প্রমত্তা যমুনা নদীর সর্বগ্রাসী ও রূঢ় রূপ সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার চরাঞ্চলজুড়ে যে হাহাকার তৈরি করেছে, তার নির্মম শিকার হয়েছেন শতবর্ষী বৃদ্ধা রহিতন নেছা। নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব ও আশ্রয়হীন হয়ে পড়া সোনাতনী ইউনিয়নের ধীতপুর গ্রামের এই করুণ দশার বৃদ্ধার পাশে এবার সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে শাহজাদপুর উপজেলা প্রশাসন। সরকারি মানবিক সহায়তার মাধ্যমে মাথা গোঁজানোর স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজে পেয়েছেন এই অসহায় প্রবীণ নাগরিক।
সম্প্রতি যমুনার অব্যাহত বিলীন চক্রে ধীতপুর গ্রামের বহু ঘরবাড়ি নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। ভিটামাটি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়া রহিতন নেছার আকুল মানবিক কষ্টের খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও স্থানীয় গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি শাহজাদপুর উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসে। খবর পেয়েই কালবিলম্ব না করে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা সরাসরি ওই শতবর্ষী বৃদ্ধার অস্থায়ী আস্তানায় উপস্থিত হন।
আরও পড়ুন: রায়গঞ্জে আব্দুর রহমান হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বিশাল বিক্ষোভ!
উপজেলা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ও মানবিক সহায়তা প্রদান
শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরিনা সারমিন এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন সশরীরে ধীতপুর চরাঞ্চলে গিয়ে শতবর্ষী রহিতন নেছার সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় কর্মকর্তা দ্বয় পরম মমতায় প্রবীণ রহিতনের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার সার্বিক খোঁজখবর নেন এবং দীর্ঘক্ষণ তাঁর সুখ-দুঃখের কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনেন।
সাক্ষাৎ শেষে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রহিতন নেছার হাতে তাৎক্ষণিক জীবন ধারণ ও ভবিষ্যতের সুরক্ষার জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপহার ও সরকারি সুবিধা তুলে দেওয়া হয়:
- সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার কার্ড: বয়স্ক নাগরিক হিসেবে তাঁর স্থায়ী আয়ের বন্দোবস্ত করতে একটি সরকারি বয়স্ক ভাতার কার্ড আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর হাতে হস্তান্তর করা হয়।
- জরুরি আর্থিক সাহায্য: তাৎক্ষণিক চিকিৎসা ও আনুসঙ্গিক খরচ মিটানোর জন্য নগদ আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়।
- নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী: পরিবারের খাদ্য চাহিদা পূরণে চাল, ডাল, তেল ও শুকনা খাবারের সমন্বয়ে গঠিত জরুরি ত্রাণসামগ্রীর প্যাকেট পৌঁছে দেওয়া হয়।
দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন ও সহায়তার আশ্বাস
সহায়তা প্রদানকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরিনা সারমিন বলেন, “নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ও সহায় সম্বলহীন চরাঞ্চলের মানুষ আমাদের সমাজেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রবীণ ও অসহায় রহিতন নেছার এই দুর্দিনে তাঁর পাশে দাঁড়াতে পেরে আমরা প্রশাসন হিসেবে নিজেদের ধন্য মনে করছি। কেবল এই তাৎক্ষণিক খাদ্য ও ভাতা সহায়তাই শেষ নয়, পরবর্তীতে তাঁর স্থায়ী মাথার গোঁজার ঠাঁই বা সরকারি বাসস্থান নিশ্চিত করতেও শাহজাদপুর উপজেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখবে।”
আরও পড়ুন: চন্দনাইশে ত্রাণ বিতরণে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু, নেতা-কর্মীদের ভিড়ে ভেঙে পড়ল মঞ্চ!
একই সাথে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান যে, ভাঙন কবলিত এই নদীভাঙা এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও কৃষি পরিবারগুলোকে পুনর্বাসিত করতে কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর থেকেও বিভিন্ন প্রণোদনা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হচ্ছে।
জনবান্ধব প্রশাসনের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত
যমুনার নিষ্ঠুর গ্রাসে হারিয়ে যাওয়া ভিটেমাটির মাঝে হঠাৎ সরকারি সহায়তা ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সান্নিধ্য পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শতবর্ষী রহিতন নেছা। তিনি অশ্রুসজল নয়নে প্রশাসন ও উপস্থিত সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও দোয়া প্রকাশ করেন।
স্থানীয় সচেতন মহল ও সোনাতনী ইউনিয়নের সাধারণ বাসিন্দাদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্বিপাকে সর্বস্ব হারানো প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া উপজেলা প্রশাসনের এমন তাৎক্ষণিক সামাজিক দায়িত্বশীলতা ও গভীর মানবিক সংবেদনশীলতা গোটা সিরাজগঞ্জ জেলায় এক উজ্জ্বল ও দৃষ্টান্তমূলক নজির স্থাপন করল।
সংবাদ সূত্র: শাহজাদপুর উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় চরাঞ্চলের প্রতিনিধি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।