ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি, ২১ জুলাই ২০২৬:
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলায় প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে বাকবিতণ্ডা ও তর্কের একপর্যায়ে মুখে ‘তালাক’ শব্দ শোনার পর তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় ফারজানা আক্তার (১৯) নামের এক তরুণী গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছেন। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে আশুগঞ্জ উপজেলার নাওঘাট এলাকার মোহন মিয়ার বাগানবাড়ি নামক স্থানে এ হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে।
নিহত ফারজানা আক্তার আশুগঞ্জ সদরের নাওঘাট পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মিন্টু মিয়ার মেয়ে। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় চার বছর আগে পারিবারিকভাবেই একই এলাকার আমান উল্লাহর ছেলে প্রবাসী সাচ্চু মিয়ার (২৭) সাথে ফারজানার শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয়। দাম্পত্য জীবনে তাঁদের তিন বছর বয়সী একটি পুত্রসন্তান রয়েছে। নিহতের স্বামী বর্তমানে সৌদি আরবে কর্মরত রয়েছেন।
আরও পড়ুন: নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো শতবর্ষী রহিতনের পাশে শাহজাদপুর উপজেলা প্রশাসন!
মোবাইল ফোনের কল ও ট্র্যাজেডির বিবরণ
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকালের দিকে দূরপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব থেকে স্বামী সাচ্চু মিয়া স্ত্রীর মুঠোফোনে কল করেন। কথা বলার একপর্যায়ে তাদের মধ্যে পারিবারিক নানা বিষয় নিয়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুরু হয়। বাকবিতণ্ডার চরম পর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে স্বামী সাচ্চু মিয়া ফোনে স্ত্রীকে ‘তালাক’ প্রদান করেন।
দূরপরবাসের স্বামীর মুখে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত কথা শোনার পর তীব্র অভিমানে ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তরুণী ফারজানা। পরবর্তীতে ঘরের সকলের অগোচরে শয়নকক্ষের টিনের চালের রডের সঙ্গে নিজের ওড়না পেঁচিয়ে ফাঁসি দেন তিনি। স্বজনেরা বিষয়টি বুঝতে পেরে তাঁকে ঝুলন্ত অবস্থা থেকে উদ্ধার করে দ্রুত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসাকর্তৃক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
পিতার গুরুতর অভিযোগ ও পারিবারিক অশান্তি
ঘটনার পর নিহতের বাবা মিন্টু মিয়া ক্ষোভ ও কান্নাভেজা কণ্ঠে জামাতা ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি জানান:
- সন্দেহ প্রবণতা: বিয়ের পর থেকেই ফারজানার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন সাময়িক বন্ধ থাকলে কিংবা ব্যাস্ত থাকলে স্বামী সাচ্চু মিয়া ভিত্তিহীন সন্দেহ প্রকাশ করতেন। এই অহেতুক অবিশ্বাস নিয়ে দম্পতির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছিল।
- তালাক প্রদান: মঙ্গলবার মোবাইল সংলাপে জামাতা সরাসরি ফারজানাকে 'দুই তালাক' দেওয়ার কথা বলেন, যা সহ্য করতে না পেরে ফারজানা এই চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
- মানসিক নির্যাতন: শ্বশুরবাড়ির স্বজন ও স্বামীর অযাচিত মানসিক চাপ এবং সন্দেহপ্রবণ আচরণই তাঁর কন্যাসন্তানকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে বাবা দাবি করেন এবং এই ঘটনার সুসংহত ও সঠিক তদন্তের মাধ্যমে বিচার দাবি জানান।
আইনশৃঙ্খলার পদক্ষেপ ও পুলিশের বক্তব্য
মর্মান্তিক এই আত্মহননের খবর পেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানা পুলিশ হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে লাশের প্রাথমিক আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
আরও পড়ুন: রায়গঞ্জে খেলা নিয়ে বিরোধে ইলিয়াস হত্যা: মামলা দায়ের, গ্রেপ্তার ২ আসামি!
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম জানান, স্বামীর ওপর অভিমান করে গৃহবধূর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। মরদেহ উদ্ধার করে হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের কার্যক্রম শেষ করা হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিহতের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
যেহেতু অঘটনটি আশুগঞ্জ থানা এলাকার অন্তর্ভুক্ত, সেহেতু প্রাথমিক তথ্য ও সুরতহাল রিপোর্টের অনুলিপি আশুগঞ্জ থানা পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে এবং মামলা বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সংবাদ সূত্র: ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানা পুলিশ ও ভুক্তভোগী পরিবারের বক্তব্য।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।