পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে চুক্তি, আইডিবি দিচ্ছে ১২,৩০০ কোটি টাকা

পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে চুক্তি, আইডিবি দিচ্ছে ১২,৩০০ কোটি টাকা
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত দেশের একচ্ছত্র ও একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)’-এর দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপন ও তেল শোধন সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে চূড়ান্ত এক মেগা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক মূল প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রামে ১৯৬৮ সালে প্রথম শোধনাগারটির যাত্রা শুরু হওয়ার দীর্ঘ ৫৮ বছর পর এই যুগান্তকারী মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। সময়ের আবর্তে দেশের শিল্পায়ন, পরিবহন ব্যবস্থা ও জ্বালানি ব্যবহারে যে অভূতপূর্ব গতি এসেছে, তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে পতেঙ্গার এই ঐতিহাসিক শোধনাগারটির পরিসর বৃদ্ধি ছিল অত্যন্ত জরুরি। অবশেষে বহু বছরের কূটনৈতিক ও কৌশলগত চেষ্টার পর এই প্রকল্প বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে, যা সমগ্র দেশের জ্বালানি খাতের চেহারা পাল্টে দেবে।

আরও পড়ুন: কলাপাড়ায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পুকুরে ট্যুরিস্ট বাস, আহত ১৩

মেগা প্রকল্পটির অর্থায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন উন্নয়ন সংস্থা ‘ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি)’-এর সাথে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১২,৩০০ কোটি টাকা) এক ইতিহাস সৃষ্টিকারী ঋণ চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রত্যক্ষ অধীনে পরিচালিত এই আন্তর্জাতিক ঋণ সুবিধার মাধ্যমে পতেঙ্গায় প্রস্তাবিত নতুন শোধনাগার ইউনিটের জটিল কারিগরি যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং সর্বাধুনিক অবকাঠামো নির্মাণকাজ বিপুল উদ্যমে শুরু হবে। এর ফলে প্রকল্পটির মূল আর্থিক অনিশ্চয়তা সম্পূর্ণ দূর হলো বলে নিশ্চিত করেছেন নীতি নির্ধারকেরা।

উৎপাদন সক্ষমতার প্রসারের দিক থেকে নতুন নির্মিতব্য এই দ্বিতীয় শোধনাগারটি বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে। কারিগরি নকশা অনুযায়ী, কেবল এই দ্বিতীয় ইউনিটটির একক বার্ষিক তেল শোধন সক্ষমতা হবে ৩০ লাখ মেট্রিক টন। বর্তমানে সচল থাকা একমাত্র পুরনো শোধনাগারটির বার্ষিক সর্বোচ্চ তেল শোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ মেট্রিক টন। ফলশ্রুতিতে, নতুন প্রকল্পটির নির্মাণকাজ সমাপ্ত হলে ইস্টার্ন রিফাইনারির সর্বমোট বার্ষিক তেল শোধন করার সামর্থ্য তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হবে, যা পতেঙ্গাকে পুরো দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শোধনাগার হাবে উন্নীত করবে।

আরও পড়ুন: লোডশেডিং দ্রুত কমার আশা: বিদ্যুৎ ব্যবহারে থাকবে সুষম বণ্টন

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষায় এই মেগা প্রকল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। বিপিসির কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০ ৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রকল্প চালু হলে বাংলাদেশের বাৎসরিক মোট জ্বালানি তেলের প্রয়োজনীয়তার প্রায় ৫০ শতাংশ বা অর্ধেক অংশ অভ্যন্তরীণভাবে দেশেই মেটানো সহজতর হবে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রস্তুতকৃত দামি পরিশোধিত তেল আমদানির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা কমে আসবে, যার ফলে প্রতি বছর জাতীয় কোষাগারের বিপুল পরিমাণ অর্থাৎ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা অলৌকিক সাশ্রয় সম্ভব হবে।

চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় এই আধুনিক দ্বিতীয় ইউনিটটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উচ্চ গুণমানসম্পন্ন ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও জেট ফুয়েল তৈরি নিশ্চিত হবে। এতে শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং নিত্যদিনের পরিবহনে জ্বালানি সংকট দূর হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রযুক্তিবিদ, প্রকৌশলী ও বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি করবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ। চট্টগ্রামের শিল্প ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারে সঠিক দক্ষতার পরিচয় দেবে এই আধুনিক রিফাইনিং হাব।

পরিশেষে, পরিবেশবান্ধব উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সরবরাহে ইস্টার্ন রিফাইনারির এই দ্বিতীয় ইউনিট এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করবে। জ্বালানি আমদানির বিশাল অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ যে স্বাবলম্বী ও মজবুত অর্থনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে, এই মেগা প্রকল্পটি তারই এক অনন্য প্রতীক। চট্টগ্রামের পতেঙ্গার মাটিতে রচিত এই ঐতিহাসিক উন্নয়ন পদক্ষেপ দেশের শিল্প খাত ও জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে আগামী দিনে বহু দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।

সূত্র: বিপিডি ও জ্বালানি বিভাগ।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন