল অভিযান চালিয়ে অত্যন্ত সংকটজনক পরিস্থিতি থেকে দুটি দুর্লভ লজ্জাবতী বানর উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। বাজার করার সাধারণ একটি পলিথিন বা কাপড়ের ব্যাগের ভেতরে অত্যন্ত নির্মমভাবে বন্দি করে এই নিরীহ প্রাণীগুলোকে পাচার করার চেষ্টা করা হচ্ছিল। যদিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বন বিভাগের তৎপরতার কারণে প্রাণীগুলোকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তবে চতুর পাচারকারীরা অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে আগেভাগেই পালিয়ে যাওয়ায় তাদের তাৎক্ষণিকভাবে আটক করা যায়নি। বন্যপ্রাণী রক্ষায় প্রশাসনের এই ধরনের কঠোর নজরদারি এবং অভিযান স্থানীয় সচেতন মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে এবং চোরাকারবারীদের মনে ভীতি সঞ্চার করেছে।
আরও পড়ুন: ত্রিশালে মাদক সেবনের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে দুজনকে কারাদণ্ড
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে বন অধিদপ্তর ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে যে, গত শুক্রবার বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের কাছে অত্যন্ত গোপনীয় ও নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র থেকে বিশেষ সংবাদ এসে পৌঁছায়। সেই তথ্যে জানানো হয়েছিল যে, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট অঞ্চলের আন্তর্জাতিক সীমান্তবর্তী ভূখণ্ড ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র কিছু বিরল বন্যপ্রাণী দেশের অন্য কোনো অঞ্চলে পাচার করার উদ্দেশ্যে নিয়ে আসছে। এই গোপন সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি আমলে নেন এবং একটি বিশেষ অভিযান দল গঠন করেন। গঠিত এই দলটিকে অবিলম্বে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট এলাকার দিকে যাত্রা করার নির্দেশ দেওয়া হয়, যাতে পাচারকারীরা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার আগেই তাদের পাকড়াও করা সম্ভব হয়। গোপন সেই তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার সারাদিন ধরে হালুয়াঘাট ও এর আশেপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছিল, যার ফলে অপরাধীদের গতিবিধি অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করে।
অভিযানের মূল অংশটি পরিচালিত হয়েছিল হালুয়াঘাট ও ময়মনসিংহের সংযোগকারী অত্যন্ত ব্যস্ততম আঞ্চলিক মহাসড়কের হালুয়াঘাট বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায়, যা চোরাকারবারীদের ট্রানজিট রুট হিসেবে পরিচিত। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের অভিজ্ঞ বন পরিদর্শক অসীম মল্লিকের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে এবং নির্দেশনায় ওই বিশেষ দলটির সদস্যরা শুক্রবার নির্ধারিত বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অবস্থান গ্রহণ করেন। গোয়েন্দা সূত্রে তারা পূর্বেই জানতে পেরেছিলেন যে, বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে কোনো একটি দূরপাল্লার বা স্থানীয় যাত্রীবাহী বাসে তুলে এই বন্যপ্রাণীগুলো অন্য কোথাও পাচার করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেই তথ্যের সত্যতা যাচাই করার জন্য সাদা পোশাকে এবং অত্যন্ত সুকৌশলে পুরো বাসস্ট্যান্ড চত্বর ঘিরে ফেলেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা। সাধারণ যাত্রীদের ভিড়ের আড়ালে থেকে তারা প্রতিটি বাস এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন, যাতে অপরাধীরা কোনোভাবেই তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ না পায়।
আরও পড়ুন: পুঠিয়ায় অবৈধ সার মজুতের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা ও সার জব্দ
কিন্তু চোরাকারবারী চক্রটি অত্যন্ত চতুর হওয়ায় তারা হয়তো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতির বিষয়টি দূর থেকেই কোনোভাবে টের পেয়ে যায় অথবা তাদের নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে বিষয়টি সম্পর্কে আগেভাগেই সতর্ক হয়ে পড়ে। অভিযানের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে ওই পাচারকারীরা আইন প্রয়োগকারী দলের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের সঙ্গে থাকা incriminating আলামতগুলো সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। তারা দেখতে পায় যে বন্যপ্রাণীসহ পুলিশের জালে ধরা পড়ার উপক্রম হয়েছে, ঠিক তখনই তারা বাসস্ট্যান্ডের ঠিক পাশেই অবস্থিত একটি নিঝুম ও পরিত্যক্ত ঘরের সামনে গিয়ে উপস্থিত হয়। অত্যন্ত নির্মম ও অমানবিক কায়দায় বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বহন করার একটি সাধারণ ব্যাগের ভেতরে বন্দি করে রাখা হয়েছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল সেই দুটি লজ্জাবতী বানরকে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পাচারকারীরা সেই বাজারের ব্যাগটি ওই পরিত্যক্ত ঘরের সামনে মাটির ওপরে বা কোনো এক কোণায় সজোরে ফেলে রেখে দ্রুত অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে বা জনাকীর্ণ পরিবেশের ভিড়ে মিশে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
পরবর্তীতে স্থানীয় সাধারণ মানুষ এবং উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের স্বতঃস্ফূর্ত সহায়তায় বন বিভাগের অভিযানিক দলের সদস্যরা ওই পরিত্যক্ত ঘরের সামনে পড়ে থাকা সন্দেহজনক ব্যাগটি দ্রুত উদ্ধার করেন। স্থানীয় লোকজনের কৌতুহলী চোখের সামনে যখন সেই বাজারের ব্যাগটির মুখ অত্যন্ত সাবধানে খোলা হয়, তখন ভেতরের দৃশ্য দেখে সবাই শিউরে ওঠেন এবং বন্যপ্রাণীগুলোর প্রতি এই নিষ্ঠুরতার তীব্র নিন্দা জানান। ব্যাগের ভেতরে অত্যন্ত আতঙ্কিত ও অবরুদ্ধ অবস্থায় নড়াচড়া করতে অক্ষম দুটি দুর্লভ লজ্জাবতী বানরকে দেখতে পাওয়া যায়। দীর্ঘক্ষণ ধরে বাতাস চলাচল করতে না পারা একটি সংকীর্ণ ব্যাগের ভেতর বন্দি থাকার কারণে প্রাণী দুটি চরম কষ্ট পেয়েছিল এবং তাদের শারীরিক অবস্থাও বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বন পরিদর্শক অসীম মল্লিকের নেতৃত্বে থাকা দলটি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে ব্যাগ থেকে প্রাণী দুটিকে মুক্ত করেন এবং তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে প্রাথমিক শুশ্রূষা ও খাবার পানির ব্যবস্থা করেন, যা তাদের প্রাণ বাঁচানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি ছিল।
উদ্ধার অভিযান সফলভাবে সমাপ্ত হওয়ার পর বন পরিদর্শক অসীম মল্লিক গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে পুরো ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য প্রদান করেন। তিনি জানান যে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালানো এই আকস্মিক অভিযানে দুটি অত্যন্ত অমূল্য লজ্জাবতী বানর উদ্ধার করা সম্ভব হলেও পাচারকারীরা দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার কারণে তাদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা যায়নি। তিনি আরও অত্যন্ত জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, হালুয়াঘাট এলাকাটি একটি স্পর্শকাতর ভারত সীমান্তবর্তী জনপদ হওয়ার কারণে এই রুটটি ব্যবহার করে প্রায়শই বিভিন্ন ধরনের বন্যপ্রাণী, পাখি এবং মূল্যবান সামগ্রী অবৈধভাবে পাচার করার অপচেষ্টা চালিয়ে থাকে আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রগুলো। এই ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড কঠোর হাতে দমন করার জন্য সীমান্ত এলাকায় বন বিভাগ এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। বন্যপ্রাণী শিকার করা, নিজ হেফাজতে রাখা, বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাচার বা কেনাবেচা করা দেশের প্রচলিত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে অত্যন্ত গুরুতর ও দণ্ডনীয় অপরাধ বলে তিনি সতর্ক করে দেন।
উদ্ধারকৃত এই দুটি লজ্জাবতী বানরকে বর্তমানে বন বিভাগের নিরাপদ হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, প্রাণীগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করার পর তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল বা কোনো গভীর সংরক্ষিত বনে সুরক্ষিতভাবে অবমুক্ত করার প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা খুব শীঘ্রই গ্রহণ করা হবে। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত মূল পাচারকারীদের শনাক্ত করার জন্য গোয়েন্দা কার্যক্রম ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে এবং স্থানীয় লোকজনকে এই ধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। পরিশেষে বলা যায় যে, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে বাজারের ব্যাগ থেকে লজ্জাবতী বানর উদ্ধারের এই ঘটনা আমাদের প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী রক্ষার লড়াইয়ে বন বিভাগের দায়িত্বশীল ভূমিকারই এক অনন্য প্রতিফলন, যা বন্যপ্রাণী পাচার রোধে একটি শক্ত বার্তা প্রদান করেছে।
প্রতিবেদনের সূত্র: বন অধিদপ্তর ও বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।